শ্রেয়া ঘোষাল: মধুর কণ্ঠের যাদুকরীর ৪২ বছরের যাত্রা
ভারতীয় সংগীতজগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র শ্রেয়া ঘোষাল। তাঁর মধুর কণ্ঠ, আবেগময় গায়কি আর কালজয়ী গান বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের হৃদয় জয় করেছে। পুরস্কার, জনপ্রিয়তা ও বিপুল সম্পদের দিক থেকে তিনি আজ ভারতের অন্যতম সফল কণ্ঠশিল্পী। ১২ মার্চ তিনি ৪২ বছরে পা রাখলেন। এই বিশেষ দিনে ফিরে দেখা যাক তাঁর জীবনের গল্প—শৈশবের সংগীতচর্চা থেকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়ার পথচলা।
শৈশব ও সংগীতের হাতেখড়ি
১৯৮৪ সালের ১২ মার্চ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে জন্মগ্রহণ করেন শ্রেয়া ঘোষাল। তাঁর বাবা বিশ্বজিৎ ঘোষাল ছিলেন পারমাণবিক শক্তি সংস্থার একজন প্রকৌশলী এবং মা শর্মিষ্ঠা ঘোষাল ছিলেন সাহিত্য ও সংগীতপ্রেমী। পরিবারের সাংস্কৃতিক পরিবেশই ছোটবেলা থেকেই শ্রেয়াকে সংগীতের দিকে আকৃষ্ট করে। মাত্র চার বছর বয়স থেকেই তিনি মায়ের কাছেই সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা নেন। পরে শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নিতে শুরু করেন। ছোটবেলায় পরিবারের সঙ্গে রাজস্থানের কোটায় চলে যান। সেখানেই তাঁর সংগীতচর্চা আরও গভীর ও পূর্ণতা পায়।
টেলিভিশন প্রতিযোগিতা থেকে জীবনের মোড়
শ্রেয়ার জীবনের বড় বাঁক আসে একটি টেলিভিশন রিয়েলিটি শো থেকে। তিনি শিশুদের সংগীত প্রতিযোগিতা ‘সারেগামাপা’-এ অংশ নেন এবং বিজয়ী হন। এই অনুষ্ঠানই তাঁর প্রতিভাকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করে তোলে। এই অনুষ্ঠানেই তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হন বিখ্যাত পরিচালক সঞ্জয় লীলা বানসালি। তিনি শ্রেয়াকে তাঁর নতুন চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার সুযোগ দেন, যা শ্রেয়ার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়।
‘দেবদাস’ দিয়ে বলিউডে ঝড় তোলা
২০০২ সালে মুক্তি পায় বানসালির চলচ্চিত্র ‘দেবদাস’। ছবিটির সংগীতে শ্রেয়া ঘোষালের অভিষেক হয়। “বৈরি পিয়া”, “ডোলা রে ডোলা” সহ একাধিক গান মুহূর্তেই জনপ্রিয় হয়ে যায়। প্রথম ছবিতেই তিনি জিতে নেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এত অল্প বয়সে এমন সাফল্য খুব কম শিল্পীরই ভাগ্যে জোটে। এই ছবির পর থেকেই বলিউডে শ্রেয়া ঘোষাল হয়ে ওঠেন নির্মাতাদের প্রথম পছন্দের কণ্ঠ।
দুই দশকের সোনালি ক্যারিয়ার
‘দেবদাস’-এর পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি শ্রেয়াকে। একের পর এক সুপারহিট গান দিয়ে তিনি নিজের অবস্থান শক্ত করেন। বলিউডে তাঁর উল্লেখযোগ্য গানগুলোর মধ্যে আছে:
- ‘তেরি ওর’
- ‘সুন রহা হ্যায় না তু’
- ‘মনওয়া লাগে’
- ‘আগার তুম মিল যাও’
- ‘বরসো রে’
- ‘দিওয়ানি মস্তানি’
- ‘চিকনি চামেলি’
- ‘জাদু হ্যায় নাশা হ্যায়’
তিনি শুধু হিন্দিতেই নয়, বাংলা, তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালম, মারাঠি—এমন বহু ভাষায় গান গেয়েছেন। তাঁর কণ্ঠের মাধুর্য ভাষার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। শ্রেয়া ঘোষাল এখন পর্যন্ত চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছেন। পাশাপাশি ফিল্মফেয়ার পুরস্কারও তাঁর ঝুলিতে রয়েছে।
