পোল্যান্ডের চেহানোভ শহরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসবের প্রথম দিনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল নবম শ্রেণির এক মেধাবী ছাত্রীর কবিতা। কবি হাসান আলী ও ক্যাতারজিনা যখন একটি নবম শ্রেণির ক্লাসে কবিতা নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তখন ছাত্রী নিকোলা কুকিলেস্কা জানায় সে কবিতা লেখে। পরে বিকেলে বাসযাত্রায় ক্যাতারজিনা হোয়াটসঅ্যাপে নিকোলার তিনটি কবিতা হাসান আলীকে পাঠান। হাসান আলী কবিতাগুলো পড়ে বলেন, “বেশ ভালো কবিতা। মনে হচ্ছে পত্রিকায় ওর কবিতা ছাপতে পারবো।” তিনি নিকোলাকে আরও দুটি নতুন কবিতা লিখে ফেব্রুয়ারির মধ্যে পাঠাতে বলেন, যার মধ্যে থেকে একটি ছাপার জন্য নির্বাচন করবেন। হাসান আলী জানান, ইতিমধ্যে তিনটির একটি ছাপা যেতেই পারে, তবে তিনি মেয়েটিকে নিয়মিত লেখার অভ্যাসে উৎসাহিত করতে চান।
প্রফেসর ব্রানজেকের প্রশংসা ও পিঁপড়ের কবিতা
দুপুরের খাবারের পর সবাই মিলে চেহানোভ মনুমেন্টস (পুরোনো ক্যাসেল) দর্শনে যান। পথে ওয়ারশ থেকে আসা প্রফেসর ব্রানজেকের সাথে হাসান আলীর ছবি তোলেন ক্যাতারজিনা। হাসান আলী বাসে ওঠার সময় প্রফেসরকে তার পোলিশ ভাষায় লেখা নতুন বইটি দেন। মনুমেন্টে পৌঁছানোর আগেই তেরেসা জানান, প্রফেসর বইটি উল্টে-পাল্টে দেখেছেন এবং তিনটি কবিতা তার খুব ভালো লেগেছে। বাস থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে প্রফেসর ব্রানজেক পিঁপড়ে নিয়ে কবিতাটির প্রশংসা করে বলেন, “বৃষ্টি এসে ডোবায় যদি ডোবে, জাগে না বিক্ষোভে/ রৌদ্র এসে পুড়িয়ে গেলে পোড়ে/ থাকলে বেঁচে আবার মাটি খোঁড়ে।/ পিঁপড়েগুলো ভয় পেয়েছে/ ঘরে যায় না।” হাসান আলী হেসে বলেন, “আমরা মানুষেরা সবাই পিঁপড়ের মতো, ভয়ে সিঁধিয়ে থাকি। আমাদের প্রতিপালকেরা, বড় বড় সুপারপাওয়ার আমাদের যেভাবে ব্যবহার করে আমরা তেমনি ব্যবহৃত হই।” প্রফেসর ব্রানজেক যোগ করেন, “এখানেই কবিতাটির সার্থকতা! আমরা ঝাঁকে ঝাঁকে মরি, ওরা ঝাঁকে ঝাঁকে মারে।”
ক্যাসেল দর্শন ও প্রত্নতাত্ত্বিকের বক্তৃতা
ক্যাসেলের সামনে পৌঁছে একজন গাইড বক্তৃতা দেন। এটি পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি রাজা ডিউক সিমোভিট দ্যা থার্ডের আমলে নির্মিত হয়। প্রথমে কাঠের তৈরি হলেও পরে ইটের দুর্গে রূপান্তরিত হয়। শহরটির গোড়াপত্তন ১০৬৫ সালে। সবাই দলে দলে ছবি তোলেন এবং ইটের রাস্তা দিয়ে ক্যাসেলের অর্ধভাঙা বিশাল গেট দিয়ে প্রবেশ করেন। স্থানীয় একজন অধ্যাপক গাইডের কাছ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বলেন, “একজন আর্কিওলজিস্ট হিসেবে এই ক্যাসেলে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আমার রিসার্চ করার সুযোগ হয়েছে। আমি এখান থেকে মানুষের খুলিও উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি।” প্রায় আধাঘণ্টা ক্যাসেলে কাটানোর পর সবাই গ্রুপ ছবি তোলেন এবং পাশের শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হন, যেখানে মেয়রের উপস্থিতিতে কবি কুর্টেবিনস্কাকে নিয়ে প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন করা হয়। সেখানে উৎসব সংকলন হাতে তুলে দেওয়া হয়, যাতে হাসান আলীর তিনটি কবিতা পোলিশ ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।
