স্বাধীনতা পুরস্কার পাচ্ছেন হানিফ সংকেত, 'ইত্যাদি'র সাফল্যের গল্প
হানিফ সংকেত পাচ্ছেন স্বাধীনতা পুরস্কার, 'ইত্যাদি'র সাফল্য

স্বাধীনতা পুরস্কার পাচ্ছেন হানিফ সংকেত, 'ইত্যাদি'র সাফল্যের গল্প

নব্বইয়ের দশক থেকে ঈদের আনন্দময় স্মৃতির সঙ্গে বাংলাদেশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠান 'ইত্যাদি' ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সময় বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে, দর্শকের অভ্যাসও পাল্টেছে; তবু ঈদ এলেই দর্শকদের প্রত্যাশার তালিকায় এখনো শীর্ষের দিকেই থাকে এই অনুষ্ঠান। সেই 'ইত্যাদি'র নির্মাতা হানিফ সংকেত—যিনি শুধু জনপ্রিয় উপস্থাপকই নন, ব্যঙ্গ–রসের আড়ালে সমাজের নানা অসংগতি তুলে ধরা এক সচেতন নির্মাতা ও লেখকও—এবার পাচ্ছেন স্বাধীনতা পুরস্কার।

স্বাধীনতা পুরস্কার প্রাপ্তির অনুভূতি

মিরপুরে তাঁর অফিসে দেখা হলো হানিফ সংকেতের সঙ্গে। তিনি জানালেন, "সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার প্রায় আধা ঘণ্টা আগে বিষয়টি জানতে পারি। স্বাভাবিকভাবেই ভালো লেগেছিল। প্রথমে স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছি। তবে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছি যখন দেখলাম সংস্কৃতিকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শক—সবাই এই প্রাপ্তিতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন।"

চার দশকের বেশি সময়ের পথচলার শেষে এই স্বীকৃতিকে তিনি দেখছেন নতুন দায়িত্বের প্রেরণা হিসেবে। তাঁর ভাষ্যে, "আমি কখনো প্রাপ্তি–অপ্রাপ্তি নিয়ে খুব বেশি ভাবিনি। চেষ্টা করেছি কাজের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ের কাছে পৌঁছাতে। মানুষের ভালোবাসাই ছিল আমার কাছে বড় পুরস্কার। তবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ এই সম্মান অবশ্যই আনন্দের।"

'ইত্যাদি'র কারখানা ও নির্মাণ প্রক্রিয়া

ফাগুন অডিও ভিশনের ভবনে ঘুরে দেখা গেল 'ইত্যাদি'র কারখানা। সব ফ্লোরে চোখে পড়ে শৃঙ্খলা ও যত্নের ছাপ। ভবনের কয়েকটি ঘরজুড়ে শুধু শিল্পীদের কস্টিউম। হানিফ সংকেত জানালেন, "ইত্যাদির প্রায় প্রতিটি পর্বের জন্য নতুন স্যুট বানাতে হয়। তবে তার জন্য কোনো স্পনসর নেই। শুধু আমার নয়, 'ইত্যাদি' বা আমার নাটকের শিল্পীদের কস্টিউমেও আমরা স্পনসর নিই না।"

একটি পর্ব তৈরির পেছনে যে কতটা গবেষণা, পরিকল্পনা ও শ্রম থাকে, তা শুনলে বোঝা যায় কেন অনুষ্ঠানটি এত বছর ধরে দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখতে পেরেছে। "আমরা যখন কোনো জেলায় অনুষ্ঠান করি, তার আগে অনেক প্রস্তুতি থাকে। প্রথমে বই পড়ি, গুগলে ওই এলাকার তথ্য দেখি। তারপর প্রতিনিধি পাঠাই। পরে নিজে গিয়ে জায়গাটা দেখি। তারপর আয়োজনের পরিকল্পনা করি।"

দর্শকের ভালোবাসাই মূল শক্তি

প্রজন্মের পর প্রজন্ম 'ইত্যাদি' দেখছে। কেন মানুষ অনুষ্ঠানটি এত পছন্দ করে—এই প্রশ্নে তাঁর উত্তর সরল। "এই অনুষ্ঠানের প্রতি আমার ভালোবাসা, দায়বদ্ধতা, একাগ্রতা ও আন্তরিকতাই এর শক্তি। ব্যস্ততম জীবনের মধ্যেও দর্শক সময় বের করে ইত্যাদি দেখেন—এটাই আমার পরম পাওয়া।"

