জায়েদ খানের আমেরিকায় রোজা: দেশের স্মৃতি আর প্রবাসের বিষাদ
জায়েদ খানের আমেরিকায় রোজা: দেশের স্মৃতি আর বিষাদ

জায়েদ খানের আমেরিকায় রোজা: দেশের স্মৃতি আর প্রবাসের বিষাদ

ঢালিউডের আলোচিত ও বিতর্কিত অভিনেতা জায়েদ খান প্রায় দুই বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। সেখানেও কাজের ব্যস্ততার মধ্যেই রমজানের রোজা পালন করছেন তিনি। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি রোজা নিয়ে নিজের দর্শন, উপলব্ধি এবং দেশের প্রতি গভীর মায়ার কথা জানিয়েছেন।

প্রবাসে রোজার অনুভূতি

জায়েদ খান বলেন, "এখানে সময়, পরিবেশ ও মানুষ— সবকিছুই আলাদা। তবু নিজের ভেতরে একটা চেষ্টা অনুভব করলাম যে রোজা রাখতেই হবে। এ অনুভূতিটা একজন মুসলিম হিসেবে দারুন লেগেছে আমার কাছে।" তিনি উল্লেখ করেন, আমেরিকায় বাংলাদেশের একদিন আগেই রমজান শুরু হয়, কারণ সেখানে সৌদি আরবের সঙ্গে মিলিয়ে রোজা রাখা হয়।

তিনি দেশের স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। "দেশে থাকলে এই সময়টাতে বাসায় একটা অন্যরকম আমেজ থাকত। মায়ের হাতের নানা পদের রান্নার সুগন্ধ, ভাই-বোনদের ঘুম ঘুম মুখ, আজানের অপেক্ষা… এখানে সেই কোলাহল নেই। নেই মাইকে ডেকে দেওয়ার শব্দ। চারপাশটা অনেক বেশি শান্ত। ভেতরে ভেতরে একটা শূন্যতাও কাজ করে।"

দেশের মায়া ও ইফতারের স্মৃতি

জায়েদ খান স্বীকার করেন যে তিনি দেশকে ভীষণ মিস করেন। "বাংলাদেশে থাকলে রোজার যে আলাদা একটা ফিলিংস পেতাম, সেই আবহটা এখানে পাই না। ভাই-বোনদের খুব মিস করি। সহকর্মীদেরও মিস করি।" তিনি বলেন, দেশে থাকলে বিভিন্ন জায়গায় ইফতার পার্টিতে যেতেন এবং ঢাকায় থাকলে বাসায় ইফতার করার চেষ্টা করতেন।

তিনি আরও যোগ করেন, "সবার সঙ্গে একসঙ্গে বসে ইফতার করতে ভীষণ ভালো লাগত। বাসার রান্নার স্বাদটাই আলাদা। বাইরে খাবার তেমন ভালো লাগে না। আমেরিকায় সেই ধর্মীয় আবহটা তেমন বোঝা যায় না। ইফতারের সময় টুপি পরে বের হওয়া, সময়মতো মাইকে আজানের ডাক শোনা, মায়ের হাতে বানানো ইফতার— এসব ছাড়া আমেরিকার রোজা যেন সত্যি বিষাদে মোড়ানো।"

শৈশবের প্রথম রোজার স্মৃতি

প্রথম রোজা রাখার স্মৃতি স্পষ্ট করে মনে আছে জায়েদ খানের। তিনি বলেন, "তখন খুব ছোট, তিন ভাই-বোনের মধ্যে আমি ছিলাম সবার ছোট। বড়দের দেখে আমিও জেদ ধরলাম— আমাকেও রোজা রাখতে হবে। বড়রা বলছিল— ‘তুই পারবি না’। কিন্তু আমি তো নাছোড়বান্দা! জোর করেই সেহরি খেয়ে রোজা শুরু করলাম।"

সকালটা কোনোভাবে কেটে গেলেও দুপুরের পর থেকেই কষ্ট বাড়তে থাকে। "বিকালের দিকে তো অবস্থা আরও খারাপ। ক্ষুধা আর তৃষ্ণায় ফ্লোরে গড়াগড়ি খেতে শুরু করলাম। সবাই হাসছিল, আর আম্মা মায়া মেশানো হাসিতে বললেন, ‘আচ্ছা, খেয়ে ফেলো। রোজা হয়েছে।’ আম্মা বলার পর আর দেরি করিনি। দৌড়ে গিয়ে খেয়ে ফেলেছিলাম।" সেই অসমাপ্ত রোজাটাই আজ সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে তার, কারণ সেটার ভেতরেই ছিল ছোটবেলার জেদ, সরলতা আর পরিবারের ভালোবাসা।

