নিশা সিং: বিজ্ঞাপনচিত্র থেকে বলিউডের এক অনন্য যাত্রা
আশির ও নব্বইয়ের দশকের বলিউড জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন নিশা সিং। কলেজ ক্যানটিনে একটি বিজ্ঞাপনের ভিডিও টেস্ট থেকে শুরু হয়ে তাঁর যাত্রা পৌঁছে যায় হিন্দি সিনেমা ও টেলিভিশনের আলোচিত প্রজেক্টে। অথচ ক্যারিয়ারের চূড়ায় থাকতেই তিনি হঠাৎ সবকিছু ছেড়ে দিয়ে বেছে নেন পারিবারিক জীবন। বহু বছর পর ফিরে তাকিয়ে তিনি স্মরণ করছেন সেই সব অভিজ্ঞতা, যেখানে সহ-অভিনেতা নানা পাটেকর শুরুতে তাঁকে ‘দেখেই অপছন্দ’ করেছিলেন, কিন্তু পরে সেই সন্দেহই পরিণত হয় গভীর স্বীকৃতিতে।
কলেজ ক্যানটিন থেকে বলিউডের পথে
মালাবার হিলে বেড়ে ওঠা এক শিখ পরিবারের মেয়ে নিশা সিংয়ের আদৌ অভিনয় করার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। কলেজ ক্যানটিনে একদিন বহুজাতিক কোম্পানির একটি বিজ্ঞাপনের ভিডিও টেস্টের প্রস্তাব আসে। বিজ্ঞাপন-নির্মাতা অ্যালিক পদমসির পরিচালনায় এটি ছিল একটি প্রসাধনী বিজ্ঞাপনচিত্রের সূচনা। নিশা প্রথমে রাজি হননি, কারণ পরিবার অনুমতি দেবে না বলে তাঁর আশঙ্কা ছিল। শেষ পর্যন্ত পদমসি তাঁর বাবার সঙ্গে কথা বলে আশ্বস্ত করলে শুরু হয় এই যাত্রা।
বিজ্ঞাপনটি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে বাবা একটি শর্ত দেন: মাসে একটি বিজ্ঞাপনের বেশি নয়, পড়াশোনাই আগে। এই সীমাবদ্ধতাই তাঁকে ‘ওভারএক্সপোজড’ হতে দেয়নি; বরং বাছাই করা কাজের সুযোগ এনে দিয়েছে।
সিনেমায় প্রবেশ: কাকতালীয় অথচ স্মরণীয় মুহূর্ত
পৃথ্বী থিয়েটারে যাওয়া থেকে পরিচয় হয় চলচ্চিত্রকার এম এস সাথিউর সঙ্গে। তাঁর অনুপ্রেরণায় নিশা অভিনয় করেন ‘কাহাঁ কাহাঁ সে গুজর গায়া’-তে, যেখানে বিপরীতে ছিলেন অনিল কাপুর। ছবিটি ভারতে বড় পরিসরে মুক্তি না পেলেও আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রশংসা কুড়ায়।
এরপর আসে সাগর সারহাদির ‘বাজার’। এই ছবিতে আরও ছিলেন সুপ্রিয়া পাঠক ও ফারুক শেখ। নিশা প্রথমে ভেবেছিলেন, এটি ত্রিভুজপ্রেমের কেন্দ্রীয় গল্প; পরে বুঝতে পারেন, তাঁর চরিত্রটি সহায়ক। টাইপকাস্টিং এড়াতে তিনি বড় ভূমিকার অপেক্ষা করেন।
স্মিতা পাতিলের কঠিন সতর্কবার্তা ও ধারণার বদল
‘বাজার’-এর শুটিংয়ে স্মিতা পাতিল তাঁকে সরাসরি বলেন, তাঁর শরীরী ভাষা ও উপস্থিতি তথাকথিত আর্ট-হাউস ধারার সঙ্গে মেলে না। এমনকি শ্যাম বেনেগালও নাকি বলেছিলেন, তিনি গ্রামীণ কাহিনির জন্য ‘অতিমাত্রায় রাজকন্যাসুলভ’। তবে পরে বেনেগালই তাঁকে ‘ভারত এক খোঁজ’-এ রাজকুমারী সংযুক্তার ভূমিকায় নেন, সময়ের সঙ্গে ধারণা বদলায়।
‘অঙ্কুশ’ ও নানা পাটেকরের সন্দেহ থেকে স্বীকৃতি
পরিচালক এন চন্দ্রার ‘অঙ্কুশ’-এ সুযোগ পাওয়া ছিল নিশা সিংয়ের ক্যারিয়ারের একটি বড় মোড়। কিন্তু সহ-অভিনেতা নানা পাটেকর শুরুতে ক্ষুব্ধ ছিলেন। নিশার কথায়, ‘নানা আমাকে দেখেই অপছন্দ করেছিলেন। বলেছিলেন, “এই মেয়েকে দিয়ে কীভাবে কাজ হবে?”’
তবে কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর অভিনয় দেখে নানা নাকি মাথায় হাত রেখে বলেন, ‘চল, হবে’ এবং হয়ে ওঠেন সবচেয়ে নিবেদিত সহ-অভিনেতা। এই ঘটনা প্রমাণ করে, প্রাথমিক সন্দেহও শেষ পর্যন্ত শ্রদ্ধায় রূপান্তরিত হতে পারে।
টেলিভিশনে জনপ্রিয়তা ও নিয়মিত উপস্থিতি
নব্বইয়ের দশকে তিনি টেলিভিশনে নিয়মিত হন, ‘বুনিয়াদ’ এবং ভারতের প্রথম ইংরেজি ধারাবাহিক ‘আ মাউথফুল অব স্কাই’-এ কাজ করেন। সহশিল্পীদের মধ্যে ছিলেন মিলিন্দ সোমান ও রাহুল বসু। কাজের চাপ বাছাই করে নেওয়ার স্বাধীনতা ছিল; মাসে নির্দিষ্ট দিন কাজ করতেন, যা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও পেশার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
শিখরে থাকতেই সরে দাঁড়ানো: পারিবারিক জীবনের পথ
১৯৯৭ সালে বিয়ে করে সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমান নিশা সিং। তখন যেসব ধারাবাহিকগুলোয় তাঁর চরিত্র ছিল, সেগুলো হঠাৎ ‘অদৃশ্য’ হয়ে যায়। প্রযোজকেরা বিদেশে শুটিংয়ের প্রস্তাব দিলেও নিশা রাজি হননি। তাঁর কথায়, অভিনয় ছিল ‘শখ’; ‘পেশা’ নয়। ১৯৯৮ সালে কন্যাসন্তানের জন্মের পর তিনি পুরোপুরি অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
পরে পারিবারিক কারণে ভারতে ফিরে এলেও নতুন করে ক্যারিয়ার শুরু করেননি। ‘আমি কাজ মিস করেছি, কিন্তু মেয়েকে বড় করে তোলাই আমার সেরা কাজ’, বলেছেন তিনি। আজও নিশা সিং ব্যক্তিগত জীবনকে আড়ালেই রাখতে চান। তাঁর বিশ্বাস, সবকিছু সবার জানার দরকার নেই; নিজের মতো করে তিনি বেশ আছেন।
