হালাল-হারামের মূলনীতি: ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি
অযৌক্তিক কঠোরতা ও সীমাহীন স্বাধীনতা—উভয়ই মানুষের জন্য ক্ষতিকর। আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ করে আমাদের ওপর থেকে সব ধরনের অন্যায্য কঠোরতা তুলে নিয়েছেন। আবার ‘সবকিছুই বৈধ’—এমন নীতিহীনতা থেকেও তিনি আমাদের বাঁচিয়েছেন। মানবজাতির কল্যাণ সাধন এবং অকল্যাণ থেকে মুক্তির জন্য তিনি হালাল-হারাম চেনার এমন কিছু শাশ্বত মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যা মানুষকে সামাজিক ও মানসিক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি দেয়।
ইসলামি শরিয়ত যা বৈধ করেছে তা–ই হালাল আর যা অবৈধ করেছে তা-ই হারাম। এই বিধান কেবল কোনো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং মানুষের দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ নিশ্চিত করার চূড়ান্ত ঐশী ব্যবস্থা। ইসলামের একটি মৌলিক বিধান হলো, হারাম বলে নির্ধারণ হয়নি—এমন সব বিষয়ই হালাল। তবে সন্দেহজনক বস্তু থেকে বিরত থাকা উত্তম। সহজে হালাল-হারাম সম্পর্কে চেনার পাঁচটি মৌলিক নিয়ম আলোচনা করা হলো।
প্রথম নিয়ম: ‘হারাম’ নির্ধারিত না হলে হালাল
ইসলামি শরিয়তের একটি প্রসিদ্ধ ফিকহি নীতি হলো, যেকোনো বস্তুর মূল বিধান হলো তা বৈধ বা হালাল হওয়া, যতক্ষণ না তা হারাম হওয়ার কোনো দলিল পাওয়া যায়। কেননা, কোরআনে বলা হয়েছে, “তিনিই সেই সত্তা, যিনি পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের (ব্যবহারের) জন্য সৃষ্টি করেছেন।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৯) আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার সবকিছু মানুষের কল্যাণে তৈরি করেছেন। তাই কোনো কিছু নিষিদ্ধ হওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ না থাকা পর্যন্ত তা মূলত হালাল।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবে যা হালাল করেছেন তা হালাল, আর যা হারাম করেছেন তা হারাম। আর যে বিষয়ে তিনি নীরব থেকেছেন (স্পষ্ট করে হালাল বা হারাম বলেননি), তা তোমাদের জন্য ক্ষমার অংশ (অর্থাৎ তা বৈধ)। অতএব, তোমরা আল্লাহর দেওয়া এই সহজতাকে গ্রহণ করো...” (সুনানে দারা কুতনি, ৪/১৮৪, মুসতাদরাকে হাকেম, ২/৪১১)
দ্বিতীয় নিয়ম: ক্ষতিকর ও অপবিত্র বস্তু হারাম
ক্ষতিকর, অপবিত্র ও অকল্যাণকর সব বস্তু মানুষের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শরিয়তের এসব নিষেধাজ্ঞা মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক ক্ষতি প্রতিরোধ এবং সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই নির্ধারিত হয়েছে। পবিত্র কোরআনে মদ, রক্ত, মৃত প্রাণী, শূকরের গোশত এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে জবাই করা পশু হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। কোরআনে আরও এমন কিছু প্রাণীর উল্লেখ রয়েছে, যেগুলোর বিশেষ ক্ষতিকর স্বভাবের কারণে ভক্ষণ করা নিষিদ্ধ। (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৩)
তৃতীয় নিয়ম: হারামের ‘চক্র’ও হারাম
ইসলামের একটি মনস্তাত্ত্বিক নীতি হলো, যা কিছু হারামের পথ খুলে দেয় বা হারামের দিকে ধাবিত করে, সেই মাধ্যমও হারাম। যেমন ইসলামে ব্যভিচার হারাম; তাই ব্যভিচারের পরিবেশ বা সুযোগ সৃষ্টি করে—এমন সব কর্মকাণ্ড থেকেও দূরে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ কারণে বেগানা নারী-পুরুষের নির্জনে অবস্থান, অবাধ মেলামেশা, অশালীনতা ও যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী কার্যকলাপ নিষিদ্ধ।
