অভিনেতা শামস সুমনের আকস্মিক মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীরা। গত ১৭ মার্চ অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়া এই প্রিয় সহকর্মীকে স্মরণ করতে একত্রিত হয়েছেন শিল্পীরা, যেখানে উঠে এসেছে তাঁর দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা এবং মানবিক দিক।
স্মরণে একাত্মতা
'প্রিয় বন্ধু শামস সুমন স্মৃতিতে অম্লান' শীর্ষক স্মরণ আয়োজনে অভিনেতা তৌকীর আহমেদ বলেন, 'সুমনের মতো মানুষ খুব বেশি নাই আমাদের মধ্যে। সে আমার সিনেমা ও নাটকেও অভিনয় করে। আমরা অসংখ্যবার কাজ করেছি। একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে লক্ষ করি, আমাদের অনেকের চেয়েই তার যোগ্যতা কম নয়—বেশি।' তিনি আরও উল্লেখ করেন যে শামস সুমনের অভিনয়ে একটি আলাদা ভঙ্গি ছিল, তাঁর উচ্চারণে স্মার্টনেস এবং রসবোধ ছিল, যা সমসাময়িক অনেক অভিনয়শিল্পীর চেয়ে উন্নত ছিল।
রাজশাহী থেকে শুরু যাত্রা
শামস সুমনের সাংস্কৃতিক যাত্রার শুরু রাজশাহী থেকে। স্কুলজীবনে রাজশাহী বেতারে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর পথচলা শুরু হয়। পরে রেডিও নাটক, উপস্থাপনা এবং সংবাদপাঠের মাধ্যমে তিনি নিজের ভরাট ও মায়াময় কণ্ঠের শক্তি প্রদর্শন করেন, যা একসময় তাঁকে টেলিভিশনের পর্দায় নিয়ে আসে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবৃত্তি সংগঠন 'স্বনন'-এর মাধ্যমে তিনি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেন এবং নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে অবদান
নব্বইয়ের দশকে টেলিভিশন নাটকের মাধ্যমে শামস সুমন পরিচিত ও প্রিয় মুখ হয়ে ওঠেন। 'অহংকার', 'অনুরাগ', 'যদি ভালোবাসো', 'এই তো আমাদের বাড়ি', 'রাতের অতিথি', 'অতন্দ্র প্রহর', 'খোঁজ' সহ বহু নাটকে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। চলচ্চিত্রেও তাঁর বিচরণ ছিল উল্লেখযোগ্য, যেমন 'জয়যাত্রা', 'বিদ্রোহী পদ্মা', 'আয়না কাহিনি', 'প্রিয়া তুমি সুখী হও', 'চোখের দেখা', 'মন জানে না মনের ঠিকানা'। শহীদুল ইসলাম খোকনের 'স্বপ্নপূরণ' ছবিতে অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছিলেন।
শূন্যতা ও আক্ষেপ
তৌকীর আহমেদের মতে, শামস সুমনের মৃত্যু একটি শূন্যতা তৈরি করেছে। তিনি বলেন, 'সুমন একটা বেদনার নাম। তাকে আমরা আরও বড় জায়গায় ঢেলে দিতে পারিনি। হয়তোবা সে নিজেও চায়নি। সে শুটিং ইউনিটের প্রাণ হয়ে বেঁচে থাকত। সুমন শোআপ করেনি। ও মনে করত, ওর যত টুকু যোগ্যতা–দক্ষতা, সেটাই তাকে তার অবস্থানে নিয়ে যাবে। আমার আক্ষেপ, সুমনের আরও অনেক বড় জায়গায় থাকার কথা ছিল।'
স্মরণ অনুষ্ঠানের বিস্তার
গত বৃহস্পতিবার অভিনয়শিল্পী সংঘ থেকে শামস সুমনকে স্মরণ করা হয়, যেখানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলে আয়োজনটি অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সংগঠন রাবিয়ান সাংস্কৃতিক কর্মী সম্মিলন আজ শনিবার সন্ধ্যা সাতটায় শিল্পকলা একাডেমির চিত্রশালা মিলনায়তনে তাঁকে স্মরণ করছে। এই অনুষ্ঠানগুলিতে তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে, যা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের একটি অংশ।
শামস সুমন শুধু একজন অভিনেতাই ছিলেন না, বরং সমাজ-রাজনীতির প্রতিও তাঁর গভীর সংবেদনশীলতা ছিল, যা জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত অটুট ছিল। তাঁর এই বহুমুখী প্রতিভা এবং মানবিক গুণাবলী তাঁকে সহকর্মীদের মধ্যে অমর করে রেখেছে।



