তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে অভিনেতা থালাপতি বিজয়ের দল তামিলাগা ভেট্টি কাজগম (টিভিকে)-এর বিশাল সাফল্য কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ছয় ধাপের মাস্টারপ্ল্যান। কীভাবে বিজয়ের ভক্তরা একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে এবং তামিল রাজনীতির সমীকরণ বদলে দিয়েছে, তার নেপথ্যে রয়েছে এক অনন্য রণকৌশল।
ফ্যান ক্লাব থেকে পরিকাঠামো
বিজয়ের শুরুটা হয়েছিল বিশাল জনভিত্তি দিয়ে। তামিলনাড়ু জুড়ে ছড়িয়ে থাকা তাঁর লক্ষ লক্ষ ভক্তদের নিয়ে গঠিত ‘রাসিগার মানদ্রাম’ (ফ্যান ক্লাব) গুলোকে তিনি কেবল সিনেমার প্রচারে সীমাবদ্ধ রাখেননি। রক্তদান কর্মসূচি, ত্রাণ কাজ এবং সামাজিক প্রচারের মাধ্যমে এই ক্লাবগুলোকে সমাজসেবামূলক সংস্থায় রূপান্তর করা হয়। ফলে নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই ভোটারদের সঙ্গে দলের এক ধরনের অরাজনৈতিক ও গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়।
স্থানীয় নির্বাচনে ‘টেস্ট ড্রাইভ’
২০২১ সালে বিজয় সরাসরি কোনও দল ঘোষণার আগেই স্থানীয় নির্বাচনে এই নেটওয়ার্কের ক্ষমতা পরীক্ষা করেন। কোনও দলীয় প্রতীক ছাড়াই প্রায় ১৬৯ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে লড়াই করেন, যার মধ্যে ১১৫ জন জয়ী হন। এই ফলাফল প্রমাণ করে যে, বিজয়ের ভক্তদের এই নেটওয়ার্ক প্রার্থী বাছাই, বুথ ব্যবস্থাপনা ও ভোট সংহতকরণে কতটা দক্ষ।
আবেগের চেয়ে শৃঙ্খলা বড়
পরবর্তী পর্যায়ে বিজয় কেবল ভক্তদের ওপর নির্ভর না করে ‘কর্পোরেট ধাঁচে’ কর্মী বাছাই শুরু করেন। ইন্টারভিউ, ব্যাকগ্রাউন্ড চেক এবং নির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টনের মাধ্যমে ওয়ার্ড ইনচার্জ থেকে শুরু করে বুথ এজেন্ট, সব পদে যোগ্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে আবেগি ভক্তরা পরিণত হয় সুশৃঙ্খল ক্যাডারে।
প্রতীকের জাদু
বিজয়ের নির্বাচনী প্রতীক ‘শিস’ (হুইসেল) খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। এই প্রতীকটিকে কেবল ব্যানারে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া হয়। নারীরা তাঁদের বাড়ির সামনে হুইসেল আকৃতির ‘কোলাম’ (রঙ্গোলি) আঁকতে শুরু করেন, যা স্থানীয় স্তরে সমর্থনের এক দৃশ্যমান মানচিত্র তৈরি করে। এটি ছিল একটি সিস্টেম-চালিত প্রচারণা।
প্রচারের নেপথ্যে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক
প্রচারণার নেপথ্যে কাজ করেছে আগে থেকে তৈরি করে রাখা এক ডিজিটাল মেশিন। বছরের পর বছর ধরে সক্রিয় থাকা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলো হয়ে ওঠে প্রচারের প্রধান মাধ্যম। দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিজয় নিজেই কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছেন। স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক থেকে পাওয়া তথ্য বা বুথ পর্যায়ের প্রতিক্রিয়া দ্রুত নিচে পৌঁছে দেওয়া হতো, যার মূল ফোকাস ছিল দুর্নীতি, জনকল্যাণ ও যুবসমাজ।
‘অনীল’ আর্মি
বিজয়ের সমর্থকদের তামিল রাজনীতিতে ‘অনীল’ বা কাঠবিড়ালি নামে ডাকা হয়। ২০১১ সালে রামায়ণের সেই কাঠবিড়ালির গল্পের আদলে এই নামটির উৎপত্তি, যে ভগবান রামকে লঙ্কায় সেতু তৈরিতে সাহায্য করেছিল। অর্থাৎ, ছোট ছোট অবদান মিলে বড় জয় নিশ্চিত করতে পারে। শুরুতে প্রতিপক্ষরা বিদ্রুপের ছলে এই নাম ব্যবহার করলেও, বিজয়ের সমর্থকরা একেই নিজেদের পরিচয়ের গর্বের তকমা হিসেবে গ্রহণ করেছে।
এভাবেই ছয়টি সুনির্দিষ্ট ধাপে, ভক্তদের আবেগকে সংগঠিত শক্তিতে রূপান্তর করে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ‘হ্যাক’ বা বড় ধরনের চমক সৃষ্টি করেছে বিজয়ের দল।



