পৃথিবীর নানা দেশেই রাজনীতিবিদেরা বিভিন্ন সংকটের সময়ে ধর্মীয় গুরু, পীর সাহেব কিংবা জ্যোতিষীদের পরামর্শ নিয়েছেন, এমন উদাহরণ ভূরি ভূরি আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনারতরী’ কাব্যগ্রন্থের ‘স্বপ্নমঙ্গল’ কবিতায় দেখা যায়, রাজা হবুচন্দ্র ভূপ এক বিদঘুটে স্বপ্ন দেখেন। রাজদরবারের সভাপরিষদ, পণ্ডিত, উপদেষ্টা বা মন্ত্রী কেউই সেই স্বপ্নের অর্থ বের করতে পারেন না। সবাই শুধু ‘থেকে থেকে হেঁকে ওঠেন “হিং টিং ছট্”।’ বিদেশ থেকেও পণ্ডিত ডাকা হলো, কিন্তু তাঁরাও কোনো অর্থ খুঁজে পান না। এই স্বপ্নবিভ্রাট নিয়ে সারা রাজ্যে বড় সংকট সৃষ্টি হয়। কবিতাটি যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন ক্ষমতাধর মানুষেরাও মাঝেমধ্যে কত অসহায় হয়ে পড়েন! বড় বড় উপদেষ্টা ও মন্ত্রীরাও সময়ে–সময়ে ব্যর্থ হন তাঁদের সাহায্য করতে।
আধুনিক রাষ্ট্রে শাসকদের অন্ধবিশ্বাস
শুধু হবুচন্দ্রের দেশে নয়, আধুনিক রাষ্ট্রেও শাসকেরা জটিল পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে প্রায়ই অবাস্তব জগতে চলে যান। ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টাদের বাইরেও খুঁজতে থাকেন পরামর্শদাতা, যাঁরা দিতে পারেন ‘হিং টিং ছট্’-এর মতো কঠিন সমস্যার সমাধান। ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যে সাম্প্রতিক নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রিত্ব পেয়েই চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয় তাঁর উপদেষ্টা নিয়োগ করেন পণ্ডিত ভেট্রিভেল নামের এক জ্যোতিষীকে। বিধানসভা নির্বাচনে বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন এই জ্যোতিষী। সমালোচনার মুখে তাঁকে আনুষ্ঠানিক পদ থেকে অপসারণ করা হলেও, ভবিষ্যতে প্রয়োজনে বিজয় যে তাঁর শলা-পরামর্শ নেবেন, তা এখনই বলা যায়।
দক্ষিণ এশিয়ার পীর-ধর্মগুরুর প্রভাব
পৃথিবীর নানা দেশেই রাজনীতিবিদেরা সংকটে ধর্মীয় গুরু, পীর সাহেব কিংবা জ্যোতিষীদের পরামর্শ নিয়েছেন। কেউ পরামর্শ নিয়েছেন নির্বাচিত হতে, কেউ নির্বাচিত হওয়ার পর রাষ্ট্র পরিচালনায় সাহায্য নিতে, আবার কেউবা অন্য কোনো কারণে। কিছু রাজনীতিবিদ নিজেরাই পীর কিংবা ধর্মগুরু। যেমন চরমোনাই পীর সৈয়দ ফজলুল করীম, যাঁর রয়েছে নিজস্ব রাজনৈতিক দল—বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন। ভারতের উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ একজন পুরোহিত ও ধর্মগুরু হিসেবেও পরিচিত।
মাওলানা ভাসানীর বর্ণাঢ্য জীবনে ছিল নানান পরিচয়। তিনি ছিলেন বিপুল সংখ্যক জনগণের ধর্মীয় পীর; আবার তাঁর রাজনৈতিক অনুসারীর সংখ্যাও ছিল প্রচুর। তবে আশ্চর্যজনকভাবে, তিনি এই দুই পরিচয়ের মধ্যে বিভাজন বজায় রাখতেন। যাঁরা রাজনীতি করতেন, তিনি তাঁদের ধর্মীয় পীর ছিলেন না। আবার তাঁর মুরিদদের তিনি কখনো দলীয় রাজনীতিতে জড়াতেন না। তাঁর সম্পর্কে একটি কথা প্রচলিত ছিল যে তিনি সকালের সময়টা মুরিদদের জন্য বরাদ্দ রাখতেন এবং বিকেলটা কাটাতেন রাজনৈতিক অনুসারীদের সঙ্গে।