সন্ধ্যার অনুষ্ঠান ও পিয়ানো বাদন
সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল এরেস চাদনিকোলইয়ের পিয়ানো বাদন। তাকে অনুরোধ করা হলে তিনি এমন একটি সুর তোলেন যা তার নিজস্ব, মনে হয় ওই অবস্থাতেই তিনি তা সৃষ্টি করেন। ফেরার পথে তিনি বলেন, “অত্যন্ত বাজে পিয়ানো, আমি শুধু তাৎক্ষণিকভাবে চেষ্টা করেছি।” হাসান আলী মন্তব্য করেন, “তোমার চেষ্টা মানেই নতুন কিছু তৈরি করা। তুমি ন্যাচারাল পিয়ানো বাদক।” রাতে ডিনারের পর হোটেল বলরুমে ম্যারাথন কবিতা পাঠের আয়োজন করা হয়। স্থানীয় শিল্পী পিটার রেজকভক্সি গিটার বাজিয়ে কবিতার ফাঁকে ফাঁকে গান গেয়ে শোনান। বেশ কয়েকটি গান তিনি অনুষ্ঠানের মূল আয়োজক তেরেসার লেখা কবিতা থেকে তৈরি করেছেন বলে জানান। হাসান আলী পঞ্চমবারের মতো পোল্যান্ডে এসে তার ভালো লাগার কথা বলেন এবং এই দেশকে দ্বিতীয় বাসস্থান বলে অভিহিত করেন। তিনি ডারিউস টোমাস লেবিয়ডারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “আন্তর্জাতিক কাব্য ফোরামে তিনিই আমাকে প্রথম টেনে আনেন। নিউইয়র্কের জাতিসংঘে পোলিশ কবিতাপাঠের আসরে ২০০২ সালে তাঁর সাথে পরিচয় হয়, তারপর থেকে তিনি আমাকে ভোলেননি।” তিনি দুটি কবিতা পড়েন, যার অনুবাদ সুললিত কণ্ঠে পড়ে শোনান ক্যাতারজিনা।
দ্বিতীয় দিন: মিউজিয়াম অব রোমান্টিসিজম ও কবরস্থানে কবিতা রচনা
দ্বিতীয় দিন সকালে কুয়াশা কাটতে না কাটতেই সবাইকে মিউজিয়াম অব রোমান্টিসিজম-এ নিয়ে যাওয়া হয় কবি সিগমন্ড কারসিনেস্কির কবরে ফুল দিতে। মিউজিয়াম ও কবরখানা একই চত্বরে অবস্থিত। এই বিশাল জমিদারি চত্বরটি কারসিনেস্কির বাপ-দাদার ছিল এবং পরে জাতীয়করণের মাধ্যমে মিউজিয়ামে পরিণত হয়। পুরো চত্বর জুড়ে নানারকম ফুলের সাজি, এক কোণে কবি নরবিদ-এর স্কালপচার পাওয়া যায়। পড়ন্ত হেমন্তের বিশাল গোলাপ ফুল সবাইকে মুগ্ধ করে। চার্চের বেসমেন্টে কারসিনেস্কি, তার বাবা-মা ও অন্যান্যদের কবর একের পর এক সাজানো। পিছনের দরজা দিয়ে মাটির নিচে প্রবেশ করতে হয়। এই কবরের গুহায় ঢুকতে ঢুকতে ক্যাতারজিনা হাসান আলীকে তার নিজের কবিতা “কবির অভিজ্ঞতা” স্মরণ করিয়ে দেন। হাসান আলী সঙ্গে সঙ্গে বলেন, “I have been in other peoples’ grave too.” সবাই লাইন ধরে দাঁড়িয়ে কারসিনেস্কির কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করছিলেন এবং গাইডের বক্তৃতা শুনছিলেন, এমন সময় হাসান আলী তার ফোনে নতুন কবিতা “গ্রেভ টক” লিখতে ব্যস্ত হয়ে যান। তিনি বলেন, “মাত্র কয়েক