তাঁর মতে, একটি অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় শক্তি দর্শক। দর্শকরা তাঁদের মূল্যবান সময় বের করে অনুষ্ঠান দেখতে বসেন। তাই সেই সময়ের মূল্য দেওয়া নির্মাতাদের দায়িত্ব। "আমার কাছে দর্শকের রায়ই চূড়ান্ত। দর্শকদের সমর্থন, সহযোগিতা ও ভালোবাসার কারণেই 'ইত্যাদি'-র এই দীর্ঘ পথচলা সম্ভব হয়েছে।"

ভাইরাল সংস্কৃতি ও মানের গুরুত্ব

বর্তমান সময়ের বিনোদন জগতে 'ভাইরাল' হওয়ার প্রবণতা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। "চমক অনেকটা ভাইরাল ধরনের বিষয়। আজকাল অধিকাংশ কনটেন্টের বেলায় এই শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়। তাই 'ইত্যাদি'-র সঙ্গে এগুলো যুক্ত করতে চাই না। আমি চমকে নয়, মান ও বিষয়বৈচিত্র্যে বিশ্বাসী।"

ভিউ–সংস্কৃতি নিয়েও তিনি স্পষ্ট, "ভিউ মানেই কিন্তু মান নয়। চটুল কিছু দিয়ে সাময়িক শোরগোল তোলা সহজ, কিন্তু মানুষের মনে স্থায়ী হয় না। 'ইত্যাদি'-র দর্শক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের চেয়ে হৃদয়ের প্ল্যাটফর্মে বেশি। আমরা যখন কোনো সামাজিক সমস্যার সমাধান নিয়ে প্রতিবেদন করি এবং সেই প্রতিবেদন দেখে কোনো মানুষের জীবন বদলে যায়, সেটাই আমাদের কাছে আসল সাফল্য।"

এবারের ঈদের 'ইত্যাদি'

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ঈদের বিশেষ আকর্ষণ হয়ে আছে 'ইত্যাদি'। হানিফ সংকেত বললেন, "ঈদের অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় চাপ হচ্ছে বিদেশি পর্ব। বিদেশি নির্বাচনের কাজ শুরু হয় রোজা শুরুর অন্তত তিন মাস আগে থেকে। এরপর প্রায় দেড় মাস মহড়া চলে।"

এবারের আয়োজনেও থাকবে নাচ–গান–অভিনয়ে সমৃদ্ধ বর্ণাঢ্য পরিবেশনা। দেশের শীর্ষ তারকারা অংশ নিচ্ছেন। মানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে সবশেষে থাকবে দেশের গান। পাশাপাশি এবার ফাগুন অডিও ভিশনের ব্যানারে থাকছে নাটকও। এবারের নাটকের নাম ছন্দময়—'ভালোবেসে অবশেষে'। এতে থাকবে বিনোদনের পাশাপাশি সামাজিক বার্তা ও দেশের কথা।

চার দশকের সাফল্যের স্বীকৃতি

চার দশক ধরে টেলিভিশনের পর্দায় সুস্থ বিনোদন, ব্যঙ্গ ও সামাজিক সচেতনতার এক অনন্য মিশ্রণ তৈরি করেছেন হানিফ সংকেত। স্বাধীনতা পদক ২০২৬ সেই দীর্ঘ পথচলারই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। এত বছর একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা ধরে রাখার উদাহরণ খুব কম, বাংলাদেশে নেই।

এ প্রসঙ্গে বরেণ্য এ নির্মাতা ও উপস্থাপক বললেন, "'ইত্যাদি' হলো একটা পারিবারিক মিলনমেলা। প্রযুক্তির ভিড়ে মানুষ অনেক কিছু হারাচ্ছে, কিন্তু হারানো সেই পারিবারিক বন্ধনটা 'ইত্যাদি'-র স্বল্প সময়ের আয়োজনে ফিরে আসে বলেই হয়তো দর্শক আজও আমাদের ভালোবাসেন।"