একুশে পদকপ্রাপ্ত গায়িকা মাহবুবা রহমানের জীবনাবসান
ঢাকার প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর কণ্ঠশিল্পী ও একুশে পদকপ্রাপ্ত গায়িকা মাহবুবা রহমান আর নেই। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এই প্রবীণ শিল্পী। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। মাহবুবা রহমান দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনাবসানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সংগীতজীবনের সূচনা ও স্বর্ণালী সময়
মাহবুবা রহমানের সংগীতজীবন শুরু হয়েছিল গত শতকের পঞ্চাশ দশকে। ১৯৫৬ সালে আব্দুল জব্বার খানের পরিচালনায় নির্মিত প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এ প্লেব্যাক করার মাধ্যমে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেন। এই ছবিতে তাঁর গাওয়া ‘মনের বনে দোলা লাগে’ গানটি আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। গানটির সংগীত পরিচালক ছিলেন সমর দাস, এবং রেকর্ডিং হয়েছিল আকাই রেকর্ডারে, যা তখনকার সময়ে একটি চ্যালেঞ্জিং প্রক্রিয়া ছিল।
তিনি শুধু ‘মুখ ও মুখোশ’-ই নন, আরও বহু চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠ দিয়েছেন। উল্লেখযোগ্য হলো ফতেহ লোহানীর ‘আসিয়া’ ছবিতে আব্বাসউদ্দীনের সুরে ‘আমার গলার হার খুলে নে ওগো ললিতে’ গানটি, যা ঢাকার বিজি প্রেসে রেকর্ড করা হয়েছিল। এছাড়া ‘জাগো হুয়া সাবেরা’, ‘কখনো আসেনি’, ‘এ দেশ তোমার আমার’ সহ অসংখ্য ছবিতে তাঁর গান শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে।
ব্যক্তিগত জীবন ও পেশাদারি সম্পর্ক
মাহবুবা রহমানের ব্যক্তিগত জীবনেও সংগীতের ছোঁয়া লেগেছিল। তিনি বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সংগীতশিল্পী খান আতাউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের যৌথভাবে রেডিওতে গাওয়া ‘আমার থাকত যদি পাখির মতো ডানা’ গানটি বিশেষ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এছাড়া তিনি সংগীতগুরু মমতাজ আলী খানের সুরে অনেকগুলো গান করেন, যার মধ্যে ‘বৈদেশী নাগর’ এবং ‘যাইও না যাইও না বৈদেশে যাইও না’ উল্লেখযোগ্য।
ষাট দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি হায়দরাবাদ, পেশোয়ার, লাহোর ও করাচিতে অনুষ্ঠিত লোক উৎসবে অংশগ্রহণ করে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন। তবে পরবর্তীতে অজানা এক অভিমানে তিনি নিজেকে সংগীতাঙ্গন থেকে গুটিয়ে নেন, যা তাঁকে অনেকটাই বিস্মৃতির আড়ালে নিয়ে যায়।
শেষ জীবন ও স্মৃতিচারণ
২০১৫ সালে প্রকাশিত একটি ফিচারে মাহবুবা রহমানের জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছিল, যেখানে তাঁর ছোট মেয়ে সংগীতশিল্পী রুমানা ইসলাম সহায়কের ভূমিকা পালন করেছিলেন। বয়সের ভারে তখন তাঁর স্মৃতি কিছুটা ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সংগীতের স্মৃতিগুলো তখনও উজ্জ্বল ছিল। তিনি ঢাকার মগবাজারের বাড়িতে সন্তান ও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে নিভৃত জীবনযাপন করতেন।
মাহবুবা রহমানের মৃত্যু বাংলাদেশের সংগীতজগতে একটি অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর অবদান বাংলা চলচ্চিত্র ও সংগীতের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। পরিবার ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হচ্ছে।



