মাসুক হেলালের অলংকরণ অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো
‘আমি এই চোক ছুঁয়ি বুলছি, আমি তাক দেখিছি। দেখতি কী মানান! এক্কের যেন রূপকথার নাজার জো!’ ‘আমুও দেকিচি। ওরে বাবা! মোটরগাড়ির মাতার পোর ফড়ফড় কইরি পতাকা ওড়চে। আর তিনডি পুলিশ মোটরতি ঝাঁপি পইড়ি মোটরের দরজা খুইলি দিলু, তেইগি সে নাইমলু। অগুনতি মানুষির মদ্যি আমি তাক দেখতি পালাম না।’ ‘আমরা একসাতে ইশকুলি পড়তাম। আমাক দোস্ত বুইলি ডাইকতু সে। আমার নামের সাত মিল আছে তো!’
গ্রামের ডহরে দাঁড়িয়ে কৌতূহলী মানুষজন তাদের নাগালের বাইরের প্রাসাদসম মদিনা ভিলার দিকে তাকিয়ে এসব আলাপ করছিল। ওই বাড়ির বড় ছেলে নাকি দেশের সবচেয়ে বড় অফিসার। পদোন্নতির পর এই প্রথম গ্রামের বাড়ি এলেন। পরিচিত, বন্ধুবান্ধব, কাছের মানুষজনের ভিড়ে মদিনা ভিলার গেটের ভেতরে-বাইরে লোকারণ্য। বড় অফিসারের ছোট তিন ভাই আর তাদের বন্ধুরা সব সামাল দিচ্ছে। বেশি ভাগই তদবির পার্টি। কারও নিজের, কারও ভাই, বোন, ছেলে-মেয়ে, জামাই, শালার চাকরির জন্য বড় অফিসারের সঙ্গে একটু দেখা করা দরকার। পৌষের শীতের বিকেলে কেউ মাফলারে কান-গলা ঢেকে, কেউ রংচটা চাদর বুকের ওপর ক্রস করে তার মধ্যে দুহাত ঢুকিয়ে একে অন্যের গা ঘেঁষে ওম নিয়ে দাঁড়িয়ে। লুঙ্গির খোলা তল দিয়ে হু হু করে ঢুকে পড়া শীতল বাতাসে কারও শীর্ণ পা জোড়া দুই হাঁটুতে ঠক্কর খাচ্ছিল। কয়েকজন হাঁটুর ভাঁজে লুঙ্গি গুঁজে আকমলের চায়ের দোকানের বেঞ্চির ওপর পা তুলে বসে ছিল। কেউ খালি হাতে, কারও হাতে ভাঁজ করা সার্টিফিকেটের ফটোকপি।
চায়ের দোকানে আলাপ
‘আইজ মনে হয় আপনাগের কপালে নি। কাইলকি পরভাতে উইটি মদিনা ভিলার গেট বরাবর নক কইরি দাঁড়ি থাইকেন। বড় অফিসার বড় দেলের মানুষ। সবার সাথ কতা বোলে। এক কাপ দেব নাকি ঠান্ডু চাচা? এরাম খালি পায়, ছিঁড়া চাদ্দর গায় দি কেউ দেখা করতি আসে?’ বলে আকমল দোকানি চায়ের কাপে চিনি দিয়ে চামচে ঘুঁটতে ঘুঁটতে লাল চা প্রায় অর্ধেক কাপে পরিণত করে। কারও কারও দিকে চায়ের কাপ বাড়িয়ে দেয়।
ঠান্ডু মিয়া একবার পশ্চিম আকাশের দিকে কী মনে করে খানিক চেয়ে থেকে ছেঁড়া চাদর ভালো করে পেঁচিয়ে নিয়ে উঠে পড়ে।
ঠান্ডুর সংসার
নিজের কানের একজোড়া পাশা আর ক্ষয়ে যাওয়া দুটো পেটি চুড়ি ছেলের পুরোনো খাতার পাতা ছিঁড়ে তার মধ্যে মুড়িয়ে স্বামীর হাতে তুলে দেয় ঠান্ডুর বউ। ওরই মধ্যে মেস ঠিক করে রাকিব একবার বাড়ি এসে ঘুরে গেছে। ঠান্ডুর বউ মায়ের বাড়ি থেকে আনা শিমুল তুলার বস্তা খুলে পুরোনো শাড়ি পেতে একটা তোশক আর একটা বালিশ বানিয়ে দেয় ছেলের জন্য। ঠান্ডু বাজার থেকে একটা নতুন বিছানার চাদর কিনে দেয়। মেসের খরচের জন্য গয়নাবেচা টাকা থেকে এক মাস চালানোর টাকাও দিতে হয়। ছেলে যাওয়ার সময় বলে যায়, ‘এট্টা টাচফোন না হলিই না। সামনে মাসেই দিয়া লাগবেনে।’
