সেলিব্রিটিদের প্রতারণা স্বাভাবিক করার প্রবণতা সম্পর্কের সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছে
সেলিব্রিটিদের প্রতারণা স্বাভাবিক করার প্রবণতা সম্পর্ক বদলে দিচ্ছে

বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা—যেকোনও সম্পর্কের এই দুটি মূল স্তম্ভকে উইপোকার মতো কুড়ে কুড়ে খায় বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বা প্রতারণা। ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত আইনগুলোতে এমন সম্পর্ককে বিবাহবিচ্ছেদের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে গণ্য করা হলেও, বর্তমান যুগে সেলিব্রিটিরা যেন একে একটি স্বাভাবিক সাধারণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরছেন। আর তারকাদের এমন অবস্থান আধুনিক সমাজ ও সম্পর্কের সমীকরণ বদলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সেলিব্রিটিদের বক্তব্য ও সমাজে প্রভাব

সম্প্রতি ভারতীয় অভিনেতা রাম কাপুর মন্তব্য করেছেন, সম্পর্কের টানাপোড়েনের সময় একজন মানুষ ‘ভুল করে’ সঙ্গীর সঙ্গে প্রতারণা করতে পারে। এর আগে টুইঙ্কেল খন্না ও কাজলের এক আলাপচারিতায় বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক প্রসঙ্গে উপস্থাপকের ‘রাত ফুরোলে কথা ফুরোয়’ মন্তব্যটি ইন্টারনেট দুনিয়ায় তীব্র সমালোচনার ঝড় তোলে। বহু দশক ধরে তারকাদের এসব গোপন সম্পর্কের খবর কেবল ট্যাবলয়েডের গসিপ মনে হলেও, তা যে সাধারণ মানুষের মানসিকতায় ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনছে, তা অলক্ষ্যেই থেকে গেছে।

বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সংজ্ঞা ও বিশেষজ্ঞ মতামত

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ড. দীপিকা শর্মা জানান, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সংজ্ঞা কেবল শারীরিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত পারস্পরিক বিশ্বাসের লঙ্ঘন। আবেগঘন সম্পর্ক, গোপনে রোমান্টিক বার্তা আদান-প্রদান, ডেটিং অ্যাপের ব্যবহার লুকিয়ে রাখা কিংবা সঙ্গীর অজান্তে অনলাইনে ঘনিষ্ঠ হওয়া, সবই এর অন্তর্ভুক্ত।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অ্যান্ডউইমেট-এর প্রতিষ্ঠাতা শালিনী সিং বলেন, প্রতারণা কোনও নির্দিষ্ট কাজের বিষয় নয়, বরং এটি দুজনের মধ্যকার পারস্পরিক বিশ্বাস ও প্রত্যাশা ভেঙে ফেলা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মনোবিজ্ঞানী ড. চাঁদনী তুগনাইত জানান, যখন কোনও জনপ্রিয় তারকা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে শুধু একটি ‘ভুল’ বলে চালিয়ে দেন, তখন সমাজের চোখেও এটি ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করে। একই সঙ্গে সমাজে এর দ্বিচারিতাও স্পষ্ট। কোনও নারী যদি প্রতারক সঙ্গীকে প্রকাশ্যে ক্ষমা করে দেন, তবে তাকে ‘উদার’ বলে প্রশংসা করা হয়; অথচ একই পরিস্থিতিতে একজন পুরুষের ক্ষোভ প্রকাশকে খুব স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আধুনিক সম্পর্ক

ড. শর্মা আরও ব্যাখ্যা করেন, ইতিহাসে ধনী ও শক্তিশালী পুরুষদের একাধিক সঙ্গী রাখার নিয়ম থাকলেও বর্তমানের সুস্থ সম্পর্কগুলো জীববিজ্ঞানের চেয়ে পারস্পরিক সম্মতি, সমতা ও বিশ্বাসের ওপর বেশি নির্ভরশীল।

তারকাদের খ্যাতি ও অর্থ অনেক সময় তাদের এই ক্ষতিসাধনকারী আচরণকে আড়াল করে দেয়। ড. তুগনাইত বলেন, তারকাদের ক্ষেত্রে নিয়মগুলো যেন কাজ করা বন্ধ করে দেয়; ফলে তাদের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে শুধু ‘কঠিন সময়’ হিসেবে তকমা দেওয়া হয়। গণমাধ্যম ও পিআর এজেন্সিগুলো যখন এগুলোকে মুখরোচক গল্প হিসেবে বিক্রি করে, তখন এর পেছনের মানসিক ট্রমা ও কষ্টের খবর হারিয়ে যায়।

প্রযুক্তির ভূমিকা ও বর্তমান প্রবণতা

গত ১০ থেকে ২০ বছরে সোশ্যাল মিডিয়া ও মেসেজিং অ্যাপের কারণে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের বিষয়টি অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। মানুষ এখনও প্রতারিত হলে একই রকম কষ্ট পায়, তবে অনলাইন ও তারকা সংস্কৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আজকাল অনেকেই ‘প্রতারণার’ পরিধি ও সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করার চেষ্টা করছে, যা আধুনিক সম্পর্কের সীমানাকেই বদলে দিচ্ছে।

সূত্র: এনডিটিভি