শেখ মুজিব ও আন্ধা হাফিজ
শেখ মুজিবুর রহমান কখনো কোনো পীরের ভক্ত ছিলেন বলে জানা যায়নি। তবে তাঁর সঙ্গে মাওলানা ভাসানীর ছিল বহুমাত্রিক সম্পর্ক। ভাসানী এক সময়ে ছিলেন মুজিবের রাজনৈতিক গুরু, পরে রাজনৈতিক সমালোচক। রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও শেখ মুজিব ভাসানীকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন, ডাকতেন ‘হুজুর’। অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের বই ‘বাংলাদেশ: আ লিগ্যাসি অব ব্লাড’-এ বর্ণনা করা হয়েছে যে চট্টগ্রামের এক দৃষ্টিহীন বিহারি ধর্মগুরু ‘আন্ধা হাফিজ’ শেখ মুজিবকে হত্যার ঘটনায় প্রবল প্রভাব রেখেছিলেন। তৎকালীন মেজর ফারুক রহমান যখন অভ্যুত্থানের সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি হালিশহরে গিয়ে অন্ধ হাফিজের আশীর্বাদ গ্রহণ করেন এবং তাঁর পরামর্শ মেনে চলেন।
শর্ষিনা ও আটরশি পীরের দরবার
বাংলাদেশে পীর সাহেবদের দরবারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো পিরোজপুর জেলার শর্ষিনা পীরের দরবার। এ দরবারের সঙ্গে রাজনীতিবিদদের যোগাযোগ ছিল পাকিস্তানের আইয়ুব খানের আমল থেকেই। বর্তমানেও শর্ষিনা পীরের দরবারের শিষ্য ও ভক্তদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় পর্যায়ের বেশ কয়জন রাজনীতিবিদ। ফরিদপুরের আটরশি পীরের কথাও বলতে হয়। প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে আটরশির সরাসরি শিষ্য না বললেও ভক্ত বলা যায়। তাঁর শাসনামলে আশির দশকে আটরশির পীর প্রভূত প্রভাব বিস্তার করেছিলেন এবং সরকারের বিভিন্ন স্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, এরশাদ আটরশির পীরকে বিশেষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন এবং রাজনৈতিক সমর্থন ও অন্যান্য সুবিধা আদায়ে এই সম্পর্ক কাজে লাগিয়েছিলেন।
পাকিস্তানের পীর-রাজনীতি
বাংলাদেশের আরেকজন পীর ভুট্টো পরিবারের সদস্যদের পরামর্শ দিয়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন। ১৯৭০-এর দশকে জুলফিকার আলী ভুট্টো জয়পুরহাট জেলার পীর মুজিবুর রহমান চিশতীর সান্নিধ্যে আসেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর কন্যা বেনজির ভুট্টোও বিভিন্ন সময়ে এই পীরের পরামর্শ নেওয়া অব্যাহত রাখেন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে থেকেই আইয়ুব খানের সঙ্গে পাঞ্জাবের দেওয়াল শরিফ এলাকার পীর আবদুল মাজিদের সরাসরি যোগাযোগ ছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসারদের পাশাপাশি আমলাতন্ত্র ও বিচার বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যেও মাজিদ অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। আইয়ুব খানের ব্যক্তিগত ডায়েরিতে আবদুল মাজিদের নাম বিশেষভাবে উল্লিখিত হয়েছে।
ভারতের রাজনীতিতে জ্যোতিষ ও আধ্যাত্মিকতা