ঠান্ডু মিয়ার নিজের জমি নেই। একেবারে যে ছিল না, তা-ও নয়। মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে সেটুকু বিক্রি করতে হয়েছে। তার ইচ্ছা ছেলেটাকে কলেজ পাস করানো। গ্রামের স্কুল থেকে সেকেন্ড ডিভিশনে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছে রাকিব। জেলা শহরের একটা কলেজে ভর্তি হয়েছে। প্রথমে বোনের চাচাশ্বশুরের দোস্তর বাসায় মাসখানেক ছিল। ঠান্ডুর মেয়ে নাইওরে এসে বলে, ‘ও বাপজান, আমার চাচাশউর বুইলি দিছে রাকিবকে যেন ম্যাচে রাকে। সে বাজারডা কইরি দেয় না, তাগের বাড়ির দুইটু ছোট ছেইলিকে পড়ায় না, রাইত কইরি বাড়ি আসে। পারলি ম্যাচে রাইকি পড়াও না হলি বাড়ি আইসি তুমার সাত চাষবাস করুক’।
‘তাক দি এত কাজ করালি সে নেকাপড়া করবে ককুন? আমার ছেইলির মতন সব্য ছেইলি পাঁচ গিরামে নি। বাপের জমাজমি থাকলি আমার ছেইলিকে মানুষ এত অগিরাজ্যি করতি পাইরতু?’ ঠান্ডুর বউ মেয়ের মুখের ওপর কথাগুলো ছুড়ে দেয়। যে মেয়ের বিয়ের জন্য জমি বিক্রি করতে হয়েছে, সেই মেয়েকে সময়মতো দুটো কথা শুনিয়ে দিয়ে বেশ নির্ভার লাগে তার।
মেয়ে কাঁদতে বসে, ‘বিয়ি না দিয়ি আমাক ঘরের খুঁটি বানি থুয়্যি দিলিই তো পারতিস মাগী। ও বাপজান, তুমার বাড়ির ভাত আর আমার গলা দি নাববে না গো ও ও ও’।
ছেলের জন্য তদবির
নিজের কানের একজোড়া পাশা আর ক্ষয়ে যাওয়া দুটো পেটি চুড়ি ছেলের পুরোনো খাতার পাতা ছিঁড়ে তার মধ্যে মুড়িয়ে স্বামীর হাতে তুলে দেয় ঠান্ডুর বউ। ওরই মধ্যে মেস ঠিক করে রাকিব একবার বাড়ি এসে ঘুরে গেছে। ঠান্ডুর বউ মায়ের বাড়ি থেকে আনা শিমুল তুলার বস্তা খুলে পুরোনো শাড়ি পেতে একটা তোশক আর একটা বালিশ বানিয়ে দেয় ছেলের জন্য। ঠান্ডু বাজার থেকে একটা নতুন বিছানার চাদর কিনে দেয়। মেসের খরচের জন্য গয়নাবেচা টাকা থেকে এক মাস চালানোর টাকাও দিতে হয়। ছেলে যাওয়ার সময় বলে যায়, ‘এট্টা টাচফোন না হলিই না। সামনে মাসেই দিয়া লাগবেনে।’
ঠান্ডু মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে। ঠান্ডুর বউ উনুনের পাশে জড়ো করে রাখা শুকনো পাতা উনুনের ভেতর গুঁজে দিতে দিতে বলে, ‘উর ইয়ার-বোন্দুরা কবে টাচ ফোন কিনিছে। ছেইলিডা আমার মুখ শুইকনো কইরি চইলি গেল।’
