‘লক আপ’ দ্বিতীয় মৌসুম: বিতর্ক ও সত্যের প্রকাশ নিয়ে নতুন প্রশ্ন
‘লক আপ’ দ্বিতীয় মৌসুম: বিতর্ক ও সত্যের প্রকাশ

ভারতের টেলিভিশন ও ওটিটি দুনিয়ায় এখন একটি প্রশ্নই ঘুরেফিরে আসে—‘লক আপ’ কি সত্যিই সাহসী, নাকি এটি শুধু বিতর্ক বিক্রি করে? এর উত্তর হয়তো একরৈখিক নয়।

একদিকে অনুষ্ঠানটি এমন অনেক সামাজিক বিষয় সামনে এনেছে, যেগুলো নিয়ে সাধারণত প্রকাশ্যে কথা বলা হয় না—মানসিক স্বাস্থ্য, যৌন নির্যাতন কিংবা সম্পর্কের ভাঙন। অন্যদিকে এসব সংবেদনশীল অভিজ্ঞতাকে প্রতিযোগিতার অংশ বানানোর নৈতিকতা নিয়েও প্রশ্ন থেকেই গেছে।

‘লক আপ’ কী এবং কেন এটি আলাদা?

২০২২ সালে যখন প্রযোজক একতা কাপুর ঘোষণা দেন, তিনি ভারতের ‘সবচেয়ে নির্ভীক’ রিয়েলিটি শো নিয়ে আসছেন, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন এটি হয়তো আরেকটি ‘বিগ বস’। কিন্তু প্রথম পর্ব প্রচারের পরই স্পষ্ট হয়ে যায়, ‘লক আপ’ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ধারণা নিয়ে তৈরি। এখানে প্রতিযোগীরা শুধু একটি বাড়িতে বন্দী নন, তাঁদের ‘বন্দী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে থাকে একটি ‘চার্জশিট’—যা বাস্তব জীবনের বিতর্ক, কেলেঙ্কারি বা আলোচিত ঘটনাকে ঘিরে তৈরি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শুরুর সময় থেকেই অনেকের অভিযোগ ছিল, ‘লক আপ’ আসলে ‘বিগ বস’-এর আরেকটি সংস্করণ। তবে নির্মাতাদের দাবি, ‘লক আপ’-এর মূল পার্থক্য হলো এর ‘চার্জশিট’ ধারণা এবং ‘সত্য প্রকাশ’ করার নিয়ম।

‘সাচ ইয়া সাজা’—সত্য নাকি শাস্তি?

দ্বিতীয় মৌসুমের ট্যাগলাইন—‘সাচ ইয়া সাজা’ (সত্য নাকি শাস্তি)। এখানেই অন্য রিয়েলিটি শোগুলোর সঙ্গে এর বড় পার্থক্য। নির্দিষ্ট সময়ে বিপদে পড়া প্রতিযোগীদের সামনে দুটি পথ থাকে—এক. নিজের জীবনের এমন একটি গোপন তথ্য প্রকাশ করা, যা আগে কখনো জনসমক্ষে বলেননি। দুই. সত্য বলতে না চাইলে শাস্তি মেনে নেওয়া।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এই একটি নিয়মই ‘লক আপ’-কে ভারতের সবচেয়ে বিতর্কিত রিয়েলিটি শোতে পরিণত করেছে। সমালোচকদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ, অনুষ্ঠানটি মানুষের ব্যক্তিগত বেদনা ও ট্রমাকে বিনোদনের উপাদানে পরিণত করে। প্রতিযোগীরা টিকে থাকার জন্য কখনো নিজের যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা, কখনো বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, কখনো পারিবারিক সংকট, আবার কখনো মানসিক ভাঙনের কথা প্রকাশ করেন। অনেক মনোবিজ্ঞানীর মতে, ক্যামেরার সামনে এমন স্বীকারোক্তি প্রতিযোগীদের ওপর মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।

প্রথম মৌসুমের ভাইরাল মুহূর্ত

প্রথম মৌসুমে একাধিক ঘটনা আলোড়ন তোলে। স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান মুনাওয়ার ফারুকি নিজের ব্যক্তিগত জীবনের নানা অজানা তথ্য প্রকাশ করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনিই শোয়ের বিজয়ী হন। অন্যদিকে পুনম পাণ্ডে ঘোষণা দিয়েছিলেন, দর্শক তাঁকে বাঁচালে তিনি সাহসী ফটোশুট করবেন। সেই মন্তব্য কয়েক দিন ধরে ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল।

এ ছাড়া নিশা রাওয়াল নিজের দাম্পত্য জীবনের নির্যাতনের কথা বলেন। সাইশা শিন্ডে লিঙ্গ-পরিচয় পরিবর্তনের পর নিজের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এই স্বীকারোক্তিগুলো একদিকে সহানুভূতি কুড়িয়েছে, অন্যদিকে শোয়ের নৈতিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

