মুখোশের আড়ালে: পর্ব–২: ভন্ড ভালোবাসার চিহ্ন
মুখোশের আড়ালে: পর্ব–২: ভন্ড ভালোবাসার চিহ্ন

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

‘মানে?’ শব্দের আঘাত

‘মানে?’ শব্দটা বিকেলের নিস্তব্ধতাকে যেন দুমড়ে-মুচড়ে দিল। সনাতন তৎক্ষণাৎ কোনো উত্তর দিল না। সে দীর্ঘ একটা শ্বাস নিয়ে নিজেকে একটু সামলে নিল, তারপর অত্যন্ত নিচু আর ভেজা গলায় বলল— ​‘শামীম, আমাদের এই ছোট জীবনে আমরা কত বিচিত্র মুখোশ যে পরে থাকি! অথচ জানিস, আমি এমন কিছু মানুষ দেখেছি যারা সত্যিই নিঃস্বার্থ। তারা কোনো প্রতিদান চায় না, কোনো হাততালি চায় না; শুধু চায় তৃণমূলের অবহেলিত ওই মানুষগুলো যেন একদিন সমাজের সামনের সারিতে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াতে পারে। এই যে মানুষকে বুক দিয়ে আগলে টেনে তোলার জেদ, এটা ঈশ্বরপ্রদত্ত এক পবিত্র ভালোবাসা। কিন্তু এর ঠিক উল্টোদিকেই আছে এক ভয়ংকর হাহাকার।’

ভন্ড ভালোবাসার চিহ্ন

শামীম পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে রইল। সনাতন তার চোখের গভীরে সরাসরি তাকিয়ে বলতে লাগল, ‘একদল মানুষ আছে যারা ভালোবাসার অভিনয় করে কেবল নিজের লাভের জন্য। তারা মানুষের উপকার করে ঠিকই, কিন্তু আড়ালে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ মেপে নেওয়া হয় নিজের স্বার্থের পাল্লায়। এই ভালোবাসা হৃদয় থেকে আসে না রে শামীম; এটা কেবল নিজেকে বড় করার একটা স্বার্থপর সিঁড়ি মাত্র। এই মানুষগুলো বাইরে দেবতুল্য সাজলেও ভেতরে থাকে প্রচণ্ড হিংসা। তারা চায় না কেউ তাদের চেয়ে বড় হোক। তাই তারা কথার ধারালো আঘাতে অন্যকে ক্ষতবিক্ষত করে, ভয় দেখিয়ে অন্যদের দাবিয়ে রাখে যাতে তাদের মেকি রাজত্বটা টিকে থাকে।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ক্ষমার পথ

সনাতন এবার শামীমের কাঁধে হাত রাখল। সেই হাতের স্পর্শে যেন এক অদ্ভুত মায়া আর শাসনের মিশ্রণ। সে কাঁপা গলায় বলল, ‘তবে কি জানিস শামীম? ধর্ম আমাদের শেখায়—স্রষ্টা আমাদের কারো জন্য ক্ষমার পথ বন্ধ করে দেননি। মানুষ হিসেবে ভুল করা হয়তো অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু সেই ভুলকে পুঁজি করে অহংকারে মত্ত থাকাটা সবচেয়ে বড় পাপ। নিজের সামান্য লাভের জন্য কারো মনে চাবুকের মতো আঘাত দেওয়া কি সত্যিই আমাদের নৈতিকতা? শামীম, অনুশোচনার এক ফোঁটা জল যদি চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে, তবে সেই জলে দীর্ঘদিনের জমা সব কালিমা ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে যায়। স্রষ্টা তো তার বান্দাকে ফিরে আসার সুযোগ বারবার দেন।’

আয়নার সামনে দাঁড়ানো

শামীমের চোখের মণি এবার স্থির হয়ে গেল। তার কপালের রগগুলো কাঁপছে, যেন ভেতরের কোনো এক বিশাল যুদ্ধ বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে শুধু আবারও অস্ফুট স্বরে বলল, ‘মানে?’

বিকেলের শেষ রক্তিম আলোটুকু তখন পুরোপুরি মিলিয়ে গেছে। অন্ধকারের বুক চিরে সনাতনের শেষ কথাটি শামীমের কানে এক মন্ত্রের মতো বাজতে লাগল— ‘মানেটা হলো শামীম, সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগে আয়নার সামনে দাঁড়ানো খুব জরুরি। মুখোশটা লোকচক্ষুর সামনে ছিঁড়ে পড়ার চেয়ে নিজের হাতে খুলে ফেলে ভালো পথে ফিরে আসা কি বেশি সম্মানের নয়? যারা ভুল করেছে, তারা কি এখনো তওবা করে আলোর পথে ফিরতে পারে না?’ চলবে...

আরও পড়ুন: মুখোশের আড়ালে: পর্ব–১