ভারত হলো সাধু, সন্ন্যাসী ও জ্যোতিষীদের দেশ। ভারতের বেশির ভাগ রাজনৈতিক নেতাই বিভিন্ন সময়ে তাঁদের পরামর্শ নিয়ে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আধ্যাত্মিক গুরু ছিলেন স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী। জীবদ্দশায় মোদি প্রায়ই ঋষিকেশে তাঁর আশ্রমে গিয়ে দেখা করতেন। মৃত্যুর পর মোদি তাঁকে পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত করেন। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ‘যোগ’ শিক্ষক ও আধ্যাত্মিক গুরু ছিলেন ধীরেন্দ্র ব্রহ্মচারী। ধীরে ধীরে ইন্দিরার প্রশাসনে তাঁর প্রভাব বিস্তার লাভ করে। জরুরি অবস্থার সময় যখন অনেক রাজনৈতিক সহচর ও উপদেষ্টা তাঁকে পরিত্যাগ করেন, তখন ধীরেন্দ্র ব্রহ্মচারী ইন্দিরার নিকটতম রাজনৈতিক পরামর্শক হয়ে ওঠেন এবং ‘ভারতীয় রাসপুতিন’ উপাধিতে পরিচিত হন।
যুক্তরাষ্ট্রে জ্যোতিষীর প্রভাব
দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে অপ্রথাগত পরামর্শের ওপর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের হোয়াইট হাউসে। নিউইয়র্ক পোস্টের এক নিবন্ধে লেখা হয়েছে, ১৯৮১ সালের ৩০ মার্চ প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের দেহে গুলিবিদ্ধ হওয়ার কয়েক দিন পর, তাঁর স্ত্রী ন্যান্সি রিগ্যান হলিউডের বন্ধু মার্ভ গ্রিফিনের কাছ থেকে ফোন পান। গ্রিফিন জানান, সান ফ্রান্সিসকোর জ্যোতিষী জোয়ান কুইগলির রাশিচক্রে ৩০ মার্চ দিনটিকে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ন্যান্সি বলেন, ‘ওহ, হে ঈশ্বর! আমি যদি আগে রাশিচক্রটা দেখতাম, তাহলে এই আক্রমণ আটকাতে পারতাম!’ তারপর থেকে ন্যান্সি কুইগলির জ্যোতিষী পরামর্শের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যান। তিনি নিরাপত্তার নিয়ম লঙ্ঘন করে কুইগলিকে প্রেসিডেন্টের সময়সূচি তুলে দিতেন এবং সেই জ্যোতিষী ভ্রমণ ও জনসমাবেশের জন্য শুভ-অশুভ দিন নির্ধারণ করে দিতেন। ধীরে ধীরে কুইগলি রাজনৈতিক বিষয়েও পরামর্শ দিতে শুরু করেন। রিগ্যানের সহকারীরা বিষয়টি জানতেন, কিন্তু ন্যান্সির ওপর কথা বলার লোক কেউ ছিলেন না। সবাই এটাকে ‘একজন স্ত্রীর তাঁর স্বামীকে রক্ষা করার অধিকার’ হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। ন্যান্সি পরে এক বক্তৃতায় বলেন, ‘আমি এমন একজন নারী, যিনি তাঁর স্বামীকে ভালোবাসেন। আমাকে আমার স্বামীর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য যা করতে হয়েছে, তার কোনো কৈফিয়ত আমি দিই না।’
উপসংহার
এখানে যেসব রাজনৈতিক চরিত্রকে নিয়ে লেখা হয়েছে, তার বাইরেও অনেক শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ বিভিন্ন সময়ে আধ্যাত্মিক বা জ্যোতিষের পরামর্শ নিয়েছেন। আবার অনেক রাজনীতিবিদই এসব সযত্নে এড়িয়ে গেছেন, ‘হিং টিং ছট্’ সংকটগুলো তাঁরা হয়তো অন্যভাবে সমাধান করেছেন। শেষ পর্যন্ত রাজা হবুচন্দ্রের ‘হিং টিং ছট্’ স্বপ্নের রহস্যভেদ করেছিলেন গৌড় দেশীয় এক বাঙালি আধ্যাত্মিক সাধু।



