রইদ: নিষিদ্ধ ফলের দীর্ঘশ্বাসের চলচ্চিত্র
রইদ: নিষিদ্ধ ফলের দীর্ঘশ্বাসের চলচ্চিত্র

খেয়ালী, প্রকৃতিপ্রসূত সেই পাগলী, যে কিনা সাধুর সাধনসঙ্গী হইয়া উঠতে পারল না, সাধু সঙ্গই হলো না যার, একসময় মুখোমুখি হয় এক অলঙ্ঘনীয় জীবনবাস্তবতার। সে সন্তানসম্ভবা। কিন্তু কার ঔরসের জাত সেই সন্তান? পৃথিবী প্রশ্ন করে। সমাজ প্রশ্ন করে। পুরুষ প্রশ্ন করে।

অথচ পাগলী সমস্ত জাগতিক হিসাব-নিকাশের আগাপাশতলা ফয়সালা করে দেয়—'এইডা আমার বাচ্চা, আল্লায় দিছে...' এইখানেই পাগলী আর কোনো সামাজিক চরিত্র থাকে না। সে পৌরাণিক হয়ে ওঠে। আদিম হয়ে ওঠে। মাতৃত্বের এক অনিবার্য প্রতীকে পরিণত হয়।

আর সেইখানেই সাধুর অন্তসারশূন্যতা জাগে প্রবল। আত্মশ্লাঘা উসকে দেয় অহর্নিশ। 'আমি কি গন্দম খাইছি...?'—তার প্রশ্ন। তান্ত্রিকের উত্তরও উত্তর না, আরেক প্রশ্ন—'ধরো তুমি গন্দম খায়া ফালায়ছো, কী হইবো?' সাধু বলে, 'জানিনা।'

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এই 'জানিনা'-র ভিতরেই রইদের দার্শনিক ভূগোল। এই 'জানিনা'-র ভিতরেই মানুষের আদি নির্বাসন।

স্মৃতি ও পুরাণের চলচ্চিত্র

সব চলচ্চিত্র গল্প বলে না। কিছু চলচ্চিত্র মানুষের ভিতরে বহু পুরোনো কোনো স্মৃতি জাগায়। যে স্মৃতির বয়স ইতিহাসের চেয়েও বেশি। রইদ তেমন এক চলচ্চিত্র। তার আখ্যান ক্ষুদ্র, কিন্তু তার বিষাদ প্রাচীন। তার গল্প সামান্য, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি সুদূরপ্রসারী। সাধু। তার পাগল স্ত্রী। আর বাড়ির পাশের তালগাছ।

এই সামান্য ভূগোলের ভিতরে মেজবাউর রহমান সুমন যে পুরাণ নির্মাণ করেন, তার শিকড় হাজার বছরেরও পুরোনো। তবে এই পুরাণ কোনো মৃত সভ্যতার স্মৃতিফলক না। মানুষের রক্তের ভিতরে তার পুনরাবির্ভাব ঘটে। এইখানে বুক অব জেনেসিস এসে মিশে যায় বাংলার গ্রামজীবনের ভিতরে। পবিত্র গ্রন্থের আলো-আঁধার এসে পড়ে কাদামাটির উঠোনে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আদমের একাকীত্বের সাথে মিশে যায় রাখাল সাধুর নিঃসঙ্গতা। তার নির্বাসন। তার ভয়। তার অন্তসারশূন্যতা। ইভের রহস্যময়তা এসে আশ্রয় নেয় এক পাগলীর শরীরে। তার উন্মাদনায়। তার মাতৃত্বে। তার অলৌকিক নিশ্চিন্ততায়। নাজিফা তুষী রইদে এসে চরিত্র থাকেন না; তিনি হয়ে ওঠেন মানুষের স্মৃতিতে ঘুরে বেড়ানো কোনো প্রাচীন অলৌকিকতার মুখ। আর মুস্তাফিজুর নূর ইমরান—তিনি যেন সেই প্রথম নির্বাসিত মানুষ, যার দীর্ঘশ্বাস এখনো লোককথা হইয়া পৃথিবীতে ফিরা আসে।

