হানিফ সংকেতকে স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬: সংস্কৃতিতে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান
দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে সুস্থ বিনোদন ও সামাজিক সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’-এর উপস্থাপক ও নির্মাতা হানিফ সংকেতকে (এ কে এম হানিফ) স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬ প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আজ বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উচ্ছ্বাস ও শুভেচ্ছা
বৃহস্পতিবার প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে ব্যাপক আনন্দ ও শুভেচ্ছার ঢেউ। সংস্কৃতি অঙ্গনের শিল্পী, নির্মাতা থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শক—অনেকেই হানিফ সংকেতের ছবি শেয়ার করে তাঁকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। তাঁদের মন্তব্যে স্পষ্ট, দীর্ঘদিন ধরে সুস্থ বিনোদন ও সামাজিক সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের জন্য স্বাধীনতা পুরস্কারের ঘোষণাকে তাঁরা সময়োপযোগী ও প্রাপ্য স্বীকৃতি হিসেবেই দেখছেন।
হানিফ সংকেতের স্বকীয় উপস্থাপনা, স্পষ্ট উচ্চারণ, ছন্দজ্ঞান এবং পুরো অনুষ্ঠানকে নিজের আয়ত্তে রেখে এগিয়ে নেওয়ার দক্ষতার কারণে অনেকেই তাঁকে ‘কথার জাদুকর’ বলে অভিহিত করেছেন। সাধারণত কোনো পুরস্কার ঘোষণাকে ঘিরে যে ধরনের উচ্ছ্বাস দেখা যায়, বিনোদন অঙ্গনে হানিফ সংকেতকে ঘিরে এবারের প্রতিক্রিয়া তার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন—এ যেন অনেকের কাছে স্বস্তির অনুভূতি।
হানিফ সংকেতের প্রতিক্রিয়া: দর্শকদের উদ্দেশে উৎসর্গ
স্বাধীনতা পুরস্কার ঘোষণার পর এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন হানিফ সংকেত। তিনি বলেন, ‘আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এ বছর আমাকে সংস্কৃতিতে “স্বাধীনতা পদক”-এ ভূষিত করেছে। এই অর্জন আমার একার নয়—যাঁদের ভালোবাসা, সমর্থন ও সহযোগিতায় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আমার এই দীর্ঘ যাত্রা সম্ভব হয়েছে, এই অর্জন তাঁদের সবার। আজকের এই আনন্দের দিনে আমি তাঁদের সবার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এই পুরস্কার আমি আমার লক্ষ-কোটি দর্শকদের উদ্দেশে উৎসর্গ করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, সুস্থ সংস্কৃতিই পারে একটি সমাজকে আলোকিত করতে এবং দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনতে। আমৃত্যু আমি সুস্থ সংস্কৃতির চর্চায় দেশের জন্য কাজ করে যেতে চাই। অতীতেও আমি যেমন দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেছি, ভবিষ্যতেও দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে যাব। এই পুরস্কার আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে আরও উৎসাহিত করবে।’
‘ইত্যাদি’র যাত্রা ও সাফল্যের রহস্য
বিটিভিতে ‘ইত্যাদি’র প্রথম পর্ব প্রচারিত হয় ১৯৮৯ সালের মার্চে। সে হিসাবে অনুষ্ঠানটির যাত্রা তিন দশকের বেশি। এই দীর্ঘ সময়ের ব্যাখ্যায় হানিফ সংকেত বারবার দর্শকের ভালোবাসাকে সামনে আনেন। তিনি বলেন, ‘সেই নব্বইয়ের দশক থেকেই আমরা শিকড়ের সন্ধানে ‘ইত্যাদি’কে স্টুডিওর চারদেয়াল থেকে বের করে গিয়েছি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, দেশকে জানতে এবং জানাতে…দর্শকের ভালোবাসা আর সমর্থনের কারণেই ইত্যাদির এই দীর্ঘ যাত্রা সম্ভব হচ্ছে।’
স্টুডিও ছেড়ে মাঠে নামার সিদ্ধান্তটাই ‘ইত্যাদি’র সবচেয়ে বড় সিগনেচার। একটি জেলার ইতিহাস, লোকজ সংস্কৃতি, ভাষার টান, মানুষের রুচি—সবকিছু মিলিয়ে প্রতিটি পর্বকে আলাদা করে তোলা হয়। হানিফ সংকেতের ভাষায়, ফরম্যাট প্রায় অপরিবর্তিত থাকার পরও দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখার মূল কারণ-বিষয়বৈচিত্র্য ও লোকেশনের নতুনত্ব।
নৈতিকতা ও বস্তুনিষ্ঠতার সমন্বয়
