আব্দুল লতিফ নাকি আলতাফ মাহমুদ: 'একুশের গান'-এর সুরের ইতিহাস ও বিতর্কের সমাধান
একুশের গানের সুরের ইতিহাস: আব্দুল লতিফ বনাম আলতাফ মাহমুদ

একুশের গানের সুরের উৎস: একটি ঐতিহাসিক অনুসন্ধান

বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের মতোই প্রাণের স্পন্দন জড়িয়ে আছে 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি' তথা 'একুশের গান'-এর সঙ্গে। কিন্তু এই গানের সুর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বিতর্ক ও তথ্য বিভ্রাটের ইতিহাস অনেকেরই অজানা। মূল কবিতার রচয়িতা সাংবাদিক আব্দুল গাফফার চৌধুরী, কিন্তু সুরের ক্ষেত্রে প্রথম ভূমিকা রাখেন আব্দুল লতিফ।

সুরের বিবর্তন: লতিফ থেকে মাহমুদ

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর আব্দুল লতিফ কবিতাটির উপর একটি সুরারোপ করেন। তবে ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে আলতাফ মাহমুদ নতুন একটি সুর তৈরি করতে শুরু করেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে তিনি নিজেই এই নতুন সুরে গানটি পরিবেশন করেন। এই ঘটনার পর থেকেই গানটির সুর স্থায়ী রূপ পেতে শুরু করে।

শহীদ আলতাফ মাহমুদের কন্যা শাওন মাহমুদ ২০২১ সালে বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই গানের পেছনের পুরো গল্প তুলে ধরেন। তিনি লেখক খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসের একটি উদ্ধৃতি উপস্থাপন করেন, যেখানে ইলিয়াস লিখেছেন: 'আব্দুল লতিফের সুরটি মন্দ ছিল না। কিন্তু কীসের যেন অভাব ছিল তাতে। আলতাফ মাহমুদের নতুন সুরে জনতার কর্ণে যেন মধু ঢেলে দিলো। কী ভীষণ মাদকতা, কী ভয়ংকর আকর্ষণ সে সুরের!'

বিতর্কের সমাপ্তি: লতিফের প্রশংসা ও সুর প্রত্যাহার

শাওন মাহমুদের গবেষণায় উঠে এসেছে যে, আলতাফ মাহমুদের নতুন সুর তৈরি করার পর আব্দুল লতিফ রাগ করেননি; বরং তিনি মাহমুদের সুরের প্রশংসা করে নিজের সুরটি প্রত্যাহার করে নেন। সময়ের প্রবাহে আব্দুল লতিফের মূল সুরটি হারিয়ে যায় এবং বহু অনুসন্ধান সত্ত্বেও তা আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

আলতাফ মাহমুদের সুরারোপের পর কবিতাটি রাতারাতি জনপ্রিয়তা পায়। প্রথমদিকে তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পুরো কবিতাটি নিজের সুরে পরিবেশন করতেন। পরবর্তীতে তিনি এই সুরে দু-তিনবার মামুলি পরিবর্তন আনেন। তৃতীয় সংশোধনের পর তিনি বাংলাদেশের গণসংগীতের দুই কিংবদন্তি শেখ লুতফর রহমান এবং আব্দুল লতিফের কাছে মতামত চান। উভয়েই তার সুরকে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন।

গানের বর্তমান রূপ: সংশোধন ও সম্পাদনা

বর্তমানে যে সুরে 'একুশের গান' গাওয়া হয়, তা আলতাফ মাহমুদের তৃতীয় সংশোধনের ফল। তিনি শুধু সুরই পরিবর্তন করেননি, কবিতাটির শেষের ছয়টি চরণও বাদ দিয়েছিলেন। তবে তিনি কবি আব্দুল গাফফার চৌধুরীর অনুমতি নিয়েই এই সম্পাদনা করেছিলেন। শহীদ আলতাফ মাহমুদ ফাউন্ডেশন থেকে প্রাপ্ত গানের সম্পূর্ণ লিরিক নিশ্চিত করে যে, এই পরিবর্তনগুলি যথাযথভাবে করা হয়েছে।

একুশের গানের বিশ্বব্যাপী প্রসার

১৯৫৪ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি প্রভাত ফেরীতে প্রথমবারের মতো আলতাফ মাহমুদের সুরে গানটি গাওয়া হয় এবং এটি এখন গানটির প্রাতিষ্ঠানিক সুর হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৬৯ সালে জহির রায়হান তার 'জীবন থেকে নেওয়া' চলচ্চিত্রে গানটি ব্যবহার করেন। বর্তমানে এই গানটি হিন্দি, মালয়, ইংরেজি, ফরাসি, সুইডিশ, জাপানিসহ মোট ১২টি ভাষায় গাওয়া হয়, যা এর বিশ্বব্যাপী আবেদনকেই প্রমাণ করে।

এই গান শুধু একটি সাংস্কৃতিক সম্পদ নয়, বাঙালির জাতীয় চেতনা ও সংগ্রামের প্রতীক। সুরের এই বিবর্তন ও বিতর্কের সমাধান আমাদের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে উন্মোচিত করে।