৩৫ বছর ধরে সংবাদপত্র বিলি করে যাচ্ছেন ফখরু
৩৫ বছর ধরে সংবাদপত্র বিলি করছেন ফখরু

স্মার্টফোনের স্পর্শে যখন মুহূর্তেই দেশ-বিদেশের সব খবর পৌঁছে যাচ্ছে, তখনও সূর্য ওঠার আগেই পত্রিকার ব্যাগ তুলে নেন হকার ফখরু। শহরের অলিগলি, দোকানপাট, সরকারি-বেসরকারি অফিস, স্কুল-কলেজ আর বাসাবাড়িতে হেঁটে হেঁটে পৌঁছে দেন সংবাদপত্র।

৩৫ বছরের নিষ্ঠা

তীব্র ঝড়-বৃষ্টি-শীতসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপেক্ষা করে ৩৫ বছর ধরে একই ছন্দে মানুষের দ্বারে দ্বারে খবর পৌঁছে দেওয়ার এই মানুষটির পুরো নাম আব্দুল গফফার ফখরুদ্দীন; কিন্তু তিনি সৈয়দপুর শহরে ‘ফখরু’ নামেই পরিচিত।

জানা যায়, নীলফামারীর সৈয়দপুর পৌরসভাধীন মুন্সিপাড়া এলাকার বাসিন্দা মরহুম আব্দুল সাত্তারের ছেলে ফখরু। যৌবনকাল থেকেই পত্রিকা বিলির পেশায় যুক্ত হন তিনি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফখরু বলেন, “আমি যখন কাজ শুরু করি তখন পত্রিকার সংখ্যা ছিল কম, হকারও ছিল হাতেগোনা কয়েকজন। প্রতিদিন ভোরে পত্রিকা সংগ্রহ করে বেরিয়ে পড়তাম। রোদ-বৃষ্টি, ঝড় কিংবা শীত কোনো কিছুই আমাকে থামাতে পারেনি। মানুষের হাতে সময়মতো খবর পৌঁছে দেওয়াটাই ছিল আমার দায়িত্ব।”

তিনি বলেন, “একসময় সৈয়দপুর শহরের সকাল শুরু হতো পত্রিকার হকারদের হাঁকডাকে। জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন পত্রিকা নিয়ে ছুটে বেড়াতাম। শহরের বহু পরিবারে সকালের চায়ের সঙ্গে খবরের কাগজ পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল আমার।”

বর্তমান পরিস্থিতি

বর্তমানে তিনি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিস, স্কুল-কলেজ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বাসাবাড়িতে পত্রিকা সরবরাহ করেন। প্রতিদিন প্রায় ৩০০ কপি জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা বিক্রি করেন তিনি। তবে প্রযুক্তির বিকাশ আর ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের প্রসারের কারণে আগের তুলনায় ছাপা পত্রিকার বিক্রি অনেক কমে গেছে।

১৮ জুন দুপুরে হকার ফখরু বলেন, তার স্ত্রী একজন গৃহিণী। পত্রিকা বিক্রির আয়ে তিন সন্তানকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। ইতোমধ্যে দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন এবং এক ছেলে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “পত্রিকা বিক্রির টাকাতেই সংসার চালিয়েছি, সন্তানদের লেখাপড়া করিয়েছি। আগে মানুষ কাগজের জন্য অপেক্ষা করত, এখন মোবাইলেই খবর পড়ে। তাই আয় অনেক কমে গেছে। বয়সও হয়েছে, শরীর আর আগের মতো চলে না। পায়ে হেঁটে কাগজ বিক্রি করা এখন খুব কষ্টের। তারপরও পেটের দায়ে আর এই পেশার প্রতি ভালোবাসায় হকারি করে যাচ্ছি। জীবনের বাকি সময়টাও এ পেশাতেই কাটিয়ে দিতে চাই; কিন্তু দুঃখ হলো, সরকার দেশের অনেককেই স্বাবলম্বী করে দিয়েছেন কিন্তু সংবাদপত্রের হকারদের কেউই খবর রাখেন না।”

প্রবীণ সাংবাদিকের মতামত

সৈয়দপুরের প্রবীণ সাংবাদিক এমআর আলম ঝন্টু বলেন, “সংবাদপত্র মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কারিগর হলো ফখরু। তিনি শুধু একজন হকার নন, সৈয়দপুরের সংবাদপত্র সংস্কৃতির জীবন্ত ইতিহাস। সময়ের পরিবর্তনে বদলে গেছে মানুষের অভ্যাস। কাগজের পাতা ছেড়ে খবর চলে এসেছে মোবাইল ফোনের পর্দায়। তবুও প্রতিদিন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সংবাদপত্র নিয়ে পথে নামেন ফখরুদ্দীন।”

বিগত ৩৫ বছর ধরে সংবাদপত্র নিয়ে পাঠকের হাতে হাতে পৌঁছে দেওয়া এই মানুষটার জন্য কিছু একটা করা দরকার বলে জানান তিনি।