মদের কথাই ধরা যাক। কেবল মদ পান করাই হারাম নয়; বরং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুরো চক্রটিই নিষিদ্ধ। হাদিসে এসেছে, মদ সম্পর্কে ১০ শ্রেণির লোককে নবীজি (সা.) অভিসম্পাৎ করেছেন—মদ প্রস্তুতকারী, মদ প্রস্তুতের আদেশদাতা, মদ পানকারী, মদ বহনকারী, যার জন্য বহন করা হয়, যে তা পান করায়, বিক্রয়কারী, এর মূল্য গ্রহণকারী, যে মদ ক্রয় করে এবং যার জন্য ক্রয় করা হয়। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১২৯৫)
চতুর্থ নিয়ম: হারামকে বৈধ করার অপকৌশল নিষিদ্ধ
কোনো হারাম বস্তুর বাহ্যিক রূপ বা নাম পরিবর্তন করলেই তা বৈধ হয়ে যায় না। শরিয়ত এমন সব হিলা বা ধর্মীয় অপকৌশলকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। একইভাবে কোনো নিষিদ্ধ জিনিসের নাম বদলে দিলেই তার আইনি বিধান পরিবর্তিত হয় না। উদাহরণস্বরূপ, মদের অন্য কোনো আধুনিক নাম দেওয়া কিংবা সুদকে ‘লাভ’, ‘মুনাফা’ বা ভিন্ন কোনো নামে অভিহিত করা হলেও তা হালাল হয় না। বরং তা একটি ধোঁকা এবং এ ধরনের ধোঁকা বা চতুরতার আশ্রয় নেওয়া আরেকটি পাপ। রাসুল (সা.) এ ধরনের ধোঁকাবাজি ও চাতুর্যের প্রবণতা সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে গেছেন। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৫৬৫৮)
পঞ্চম নিয়ম: অন্যের ‘সম্পদ’ ভোগ করা হারাম
যে সম্পদের ওপর অন্যের বৈধ অধিকার রয়েছে, তা অন্যায়ভাবে ভোগ করা ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। চুরি, ছিনতাই, লুটপাট, প্রতারণা, ঘুষ, ওজনে কম দেওয়া কিংবা জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত সব সম্পদই হারামের অন্তর্ভুক্ত। কোরআনে অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভোগ করা এবং বিচারব্যবস্থাকে অপব্যবহার করে অন্যের অধিকার আত্মসাৎ করার ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরে একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ কোরো না এবং বিচারকের কাছে সে সম্পর্কে এই উদ্দেশ্যে মামলা কোরো না যে মানুষের সম্পদ থেকে কোনো অংশ জেনেশুনে (অন্যায়ভাবে) পাপের পথে তা আত্মসাৎ করবে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৮)
সারকথা
কোনো বস্তু নিজের খেয়ালখুশিমতো হালাল বা হারাম করার ক্ষমতা মানুষের নেই। এই অধিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলার। তিনি যা বৈধ করেছেন তা হালাল আর যা নিষিদ্ধ করেছেন তা-ই হারাম। ব্যক্তিগত মত, সমাজের প্রচলিত কুসংস্কার কিংবা যুগের পরিবর্তনের অজুহাতে আল্লাহর নির্ধারিত বিধান পরিবর্তন করার কোনো অবকাশ কারও নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হালাল সুস্পষ্ট, হারামও সুস্পষ্ট। এ দুটির মাঝখানে কিছু সন্দেহজনক বিষয় রয়েছে, যা অনেক মানুষ জানে না। যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয় থেকে নিজেকে রক্ষা করে, সে তার ধর্ম ও সম্মানকে নিরাপদ রাখে। আর যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে, সে একসময় হারামের মধ্যেই লিপ্ত হয়ে যায়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৯৪৯)
মাহমুদ হাসান ফাহিম : শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদরাসা কমপ্লেক্স, টঙ্গী



