ফুটবলের ‘ফ’–তো পরের কথা, তার আগের অক্ষর ‘প’ নিয়েও শিষ্যদার কোনো মাথাব্যথা ছিল না। সে নিপাট রসকষহীন অভদ্রলোক। কেউ যদি তাকে জিজ্ঞেস করে, ‘কেমন আছেন’; উত্তরে বলে, তা জেনে আপনার কোনো লাভ আছে?‘আরে সবই কি লাভ-লোকসান নাকি, আপনি কেমন আছেন, তা জানলাম আর কী!’‘তাতে আমার কী লাভ?’অর্থাৎ লাভ যেখানে নেই, শিষ্যদা সেখানে নেই। আর যেখানে বিন্দু পরিমাণ লাভের সম্ভাবনা আছে, শিষ্যদা সেখানেই ঝাঁপিয়ে পড়ে পাগলের মতো।
গতবার যখন খুব গরম পড়ল, শিষ্যদা দুম করে কিনে ফেলল ভ্যান। ভ্যানে বসাল বরফ আর মিছরি। মহল্লায় একটা হাউকাউ লেগে গেল। শিষ্যর শরবতের ফ্যান হয়ে গেল সবাই। আমাদের বাবা-মায়েরা পর্যন্ত বলতে শুরু করল, শিষ্যকে দেখে শেখ তোরা, কেমন শরবত বানায়…শরবত বানাতে কী জাদুমন্ত্র লাগে, কে জানে! তা ছাড়া এখানে শেখারই–বা কী আছে? সেই তো লেবু চিপে মিছরিদানা!
শীত আসতে আসতে শিষ্যদা নতুন উৎপাত দিয়ে বসল—অনলাইন কফিশপ। অ্যাপের নাম দিল কফি আনান। সেই অ্যাপে চাপ দিয়ে এখন সবাই কফি আনিয়ে খায় আর আহ উহ্ করে। বলে, দেখ, নামটা একবার দেখ তোরা...এমন এক আপাদমস্তক হিসাবি শিষ্যদা তার হিসাব–নিকাশ ছেড়ে আমাদের কাছে হাজির। মাঠের গোলপোস্টের দিকে তাকিয়ে উদাস গলায় বলল, ‘টেন্ডুলকার বিশ্বকাপে কয়টা গোল দিছে রে?’‘মানে?’‘মানে আবার কী! ওই প্লেয়ার টেন্ডুলকার, বেঁটে করে, গোল দেয়নি বিশ্বকাপে? আমাকে একটু ফুটবল বিশ্বকাপের খবরাখবর দিয়ে হেল্প কর তো!’এসব পরিস্থিতিতে মানুষ আকাশ থেকে পড়ে। আমরা পড়লাম মহাকাশ থেকে। শিষ্যদা ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে আগ্রহী? তার খবরাখবর চায়? এ কীভাবে সম্ভব? কেয়ামত কি সন্নিকটে?
ঘটনা যা ভেবেছিলাম তার চেয়েও জটিল
ঘটনা যা ভেবেছিলাম তার চেয়েও জটিল। জটিল এবং প্রায় বিদঘুটে। শিষ্যদা একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমন এক সিদ্ধান্ত, যা তাকে বদলে দেবে। বদলে দেবে একেবারে রাত থেকে দিন, দিন থেকে রাত!শিষ্যদা সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বকাপ খেলা দেখতে সে যাবে আমেরিকায়।শুধু এই সিদ্ধান্তটুকু শুনলেই আমাদের বুক যথেষ্ট ধড়াস করে উঠত; কিন্তু পরে সে যা জানাল, তাতে আমাদের হাই ওঠা বন্ধ হয়ে গেল, রিল দেখা পর্যন্ত থেমে গেল। রবিনের চা গেল ছলকে। শিষ্যদা বলল, ‘খেলা দেখতে যাব, কিন্তু আর আসব না। এক খেলায় আমেরিকান হয়ে যাব! এরপর তোরাও একদিন মহিষের নাম রাখবি শিষ্য!’