মিনিটে তরতর করে ফোনের নোটবুকে কবিতাটি লেখা হয়ে গেলো। আমি খুশি মনে রোমান্টিকতার কবি কারসিনেস্কিকে ধন্যবাদ জানিয়ে তার কবরের গহ্বর থেকে বেরিয়ে এলাম।” ফেরার পথে চার্চের ভেতরটা দেখতে হাতিফ তাকে টেনে নিয়ে যান এবং কারসিনেস্কির মায়ের ভাস্কর্যের সামনে ছবি তোলেন। এরপর পাহাড়চূড়ায় একটি ছোট মিউজিয়াম ঘরে নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে তখনকার ব্যবহৃত আসবাবপত্র রাখা ছিল। হাসান আলী একটি চেয়ারে বসতে গেলে কবিরা সমস্বরে নিষেধ করেন, কারণ ওগুলো দেখার জন্য, বসা বা স্পর্শ করার জন্য নয়। কারসিনেস্কির দাদীর একটি ছবির দিকে তার দৃষ্টি আটকে গেলে তিনি বলেন, “এত সুন্দরী দাদিকে আমি কখনো দেখিনি।” পাশ থেকে হুসেন হাবেশ বলেন, “তখন তরুণীকালে দাদিদের ছবি হয়ত তোলা হতো না। এটা দাদীর উঠতি বয়সের ছবি।” হাসান আলী বলেন, “ধন্যবাদ, ষোড়শী দাদি!” গাইড গোলাপ বাগানের সামনে দাঁড়িয়ে কারসিনেস্কির পালক বোনের সাথে তার প্লেটোনিক প্রেমের কথা বর্ণনা করেন এবং ঠিক কোথায় তারা চুপিচুপি কথা বলতেন সেই জায়গাটি নির্দিষ্ট করে দেখান। হাসান আলী কিছু বলতে চাইলে ক্যাতারজিনা তাকে চুপ করিয়ে দিয়ে বলেন, “ওটা ওর পেশা। এই বিষয়ে ডিগ্রি নিয়েছেন। ওকে তো কথা বলেই উপার্জন করতে হবে।”
কালচারাল হাউজে অনুষ্ঠান ও কবি আলোচনা
সকালে সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও মিউজিয়াম দেখতে যাওয়ার আগে সবাই চত্বরের ভেতর অবস্থিত বিশাল কালচারাল হাউজে ব্যাগ রেখে গিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ফিরে এসে যে যার ব্যাগ ফিরিয়ে নিয়ে, শীতের জ্যাকেট সেখানে রেখে দোতলার অডিটরিয়ামে জায়গা নেন। অডিটরিয়ামের সামনে কেক-পেস্টি ও চা-কফি খাবারের ব্যবস্থা ছিল। হাতে সময় থাকায় কেউ কেউ ওগুলোর সদ্ব্যবহার করেন। ইতিমধ্যে ওয়ারশ থেকে আসা এক কবি পুরো প্লেট ভর্তি কেক-পেস্টি নিয়ে এক কোণে বসে খাচ্ছিলেন। তিনি ক্যাতারজিনাকে অনুরোধ করেছিলেন হাসান আলীর সাথে কথা বলিয়ে দিতে যাতে তার কবিতা শব্দগুচ্ছ পত্রিকায় ছাপা হয়। ক্যাতারজিনা তাকে বলেন, “আপনি আগে অনুবাদ পাঠান, সম্পাদকের পছন্দ হলে ছাপার জন্য অনুরোধ করতে হবে না; তিনিই আপনার সাথে যোগাযোগ করবেন।” পরে চেক রিপাবলিক কবিতা উৎসবেও এমন একটি ঘটনা ঘটে। হাসান আলী লক্ষ্য করেন যে বাথরুমের সামনে ক্যাতারজিনার সাথে ওই কবির উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হচ্ছে। কবির হাতে ছিল তিনটি গ্লাস। তিনি ক্যাতারজিনাকে জিজ্ঞেস করেন হাসান আলী তাদের সাথে মদ্যপানে অংশ নেবেন কিনা, কিন্তু ভর দুপুরে তিনি সেখানে যাবেন না বলে জানান। পরে ক্যাতারজিনা বলেন, “তিনি আমাকে তাঁর কবিতা অনুবাদ করে তোমার পত্রিকায় পাঠাতে বলেছেন।” হাসান আলী বলেন, “তাতে সমস্যা কী?” ক্যাতারজিনা বলেন, “আমি কারো অনুরোধে কবিতা অনুবাদ করি না। যদি অনুবাদযোগ্য হয় নিজের থেকেই কাজটি