অনেক অনুষ্ঠানই বিনোদন দেয়, অনেকেই বার্তা দেয়। কিন্তু ‘ইত্যাদি’ চেষ্টা করেছে বার্তাকে বিনোদনের ভেতরেই গুঁজে দিতে, যেন দর্শক ক্লান্ত না হন। কোনটাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন, এই প্রশ্নে হানিফ সংকেতের উত্তর ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেন, প্রথমেই নৈতিকতা, এরপর বার্তা নয় বরং বস্তুনিষ্ঠ বার্তা…টেলিভিশনের মূলমন্ত্র হচ্ছে শিক্ষা-তথ্য ও বিনোদন। আর ‘ইত্যাদি’ যেহেতু তথ্য-শিক্ষা ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, তাই ‘ইত্যাদি’তে থাকে এ তিনটির সমন্বয়।
এই ‘নৈতিকতা আগে’ নীতিটাই ‘ইত্যাদি’র টিকে থাকার অন্যতম শর্ত। সময় বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে, দর্শক বদলেছে, কিন্তু পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে বসে দেখার নিশ্চয়তাটা থেকে গেছে। অনেকেই বলেন, এই নিশ্চয়তাই আজকের দিনে সবচেয়ে দুর্লভ পুঁজি।
অসংগতি দেখিয়ে ‘আলোকিত মানুষ’কে সামনে আনা
‘ইত্যাদি’কে শুধু ম্যাগাজিন শো বললে কম বলা হয়। এটি বহুদিন ধরে সামাজিক প্রতিবেদন, সচেতনতা ও ইতিবাচক পরিবর্তনের গল্পও তুলে ধরেছে। হানিফ সংকেত বলেন, চারপাশের অসংগতি নিয়ে তাঁর লেখালেখি শুরু স্কুল-কলেজ থেকেই। ‘আমি বিশ্বাস করি, অসংগতি-অনিয়ম দূর হলেই সমাজ শুদ্ধ হবে। এই ভাবনা থেকেই “ইত্যাদি”তেও অনিয়ম ও অসংগতি তুলে ধরি এবং এর বিপরীতে বিভিন্ন আলোকিত মানুষদের তুলে আনি।’
অর্থাৎ অভিযোগনির্ভর তিরস্কার নয়; সমস্যার পাশাপাশি সম্ভাবনার মানুষগুলোকে সামনে আনার আগ্রহ। এ কারণেই ‘ইত্যাদি’র প্রতিবেদনের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে ‘প্রচারবিমুখ ভালো মানুষ’দের গল্প, যারা গ্রামের স্কুল বানান, কারও চিকিৎসা চালান, কারও জন্য পানির ব্যবস্থা করেন। হানিফ সংকেত বলেছেন, ‘ইত্যাদি’র কারণে অনেক ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি পড়েছে, সমস্যার সমাধান হয়েছে; কোথাও কোথাও গড়ে উঠেছে সামাজিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও।
বিটিভি নিয়ে ‘আত্মিক সম্পর্ক’
আজ যখন অসংখ্য চ্যানেল ও প্ল্যাটফর্ম, তখনো ‘ইত্যাদি’ কেন শুধু বিটিভিতেই, এই প্রশ্ন বারবার আসে। হানিফ সংকেত বলেন, বিটিভির সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। আর একটি যুক্তিও তিনি দেন, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন হওয়ায় বিটিভি ব্যক্তিবিশেষের নিয়ন্ত্রিত নয়। তিনি বলেছেন, ‘সরকার বদলালেও ‘ইত্যাদি’ কখনো বদলায়নি…আমি রাজনীতি থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকি।’
বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
হানিফ সংকেত একাধারে উপস্থাপক, পরিচালক, লেখক, প্রযোজক, গায়ক, সুরকার ও গীতিকার। ‘ইত্যাদি’তে প্রচারিত জেলাভিত্তিক গান-দর্শকের ভাষায় ‘দলীয় সংগীত’-এর বড় অংশের সুর করেন তিনি। অনেক গানেই কণ্ঠ দেন নিজেই। ‘ইত্যাদি’র বাইরে হানিফ সংকেত নাটক ও চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। উল্লেখযোগ্য নাটক ‘কুসুম’-প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের নির্মাণ। নাটক পরিচালনাতেও তাঁর কাজের তালিকা দীর্ঘ।
রম্য রচনার ক্ষেত্রেও তাঁর বইয়ের তালিকা রয়েছে-‘চৌচাপটে’, ‘এপিঠ ওপিঠ’, ‘ধন্যবাদ’, ‘অকাণ্ড কাণ্ড’, ‘খবরে প্রকাশ’, ‘প্রতি ও ইতি’, ‘আটখানার পাটখানা’। এসব শিরোনামেই ধরা পড়ে তাঁর শব্দের খেলা, ভাষার দুষ্টুমি আর সমাজকে দেখার তীক্ষ্ণতা।
একুশে পদক থেকে স্বাধীনতা পুরস্কার
হানিফ সংকেত ২০১০ সালে পেয়েছেন একুশে পদক। তিনি পেয়েছেন জাতীয় পরিবেশ পদকও। ‘ইত্যাদি’ বহুবার মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারে সেরা টিভি অনুষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ এই সম্মান-স্বাধীনতা পুরস্কার-এবার তাঁর কাজের বিস্তৃত পরিসরকে নতুন করে সামনে আনল। অনেকের মতে, এই প্রাপ্তি শুধু একজন ব্যক্তিকে সম্মান জানানো নয়; এটি টেলিভিশননির্ভর সংস্কৃতিচর্চা, গণমানুষের ভাষা এবং সুস্থ বিনোদনের প্রতি রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