বাংলা সংগীতেও সমান জনপ্রিয়
যদিও বলিউড তাঁকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি দিয়েছে, শ্রেয়া ঘোষাল কখনোই বাংলা সংগীতকে ভুলে যাননি। বাংলা সিনেমা ও আধুনিক গানে তাঁর অসংখ্য জনপ্রিয় গান রয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্রের গান থেকে শুরু করে রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি—সব ধরনের সংগীতেই তাঁর সাবলীলতা শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে। বাংলা শ্রোতাদের কাছে তিনি শুধু একজন তারকা নন, আবেগের নাম।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে শ্রেয়া
ভারতের গণ্ডি পেরিয়ে শ্রেয়া ঘোষাল আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ব্যাপক জনপ্রিয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তিনি কনসার্ট করেছেন। ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের গভর্নর তাঁর সম্মানে ২৬ জুনকে ‘শ্রেয়া ঘোষাল দিবস’ ঘোষণা করেন, যা ভারতীয় সংগীতশিল্পীদের জন্য বিরল সম্মান।
ব্যক্তিগত জীবন
দীর্ঘদিনের বন্ধু শিলাদিত্য মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ২০১৫ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন শ্রেয়া ঘোষাল। তাঁদের পরিচয় স্কুলজীবন থেকে। প্রেম ও বন্ধুত্বের সেই সম্পর্কই পরে পরিণয় পায়। ২০২১ সালে তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় পুত্রসন্তান দেব্যাণ। পরিবার ও সংগীত—দুটিকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে তিনি জীবন সাজিয়েছেন।
সম্পদের পরিমাণ
দুই দশকের সফল ক্যারিয়ারে শ্রেয়া ঘোষাল শুধু জনপ্রিয়তাই পাননি, আর্থিক দিক থেকেও বেশ সফল। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকার সমান। প্লেব্যাক গান, কনসার্ট, টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও ব্র্যান্ড এন্ডোর্সমেন্ট—সব মিলিয়ে তাঁর আয়ের প্রধান উৎস। বছরে তিনি প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি রুপি আয় করেন। একটি গান গাওয়ার জন্য তিনি প্রায় ২৫ লাখ রুপি পারিশ্রমিক নেন।
টেলিভিশনে মেন্টর
শুধু গানের জগতেই নয়, নতুন শিল্পীদের গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন শ্রেয়া ঘোষাল। তিনি জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘ইন্ডিয়ান আইডল’-এ বিচারক হিসেবেও কাজ করেছেন। এই মঞ্চে তিনি তরুণ গায়কদের দিকনির্দেশনা দেন এবং সংগীত সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন।
কেন আলাদা শ্রেয়া ঘোষাল
ভারতীয় সংগীতজগতে অনেক জনপ্রিয় গায়ক-গায়িকা থাকলেও শ্রেয়া ঘোষালের বিশেষত্ব তাঁর কণ্ঠের আবেগ ও নিখুঁততা। তিনি শাস্ত্রীয় সংগীতের ভিত্তিকে আধুনিক গানের সঙ্গে এমনভাবে মিশিয়েছেন, যা শ্রোতাদের সহজেই ছুঁয়ে যায়। একটি প্রেমের গান হোক কিংবা বেদনাময় সুর—প্রতিটি গানেই তাঁর কণ্ঠে থাকে একধরনের আন্তরিকতা।
দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও শ্রেয়া ঘোষালের জনপ্রিয়তা কমেনি। বরং নতুন প্রজন্মের কাছেও তিনি সমানভাবে গ্রহণযোগ্য। প্রযুক্তি ও সংগীতের ধারা বদলালেও তাঁর কণ্ঠের আবেদন আজও অটুট। তাই অনেকেই বলেন, ভারতীয় প্লেব্যাক সংগীতের ইতিহাসে শ্রেয়া ঘোষাল এক অনন্য অধ্যায়।