দ্বিতীয় মৌসুমে নতুন রূপ

চার বছর পর দীর্ঘ বিরতি শেষে ২০২৬ সালে দ্বিতীয় মৌসুম নিয়ে ফিরেছে ‘লক আপ’। তবে এবার অনেক কিছুই বদলেছে। প্রথম মৌসুমে সঞ্চালক ছিলেন কঙ্গনা রনৌত। দ্বিতীয় মৌসুমে মূল সঞ্চালনার দায়িত্ব পেয়েছেন ফারাহ খান ও রিতেশ দেশমুখ। কঙ্গনা এবার নিয়মিত সঞ্চালক নন, বিশেষ পর্বে ‘জনতার কণ্ঠ’ (জনতা কী আওয়াজ) হিসেবে হাজির হচ্ছেন।

আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো, এবার অনুষ্ঠানটি আগের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে নেটফ্লিক্সে সম্প্রচারিত হচ্ছে। ফলে এর দর্শকসংখ্যা ও আন্তর্জাতিক পৌঁছানো—দুই-ই বেড়েছে। ‘লক আপ: সাচ ইয়া সাজা’-এর দ্বিতীয় মৌসুম এবার স্ট্রিমিং হচ্ছে নেটফ্লিক্সে। অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করছেন ফারাহ খান ও রিতেশ দেশমুখ। প্রতিযোগীদের তালিকায় রয়েছেন অভিনেতা রাম কাপুর, ধীরাজ ধুপার, হর্ষদ চোপড়া, শিবাঙ্গী জোশি এবং রিয়েলিটি তারকা শ্রেয়া কালরা, যোগেশ রাওয়াত, আকাঙ্ক্ষা চৌধুরীসহ অনেকে। প্রতি শনিবার থেকে বুধবার রাত ৮টায় নেটফ্লিক্সে প্রকাশিত হচ্ছে নতুন পর্ব।

মুক্তির পর শোটি জনপ্রিয় হয়েছে বাংলাদেশেও। চলতি সপ্তাহে নেটফ্লিক্সের বিদেশি ভাষার সিরিজের তালিকায় বাংলাদেশ থেকে শীর্ষে আছে ‘লক আপ’।

নতুন মৌসুমে নতুন বিতর্ক

নতুন মৌসুম শুরু হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই একের পর এক বিতর্ক সামনে এসেছে। টেলিভিশন অভিনেতা রাম কাপুরের অতীত মন্তব্য নিয়ে কঙ্গনা রনৌত প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলেন। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। অন্য একটি পর্বে প্রতিযোগী আকাঙ্ক্ষা চামোলা নিজের অতীত সম্পর্ক নিয়ে খোলামেলা স্বীকারোক্তি দেন, যা নিয়ে অনলাইনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

এদিকে শ্রেষ্ঠা আইয়ার, ভারতীয় ক্রিকেটার শ্রেয়াস আইয়ারের বোন, প্রথম প্রতিযোগী হিসেবে বাদ পড়েছেন। বিদায়ের আগে তিনি বলেন, শুধু ‘শ্রেয়াসের বোন’ নয়, নিজের পরিচয় তৈরি করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য।

কঙ্গনার উপস্থিতি এখনো বড় আকর্ষণ

যদিও এবার কঙ্গনা নিয়মিত সঞ্চালক নন, তবু তাঁর উপস্থিতিই এখনো শোয়ের অন্যতম বড় আকর্ষণ। সম্প্রতি তিনি বলেন, ‘এই শো সব সময় নিজের সত্যকে স্বীকার করার গল্প। সত্য যত অস্বস্তিকরই হোক না কেন।’ কঙ্গনার সরাসরি প্রশ্ন, তীক্ষ্ণ মন্তব্য ও বিতর্কিত বিষয় নিয়ে নির্ভীক অবস্থানই ‘লক আপ’-কে অন্য রিয়েলিটি শো থেকে আলাদা করেছে।

নতুন মৌসুম নিয়ে এক বিবৃতিতে কঙ্গনা বলেন, ‘এই শো সব সময়ই নিজের সত্যকে স্বীকার করার গল্প। সেই সত্য যত অস্বস্তিকরই হোক না কেন। শুধু এটুকুই বলব—প্রতিটি সিদ্ধান্তেরই একটি মূল্য আছে।’

জনপ্রিয়তা নাকি বিতর্ক?

ভারতের টেলিভিশন ও ওটিটি দুনিয়ায় এখন একটি প্রশ্নই ঘুরেফিরে আসে—‘লক আপ’ কি সত্যিই সাহসী, নাকি এটি শুধু বিতর্ক বিক্রি করে? এর উত্তর হয়তো একরৈখিক নয়। একদিকে অনুষ্ঠানটি এমন অনেক সামাজিক বিষয় সামনে এনেছে, যেগুলো নিয়ে সাধারণত প্রকাশ্যে কথা বলা হয় না—মানসিক স্বাস্থ্য, যৌন নির্যাতন কিংবা সম্পর্কের ভাঙন। অন্যদিকে এসব সংবেদনশীল অভিজ্ঞতাকে প্রতিযোগিতার অংশ বানানোর নৈতিকতা নিয়েও প্রশ্ন থেকেই গেছে।

হয়তো এ কারণেই ‘লক আপ’কে কেউ দেখেন সাহসী বাস্তবতার আয়না হিসেবে, আবার কেউ বলেন—এটি বিতর্ককে পণ্য বানানোর আরেকটি সফল ব্যবসায়িক মডেল।