ছেলের চাকরির তদবিরে যাচ্ছে ঠান্ডু নতুন সবুজ রঙের নকশা করা চাদর আর রাবারের কালো পাম্প শু পরে। বউয়ের জন্যও শখ করে একটা চওড়াপেড়ে শাড়ি কিনেছে। কী আছে জীবনে? স্বামীকে দেখে ঠান্ডুর বউয়ের যেন আশই মিটছে না। ‘এত মানান দেকা যাচ্চে নোকটাকে!’—মনে মনে বলে সে। আর সশব্দ বলে, ‘শুদ্দু ভাষায় কতা বুইলু। বড় আফিসারের হাত চাইপি ধইরি আমার রাকিবির জন্যি এট্টা চাকরির বেবুস্তা করতি নলোপাতো কইরু।’
‘উর বোন্দুরা তো পিরাইভেট পড়ায়। ইলাহি ভাইয়ের ছেইলিডা শুনলাম চাকরি কইরি নেকাপড়া করে। তুমার ছেইলির তো খালি বাবুগিরি।’ ঠাণ্ডা মাথার ঠান্ডু অনেক দিন পর বউয়ের সামনে এতগুলো কথা বলে ফেলে। বউ চুলার ধোঁয়ায় চোখ রগড়ায়, না চোখের পানি মুছতে থাকে, ঠান্ডু তা ঠাহর পায় না। একা একাই বলতে থাকে, ‘গয়নাটুক বেইচি হাতে যেটুক আচে, তা দিয়ি টাচফোন দূরি থাক একটা হাইত্তির মাচও কিনা যাবেনানে।’
মদিনা ভিলার সামনে থেকে ধীর পায়ে ফেরার পথে ঠান্ডুর মনে হচ্ছিল তার খোলা পায়ে এত ঠান্ডা সে আগে কোনো দিন অনুভব করেনি। তার ছেঁড়া চাদরের ফাঁকফোকর দিয়ে এত শীতল হাওয়া গত বছরের পৌষেও ঢোকেনি। ছেলের চাকরির জন্য তদবির করতে গিয়ে একেবারে ফকিরের মতো মদিনা ভিলার সামনে দাঁড়ালে তাকে কেউ ঢুকতে দেবে? আকমল দোকানি তো ঠিকই বলেছে। বড় অফিসার যদি রাকিবের একটা চাকরি দিয়ে দেয় তখন রাকিবই মাইনে পেয়ে টাচফোন কিনে নেবে। তাই বলে সে তো ফকিরের মতো বড় অফিসারের সামনে দাঁড়াতে পারে না। তার কি একটু শখ-আহ্লাদও থাকতে নেই?
পরদিন সকাল
‘শক নাহয় থুয়্যিই দিলাম, এই পুষ মাইসি জাড়ে ঠান্টা বাতাসির মদ্যি ভুঁই নিড়াতি যায়ি তো গা-হাত-পা টালা মাইরি যায়’, বাড়ির বেড়া ঠেলে চাড়িতে রাখা যেন বরফগলা পানি দিয়ে ঠান্ডু ধুলোধূসর পা দুটো কোনোমতে ধুতে ধুতে বিড়বিড় করে।
পরদিন সকালে বাসি বেগুনের ঘন্ট দিয়ে চারটে কড়কড়া ভাত খেয়ে ঠান্ডু মাঠে বেরিয়ে যায়। বউকে বলে যায়, ‘নান্দির চরে বাঁশই দিয়ি আইসি বাজারে যাব। দুপোর বেলা বড় আফিসারের সাত সাক্কাত করতি যাতি হবে।’ বড় অফিসারের সাথে ‘দেখা করা’র চেয়ে ‘সাক্ষাৎ করা’ যায় ভালো।
ছেলের চাকরির তদবিরে যাচ্ছে ঠান্ডু নতুন সবুজ রঙের নকশা করা চাদর আর রাবারের কালো পাম্প শু পরে। বউয়ের জন্যও শখ করে একটা চওড়াপেড়ে শাড়ি কিনেছে। কী আছে জীবনে? স্বামীকে দেখে ঠান্ডুর বউয়ের যেন আশই মিটছে না। ‘এত মানান দেকা যাচ্চে নোকটাকে!’—মনে মনে বলে সে। আর সশব্দ বলে, ‘শুদ্দু ভাষায় কতা বুইলু। বড় আফিসারের হাত চাইপি ধইরি আমার রাকিবির জন্যি এট্টা চাকরির বেবুস্তা করতি নলোপাতো কইরু।’