শৈশব ও বর্তমান রোজার পার্থক্য

জায়েদ খান শৈশব ও বর্তমান সময়ের রোজার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য টানেন। "শৈশবে রোজা মানে লুকিয়ে খেয়ে ফেলা। মনে হতো, লুকিয়ে খেলে কেউ দেখবে না, রোজা ঠিক হয়ে যাবে। তখন রোজা ছিল যেন একটা নিয়ম মানার চেষ্টা, কিন্তু তার গভীরতা বুঝতাম না।"

তিনি বলেন, "কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধিটা বদলে গেছে। এখন বুঝেছি— রোজা শুধু না খেয়ে থাকা নয়। এটা আল্লাহকে ভয় করা, অন্তর থেকে তার সন্তুষ্টি চাওয়া। সত্যিকারের রোজা হলো নিজের ভেতরের নিয়ন্ত্রণ, তাকওয়া আর আন্তরিকতা। কেউ না দেখলেও আল্লাহ দেখছেন— এই বিশ্বাস থেকেই রোজা পূর্ণতা পায়।"

সহজ ভাষায় তিনি বলেন, "শৈশবের রোজা ছিল অভ্যাসের, এই সময়ের রোজা হলো সচেতনতার। এখন নিজে বুঝতে শিখেছি, ধর্মটা কেবল পালন করার বিষয় নয়— অনুভব করারও বিষয়। রোজাটা আসলে কীভাবে ঠিকভাবে রাখতে হয়, কেন রাখতে হয়; সেটি ধীরে ধীরে জানছি, শিখছি, আর মানার চেষ্টা করছি।"

শৈশব-কৈশোরের মজার স্মৃতি

রমজানের সময় শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি নস্টালজিক করে জায়েদ খানকে। তিনি বলেন, "রমজান এলেই বন্ধুদের সঙ্গে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম পিরোজপুরের বাজারের দিকে। ইফতারের জন্য তরমুজ, ফল আর টুকটাক যা পাওয়া যায় সব কিনে আনতে যেতাম। তখন মফস্বল শহরে ফ্রিজ ছিল না বললেই চলে। তাই গরমের দিনে ঠান্ডা শরবতের স্বাদ পেতে আইসক্রিম ফ্যাক্টরি থেকে পলিথিনে করে বরফ কিনে সাইকেলে করে বাড়ি ফিরতাম।"

সেই বরফ গলতে গলতেই যেন ছড়িয়ে পড়ত রোজার বিকালের অন্যরকম উত্তেজনা। "তরমুজটা মিষ্টি কিনা, সেটাও ছিল আলাদা টেনশন। পথে এক বড় ভাই থাকতেন, তিনি একটু খেয়ে ‘চেক’ করে দিতেন— ভালো হয়েছে কিনা! এই ছোট ছোট ঘটনাগুলোই আজও আমার কাছে অমূল্য স্মৃতি।"

তিনি আরও জানান, সারাদিন নামাজ পড়তে না গেলেও তারাবির নামাজ পড়তে মসজিদে ছুটে যেতেন। "এমনও হয়েছে, খুব উত্তেজনা নিয়ে তারাবির নামাজ পড়তে গিয়ে মাত্র দুই-চার রাকাত পড়েই বন্ধুদের সঙ্গে চুপিসারে বেরিয়ে পড়েছি। নামাজের মাহাত্ম্যটা তো তখন বুঝতাম না। এমনকি আমরা পড়াশোনা থেকে বাঁচতে নামাজের কথা বলে আড্ডা মারতাম বন্ধুরা মিলে।"

জায়েদ খানের এই কথাগুলো প্রবাসে বসবাসকারী অনেক মুসলিমের হৃদয় স্পর্শ করতে পারে, যারা দেশের রমজানের আবহ আর পরিবারের সান্নিধ্য মিস করেন। তার অভিজ্ঞতা শুধু একজন অভিনেতার গল্প নয়, বরং একজন সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও স্মৃতির প্রতিফলন।