শুরুর শক কাটিয়ে উঠতেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল। শিষ্যদা একটা ম্যাচের টিকিট কাটবে, সেই খেলা দেখতে যাবে আমেরিকায়, যাওয়ার পর মাঠ থেকে বেরিয়ে গায়েব হয়ে যাবে। খেলা দেখা থেকে যদি ভালো কিছু হয়, শিষ্যদা মনে করছে, তাহলে খেলাই ভালো!কিন্তু আমরা তো খারাপ! আমরা বললাম, ‘এত সহজ না ব্যাপারটা। ওখানে পুলিশ প্রশাসন বসে থাকবে নাকি? তোমাকে পেলে জেলে ঢোকাবে।’‘শিষ্য কাঁচা কাজ করে না। আমেরিকান জেলের সব খবর নিছি। আমাদের পার্কের চাইতেও উন্নত জায়গা। সময়মতো স্বাস্থ্যকর খাবার দেয়। জেলে যদি যেতেও হয় যাব, তারপর বের হয়ে এসে শরবত বেচব।’‘ঠান্ডার মধ্যে শরবত কে খাবে?’‘ঠান্ডার মধ্যে আইসক্রিম খেলে শরবতও খাবে। শরবতের নাম দিব নোট্রাম্প। হু হু করে বিজনেস চলবে। লিখে নে…’নোট্রাম্প নাম দিলে চলতেও পারে, সন্দেহ হলো আমাদের। কিন্তু, ভিসা? ভিসা কীভাবে পাবে শিষ্যদা? আমেরিকার ভিসা অনেক কড়া। শিষ্যদাকে ঘ্যাচাং করে রিজেক্ট করে দেবে। শিষ্যদা বলল, ‘সে জন্যই তোদের হেল্প লাগে। বিশ্বকাপের খবরাখবর দে। বল, টেন্ডুলকার কয়টা গোল দিয়েছে এখন পর্যন্ত?’রবিন দড়াম করে দাঁড়িয়ে বলল, ‘শিষ্যদা, পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব কত জানো?’‘এসব প্রশ্ন করে ভিসায়?’‘জানি না। কিন্তু পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব যত, ফুটবল থেকে তোমার দূরত্ব ঠিক ততটাই। তুমি চিন্তাও কইরো না ফুটবল দেখতে যাওয়ার নামে তুমি ভিসা পাবে, যত চেষ্টাই করো।’শিষ্যদার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, ‘চেষ্টা তো আমাকে করতেই হবে। হাতের কাছে এত বড় লাভের সুযোগ...চিড়িয়াখানায় আমার নামে মহিষ থাকবে একদিন, দেখিস!’
সপ্তাহখানেক গেছে, শিষ্যদার দেখা পাইনি
এর ভেতরে সপ্তাহখানেক গেছে, শিষ্যদার দেখা পাইনি। তার অনলাইন–অফলাইন সব সার্ভিসই বন্ধ। একদিন চাঁদে যাওয়ার উপযুক্ত সাড়ে পাঁচতলা জ্যাকেট পরে শিষ্যদা মাঠে। এদিকে গরমে আমরা মরে যাই অবস্থা। শিষ্যদা বলল, ‘প্র্যাকটিস করছি। ওখানে যদিও সামার, কিন্তু বলা তো যায় না…’‘কিসের প্র্যাকটিস করছ?’‘আমেরিকায় থাকার।’‘আমেরিকা পায়ে হেঁটে যাওয়া যায় না মামা, ভিসা লাগে, ভিসা!’‘ভিসা তো হয়ে গেছে?’‘কী!’আমরা আবারও মহাকাশ থেকে পড়লাম। শিষ্যদা চোখ বন্ধ করে হাসল। বলল, ‘একটু ঝামেলা হয়েছিল, কিন্তু সামলে নিয়েছি।’আমাদের একেবারেই বিশ্বাস হয় না এসব কথা। কিন্তু শিষ্যদা বলল ভিসা অফিসারের সাথে তার কী কথাবার্তা হয়েছে। নিচে তা দেওয়া হলো—‘তাহলে তুমি ফুটবল ম্যাচ দেখতে যাবে?’শিষ্যদা ভাঙাচোরা ইংরেজিতে বলল, ‘ইয়েস ইয়েস। ফুটবলকে আমি অনেক ভালোবাসি।’‘সকারের কী ভালো লাগে তোমার?’‘সকার না, ওইটা ফুটবল।’‘আমরা সকারই বলি।’‘বললেই তো হবে না। যার যেটা নাম সেটাই তোমাকে বলতে হবে। এখন তুমি যদি বলো টেন্ডুলকার ফুটবল না সকার খেলে, টেন্ডুলকারের কেমন লাগবে, তুমি জানো?’‘কে এই টেন্ডুলকার?’‘বিখ্যাত ফুটবলার। তুমি দেখছি ফুটবলের কিছুই জানো না।’‘সরি, সকার!’‘আরে আশ্চর্য তো, একই কথা বারবার বলছ...ওইটা সকার না ফুটবল…’এই জায়গায় এসে ভীষণভাবে চেঁচিয়ে ওঠে শিষ্যদা। ভিসা অফিসার তার ক্যারিয়ারে এ ধরনের চিৎকার শোনেনি। যারপরনাই তার মনে হয়েছে শিষ্যদা ফুটবলের ক্রেজি ফ্যান, বাংলাদেশ থেকে যদি একজন ভিসা পায় বিশ্বকাপ দেখার তাহলে সেটা শিষ্যদাই...ফলে ভিসা অ্যাপ্রুভড!
জীবন থেকে আমাদের ভরসা উঠে গেল এরপরই। ‘ধুরর’ বলে খেলা ছেড়ে চলে যাচ্ছিলাম, পেছন থেকে শিষ্যদা বলে উঠল, ‘শোন না, এখন অন্তত বল টেন্ডুলকার কয়টা গোল করেছে বিশ্বকাপে? সিএনএন, ভয়েস অব আমেরিকা যদি জানতে চায়, তাইলে যেন আমি যে টেন্ডুলকার আর ফুটবলের ক্রেজি ফ্যান, সেইটা বোঝাইতে পারি... বলে যা…’আমরা সবাই মিলে চিৎকার করে বললাম, ‘টেন্ডুলকার ৯৯টা গোল দিয়েছে বিশ্বকাপে। আর একটা দিলেই তার সেঞ্চুরি পূরণ হবে, ঠিক আছে?’