পথের বাধা
নতুন পাম্প শু পরে জোরে হাঁটতে গিয়ে তিনবার জুতা খুলে যায় ঠান্ডুর। দুবার হোঁচট খায় সে। বোধ হয় জুতো জোড়া একটু বড়ই হয়েছে। ঠান্ডুর পায়ের মধ্যে দুনিয়ার ধুলো ঢুকে পড়ে। সে যত জোরে এগোতে চায় ততই মনে হয়, যেন এক জায়গাতেই লেফট-রাইট করছে। শেষে না পেরে জুতা জোড়া হাতে নিয়ে প্রায় দৌড়াতে আরম্ভ করে। রাস্তা পার হতে গেলে কারা যেন তাকে থামিয়ে দেয়। তার পরপরই একপশলা ধুলো উড়িয়ে মোটরগাড়ি শাঁ করে বেরিয়ে যায়। ঠান্ডুর সারা মুখে ধুলার প্রলেপ পড়ে।
ঠান্ডু ঘরের বাতায় ঝোলানো ধূসর আয়নায় একবার মুখটা দেখে নেয়। আস্তে করে লাজুক হেসে বউকে বলে, ‘ঘরে কি পাউডার আচে?’ ‘তুমার মেয়ি আলি পরে নিয়ি আসে, আবার ঘোরত যাওয়ার সুমায় সাত কইরি নিয়ি যায়। সেই কোন কালে বিয়ির সুমায় এট্টা হিমানি দিইছিলে...’
ঠান্ডু আর দাঁড়ায় না, রাবারের পাম্প শুতে কচকচ আওয়াজ তুলে মদিনা ভিলার দিকে এগোতে থাকে। বুকের মধ্যে ধুকপুক করে। শুদ্ধ ভাষা তার আসবে না। ও যা পারে সেভাবেই বলবে। আকমলের দোকানের কাছে পৌঁছাতেই নজরে পড়ে রাস্তার অদূরে মদিনা ভিলা। আজ সেদিনের চেয়েও বেশি ভিড়। গেটের বাইরে মোটরগাড়ি দাঁড়ানো। আকমল ঠান্ডুকে একনজর দেখে প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে—‘ঠান্ডু চাচা, তুমাক তো জবর লাগজে দেখতি। তাড়াতাড়ি আগাও। বড় অপিসার আইজ ঠ্যাকছে রওনা দেবে।’
নতুন পাম্প শু পরে জোরে হাঁটতে গিয়ে তিনবার জুতা খুলে যায় ঠান্ডুর। দুবার হোঁচট খায় সে। বোধ হয় জুতো জোড়া একটু বড়ই হয়েছে। ঠান্ডুর পায়ের মধ্যে দুনিয়ার ধুলো ঢুকে পড়ে। সে যত জোরে এগোতে চায় ততই মনে হয়, যেন এক জায়গাতেই লেফট-রাইট করছে। শেষে না পেরে জুতা জোড়া হাতে নিয়ে প্রায় দৌড়াতে আরম্ভ করে। রাস্তা পার হতে গেলে কারা যেন তাকে থামিয়ে দেয়। তার পরপরই একপশলা ধুলো উড়িয়ে মোটরগাড়ি শাঁ করে বেরিয়ে যায়। ঠান্ডুর সারা মুখে ধুলার প্রলেপ পড়ে। ছোটবেলায় বড় রাস্তা দিয়ে ট্রাক চলে গেলে তার উড়িয়ে দেওয়া সাদা ধুলো মাখার জন্য ঠান্ডু আর তার বন্ধুরা সেই ধুলোর মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ত। কী সুন্দর সে ধুলোর গন্ধ! পাউডার কোন ছার! আজও ধুলোর পাউডার মেখে ঠান্ডু দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু এই ধুলোর গন্ধে সে ছেলেবেলায় ফিরে যায় না, তার মাথা ঘুরে ওঠে, হাত থেকে জুতা জোড়া ফসকে যায়।



