ডিজিটাল সংগীতের এই যুগে জনপ্রিয়তার মাপকাঠি অনেকটাই বদলে গেছে। এখন শিল্পীর সাফল্যের মাপকাঠি মূলত স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে স্পটিফাইয়ের বাংলাদেশের ‘টপ আর্টিস্ট’ হিসেবে ধারাবাহিক স্বীকৃতি পাওয়া তরুণ গায়ক তানভীর ইভান যেন একটি নতুন নাম। ১৮০ দেশের ২২ লাখ শ্রোতা আর গানের কোটি কোটি স্ট্রিম—এসবের মধ্যেই আছে এক নিভৃতচারী গায়কের নীরব ছুটে চলা।
ভারতে বেশি শ্রোতা
স্পটিফাইয়ের তথ্য বলছে, তানভীর ইভানের গান বাংলাদেশের চেয়ে ভারতে বেশি শোনা হয়। প্রথম দশ দেশের তালিকায় আরও আছে পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, নেপাল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুর। ইউটিউবে তাঁর ৩৩ লাখ সাবস্ক্রাইবারের একটি চ্যানেল রয়েছে, যেখানে তাঁর গাওয়া ৫০টি গানের ২৪৮ ধরনের কনটেন্ট রয়েছে। এসব কনটেন্টের বেশির ভাগেরই ভিউ মিলিয়ন মিলিয়ন।
চট্টগ্রামের ঘর থেকে শুরু
চট্টগ্রামের তরুণ তানভীর ইভান নিজের ঘরে গড়া স্টুডিওতে বসে গান বানান, লেখেন, সুর করেন। বিশ্বের নানা প্রান্তে পৌঁছে যায় সেই গান, কখনো বাঙালি শ্রোতা, কখনো আবার ভিনভাষী শ্রোতার কাছে।
প্রথম গান ‘ম্যায়নে রোয়া’
গল্পটি শুনতে যতটা সহজ, পথচলাটা মোটেও অত সহজ ছিল না। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে পড়ার সময় নিজের লেখা ও সুরে ‘ম্যায়নে রোয়া’ গানটি তৈরি করেছিলেন ইভান। তখন হয়তো নিজেও ভাবেননি, এই গানই একদিন তাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেবে। গত বুধবার পর্যন্ত গানটির ভিউ প্রায় ৩০ কোটি।
২০১৭ সালে নতুন করে গানটি আপলোড করার পর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। পরের বছর স্পটিফাইয়ের যুক্ত হওয়া। এখান থেকেই ইভান বুঝতে পারেন, শুধু দেশেই নয়, ভাষার সীমানা ছাড়িয়ে অন্য দেশের মানুষের মনেও জায়গা করে নিতে পারে গান। তাঁর এই যাত্রা শুধু একটি গানের সাফল্যেই আটকে থাকেনি। ‘অভিযোগ’, ‘অভিমান’, ‘ছেড়ে যেয়ো না’, ‘আয়না’, ‘শূন্য’, ‘বৃষ্টি’, ‘সাগর পাড়ে দাঁড়িয়ে’, ‘তুম বিন’, ‘আকাশ’—প্রতিটি গান যেন একেকটি অনুভূতির গল্প। এর মধ্যে ‘অভিমান’ গানটি মেরিল–প্রথম আলো তারকা জরিপে তাঁকে এনে দেয় সেরা গায়কের স্বীকৃতি।
সংগীতের শক্তি অনুভূতি
তানভীর ইভানের সংগীতের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর অনুভূতি। তাঁর গানের কথায় বারবার খুঁজে পাওয়া যায় না–পাওয়ার বেদনা, অপূর্ণতা, একাকিত্ব। কিন্তু সেটি আর শুধু ব্যক্তিগত কষ্টের গল্প হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে সবার গল্প। হয়তো এ কারণেই তাঁর গান শুনে কেউ নিজের হারানো ভালোবাসাকে খুঁজে পায়, কেউ আবার নিজের না–বলা কথাগুলো শুনতে পায়।
গান প্রকাশে পরিমিতি
তানভীর ইভানের সংগীতজীবনের আরেকটি বিশেষ দিক হচ্ছে গান প্রকাশে পরিমিতি। সংখ্যার চেয়ে নিজের ভালো লাগাটাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন বরাবর। বহুপ্রজ কনটেন্টের এই যুগে যেখানে প্রতিদিন নতুন গান, ভিডিও প্রকাশের চাপ; সেখানে উল্টো পথে হাঁটেন ইভান। ১৩ বছরের সংগীতজীবনে নিজের গাওয়া গানের সংখ্যা ৫০টির বেশি হবে না। কম গান, কিন্তু প্রতিটি গানে অনুভূতির গল্প বলে যাওয়া। ফলাফল—প্রতিটি গানের জন্যই থাকে অপেক্ষা, আলোচনা আর মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ।
স্টেজ শো ও ঢাকামুখী না হওয়া
তানভীর ইভান স্টেজ শোও করেন হাতে গোনা। বছরে ৩–৪টি। ঢাকাকেন্দ্রিক সংগীতের আড্ডা বা সামাজিক অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি নেই বললেই চলে। প্রতিষ্ঠা পেতে সবাই যেখানে ঢাকামুখী, সেখানেও উল্টোমুখী ইভান। মাঝে কয়েক মাসের জন্য ঢাকায় এসেছিলেন, এরপর আবার ফিরে যান জন্মস্থান চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামের খুলশীর বাড়িতে নিজের স্টুডিও আর কিছু কাছের মানুষ—এই ছোট পরিসরেই তাঁর বড় স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়া। তিনি প্রমাণ করেছেন, শিল্পী হওয়ার জন্য বা পরিচিতি পাওয়ার জন্য ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়াটা বাধ্যতামূলক নয়।
পরিবার ও অনুপ্রেরণা
তানভীর ইভানের বাবা ইমতিয়াজ বাবুল বাংলাদেশ রেলওয়ে চট্টগ্রামের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা। মা গৃহিণী, দুই বোন চিকিৎসক। নিজে পড়াশোনা করেছেন কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ে। স্নাতকোত্তর করার আগেই গানকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। বাবা নিজেও গান গাইতেন। ইভান ছোটবেলায় দেখেছেন, আত্মীয়স্বজন বা পরিবারের কারও অনুষ্ঠানে মাইক্রোফোন থাকলে গাইতে মঞ্চে উঠে যেতেন বাবা। ছোটবেলায় বাবাকে মঞ্চে গাইতে দেখে যে স্বপ্ন জন্মেছিল, সেটিই আজ বাস্তব। ইভানের গাওয়া ‘বাবা তুমি আমার বেঁচে থাকার কারণ’ গানটি যখন মানুষকে কাঁদায়, তখন বোঝা যায়—এটি কেবল একটি গান নয়, এটি এক সন্তানের অনুভূতির সরল প্রকাশ। গানটি শুনে কেঁদেছিলেন ইভানের বাবা-মাও।
প্রথাগত তালিম নেই
সংগীতে প্রথাগত কোনো তালিম নেননি ইভান। নিজের চেষ্টায়, শুনে শুনে, বিশেষ করে আতিফ আসলামের গান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। সঙ্গে ছিল বাবার দিকনির্দেশনা। তিনি দেখিয়েছেন—নিজের মতো করে, নিজের জায়গা থেকে, নিজের চেষ্টায় ও আগ্রহে এগিয়েও বৈশ্বিক স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব।