করি!” হাসান আলী বলেন, “এ ব্যাপারে আমার নীতিও একই। অনুবাদযোগ্য না হলে সময় নষ্ট করে লাভ কী!” ক্যাতারজিনা আরও জানান, তিনি কবিকে বলে দিয়েছেন, “তুমি আগে হাসানআলকে কবিতা পাঠাও। তিনি যদি মনে করেন তোমার কবিতা ছাপবেন, তবেই আমি অনুবাদ করবো।” কবি জানান তার কাছে সম্পাদকের ইমেল অ্যাড্রেস নেই, তাই ক্যাতারজিনা বলেন, “চেয়ে নাও।” হাসান আলী বলেন, “তা এই কথা নিয়ে উত্তপ্ত হবার কী আছে?” ক্যাতারজিনা বলেন, “আরে বলো না, বাথরুমে যাবার পথে কেন এই কথা আমাকে বলতে হবে! বলার তো আরো সময় আছে।” হাসান আলী বলেন, “কী যে বলো, তুমি ব্যস্ত মানুষ। তোমার সাথে কথা বলার আর কোনো সুযোগ হয়ত পায়নি।”
দুপুরের অনুষ্ঠান: বিখ্যাত পোলিশ কবির সাক্ষাৎকার
দশ অক্টোবর ২০২৪, দুপুরে কালচারাল হাউজে একজন বিখ্যাত পোলিশ কবিকে নিয়ে আয়োজন করা হয়, যিনি একজন ধর্মযাজকও বটে। হাসান আলী চা খেতে খেতে উপস্থিত কবিদেরকে তার পূর্বে লেখা একটি কবিতা শোনান: “A poet and a priest / are almost the same. / The only difference is / one believes in god / and the other thinks / that he is one.” ক্যাতারজিনা বলেন, “হি-এর জায়গায় সি বসিয়ে দিলেও চলে।” হাসান আলী বলেন, “অবশ্যই। কিন্তু হি অর সি একসাথে বললে কবিতা হারিয়ে যায়। এই জন্যেই এভাবে লেখা হয়েছে।” ক্যাতারজিনা আরও বলেন, “আজকের এই বিখ্যাত পোলিশ কবির নামও আমি কখনো শুনিনি।” তথাপি এই ধরনের অনুষ্ঠানে এমনটি অহরহ ঘটে। মঞ্চে কবির সাথে টেরেসার কথোপকথন কিছুক্ষণ শোনার পর অধৈর্য হয়ে হুসেন হাবেশ বেরিয়ে যান। হাসান আলীও কিছুক্ষণ পর ক্যাতারজিনার পাশ থেকে উঠে যাওয়ার আগে কানে কানে বলেন যে বাথরুমে যাবেন। বাথরুম থেকে ফিরে দেখেন বাইরে তখনো চায়ের আয়োজন শেষ হয়নি। তিনি সেখানেই বসে আরেকবার চা খেতে থাকেন। ইতিমধ্যে আজকের অনুষ্ঠানের পরের পর্বের উপস্থাপক যোফিয়া সারনিকা, যিনি একজন সাংবাদিক, উপস্থিত হলে হাসান আলী ফিসফিস করে তার সাথে কথা বলেন। জানতে পারেন যে তিনি ন্যাশনাল টেলিভিশনের উপস্থাপিকার পদ থেকে কয়েক বছর আগে অবসর নিয়েছেন এবং এখন ইন্ডিপেন্ডেন্ট সাংবাদিকতা করেন। কিছুক্ষণ কথা বলার পর তিনি পরের অনুষ্ঠানের জন্য রিহার্সাল করতে চলে যান। হাসান আলী আবার হলরুমে ফিরে গেলে তখনও চলছিল সেই বিখ্যাত কবির সাক্ষাৎকার। মাঝে মাঝে ক্যাতারজিনা তাকে কিছু কিছু প্রয়োজনীয় বিষয় অনুবাদ করে শোনান। একপর্যায়ে সেই অত্যন্ত বোরিং, দীর্ঘ, অনভিপ্রেত সাক্ষাৎকারটি শেষ হলে ছাত্রছাত্রীদের কবিতা প্রতিযোগিতায় পুরস্কার দেওয়া হয়। পুরস্কৃত কবিদের কেউ কেউ কবিতাও শোনান, সবই পোলিশ ভাষায়। একজন কবির কবিতার সাথে সবাই হাততালি দেন। কবিতাটি বেশ ছন্দবদ্ধ ছিল, ক্যাতারজিনা ইংরেজিতেও শোনান। যদিও এই কবি প্রতিযোগিতায় তৃতীয় হয়েছিলেন, তিনি বলেন যে তারই প্রথম হওয়া উচিত ছিল। স্থানীয় কয়েকজন কবিকেও সান্ত্বনা পুরস্কার দেওয়া হয়। সবাই সানন্দে হাততালি দেন।
সার্টিফিকেট বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
একপর্যায়ে সবাইকে মঞ্চে ডেকে এই অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। আট-দশজন বিদেশি কবিসহ প্রায় চল্লিশজন একসাথে মঞ্চে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন। এরপর শুরু হয় নাচ ও গান। অপেরা গেয়ে শোনান ভিয়েনার সোপ অপেরা শিল্পী উরসুলা রোজেক, আর পিয়ানো বাজান জাপানের পিয়ানিস্ট মিগুমি অটসুকা। পুরোদিনের এই একটি মাত্র অনুষ্ঠান খুবই মানসম্মত ছিল, যদিও ক্যাতারজিনা বলেন যে অপেরা শিল্পী জোরে টান দিলে গলা ভেঙে যাচ্ছে। তবে তিনি পিয়ানোবাদকের যথেষ্ট প্রশংসা করে বলেন, “এইভাবে পিয়ানো বাজাতে হলে প্রতিদিন অন্তত আট ঘণ্টা প্র্যাকটিস থাকতে হয়।” অনুষ্ঠান শেষ হতে বিকেল সাড়ে চারটা বেজে যায়। হলরুমের পিছনে, বিশেষত ড্রেসিং এরিয়ার পাটাতন সরিয়ে খাবার পরিবেশনের আয়োজন করা হয়। হাসান আলী ও ক্যাতারজিনা দুপুরের আধাঘণ্টা বিরতির সময় চত্বরের ভেতরে অবস্থিত একটি রেস্টুরেন্ট থেকে খেয়ে নিয়েছিলেন, নতুবা এতক্ষণ না খেয়ে থাকা সম্ভব হতো না। পরে জানা যায়, দেরিতে খাবার দেওয়ার কারণ হলো রাতের খাবার স্কিপ করা, কারণ গান ও পিয়ানোই ছিল আজকের শেষ অনুষ্ঠান। আয়োজকরা যদিও হোটেলে থাকার ব্যবস্থা রেখেছিলেন, কিন্তু কারো জন্যই আর ডিনারের আয়োজন করেননি।
অবসাদ ও তেরেসার সাথে সাক্ষাৎ
অনেকটা বিধ্বস্ত হয়ে হোটেলে ফিরে এলে ক্যাতারজিনা তার রুম থেকে হাসান আলীকে ম্যাসেজ পাঠিয়ে জানান যে তেরেসা সন্ধ্যা সাতটায় ফরেন পোয়েটসদের সাথে দেখা করতে আসতে চান। হাসান আলী মনে মনে ঢোক গিলে ভাবেন, এত পরিশ্রমের পরও যদি সামান্যতম রেস্ট না নিয়ে তেরেসা বা অন্যদের সাথে কথা বলতে যেতে হয় তাহলে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনিতেই মনে হচ্ছে প্রেসার ভীষণ হাই, কয়েক দিন দুই-তিন ঘণ্টার বেশি ঘুম হয়নি। যাহোক, সাড়ে সাতটায় আবার ম্যাসেজ আসে, “আমরা সবাই ডাইনিং রুমে আছি। তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।” হাসান আলী কোনো রকম নিজেকে সামলিয়ে সেখানে হাজির হন। তেরেসা শ্যাম্পেন নিয়ে এসেছিলেন। হাসান আলী বলেন, “মাথা খুব ধরে আছে, আমি শুধু চা খাবো।” অতএব চা ও এক বোতল পানির অর্ডার দিয়ে সবার সাথে যোগ দেন। তেরেসা এক এক করে সবার থেকে ফিডব্যাক জানতে চান। যে যার মতো আলোচনা-সমালোচনা করেন, কেউ কেউ বলেন সব ভালো, সব ভালো। হাসান আলী বলেন, “দুই দিনের প্রোগ্রামে এত কিছু রাখা হয়েছে যে অনায়াসে চার দিনে টেনে নেওয়া যেতো। তবে সেখানেও বাজেটের কথা হবে, হবে লোকবলের কথাও। তাছাড়া, আমার মতো যারা ছয় ঘণ্টার টাইম ডিফারেন্স জোন থেকে আসছেন তাদের জন্য বিশ্রামের ব্যবস্থা থাকলে ভালো হয়।” নিজের শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে সবার থেকে বিদায় নিয়ে রুমে ফিরে আসেন।