পুনরাবৃত্তির গল্প

গল্পের শরীরটাও খানিক ব্যবচ্ছেদের দাবি রাখে। কারণ রইদ মূলত কোনো ঘটনাবহুল চলচ্চিত্র না। বরং পুনরাবৃত্তির। প্রত্যাবর্তনের। এবং অন্তর্গত অভাবের। গল্প শুরু হয় সংসার দিয়া। তারপর অস্বস্তি। তারপর নির্বাসন। তারপর প্রত্যাবর্তন। তারপর আবার হারানো। আবার ফিরে আসা। পাগলী আসে। তাল পড়ে। পাগলী হারায়। আবার ফিরে আসে। যেন নিয়তি নিজেরই প্রতিবিম্বে আক্রান্ত। যেন সময় সামনে না, বৃত্তাকারে চলে।

একসময় সাধু তার স্ত্রীরে জঙ্গলে ফেলে আসে। কিন্তু সম্পর্ক কি জঙ্গলে ফেলে আসা যায়? অথবা মানুষের ভিতরের শূন্যতা? তাল আসে। যেন জীবন, অধিবাস্তবতা এবং অপরাধবোধ মিশে এক আদিম অন্তসারশূন্যতা হয়ে দাঁড়ায়। হয়তো পাগলী সত্যিই ফিরে আসে। হয়তো আসে না। হয়তো সমস্ত প্রত্যাবর্তনই সাধুর অপরাধবোধের কল্পিত স্থাপত্য।

পরিচালক কোনো উত্তর দেন না। তিনি বিচারক না। ব্যাখ্যাকারও না। উত্তরের বদলে মানুষের ভিতরে এক দীর্ঘ প্রতিধ্বনি ছেড়ে দেন। সেই প্রতিধ্বনির নাম—অভাব। প্রাপ্তির না। অনুপস্থিতির।

আর নিষিদ্ধ ফলের সমস্ত অনিবার্যতা গিয়ে জমা হয় একটা তালের ভিতরে। তাল, এই ছবিতে কোনো ফল না। তাল হলো বাসনার গোলাকার ছায়া। মানুষের অবদমিত আকাঙ্ক্ষা। তার অপূর্ণতা। তার অভাব। যে ভালোবাসা মানুষ ত্যাগ করতে চায়, অথচ পারে না। যে স্মৃতি মানুষ জঙ্গলে ফেলে আসতে চায়, অথচ সেই স্মৃতিরই পদশব্দ শুনতে থাকে।

অভাবের ভূগোল

এইখানেই রইদের পুরাণ নির্মিত হয়। এইখানেই জেনেসিস বাংলার লোকবিশ্বাসের সাথে মিশে যায়। এইখানে ইতিহাসের চাইতে স্মৃতি বড়। ঘটনার চাইতে প্রতিধ্বনি। শরীরের চাইতে অনুপস্থিতি। এস. এম. সুলতানের কৃষকদেহ এসে মিশে যায় জীবনানন্দের বিপন্ন বিস্ময়ে। নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার পরে মানুষ যে দীর্ঘশ্বাস প্রথম ফেলছিল, রইদ যেন সেই দীর্ঘশ্বাসেরই দৃশ্যমান অবয়ব।

অনার্যের সুরত নিয়ে সাধুর 'কায়া' যেভাবে সিনেমার চরিত্র হয়ে উঠেছে, তার পরিণতি এসে ঠেকে পাগলী চরিত্রের পৌরাণিক রূপান্তরে। সাধু যেন এক বিধ্বস্ত তীর্থযাত্রী। পালাতে চায়। পাগলীকে নির্বাসনে পাঠায়। তবুও পাগলী তারে আছর করে। যার থেকে পালাইতে চায়, শেষ পর্যন্ত তার কাছেই ধরা পড়ে। আমি তারে পারি না এড়াইতে। কারণ আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে এখনো আরেক বিপন্ন বিস্ময় খেলা করে। জীবনানন্দীয় সেই অন্ধকার এখনো শেষ হয় নাই। হয়তো শূন্যতা দিয়াও আমরা পার পাইয়া যাই। হয়তো অন্তসারশূন্যতা দিয়াও।

সীমাবদ্ধতা ও সৌন্দর্য

তবু এইখানেই রইদের মহিমা। আবার সীমাবদ্ধতাও। কারণ ছবিটির কল্পনা বৃহৎ। তার পুরাণ গভীর। কিন্তু বয়ান সবসময় সেই উচ্চতায় পৌঁছায় না। প্লট কখনো কখনো তার নিজের সম্ভাবনার চাইতে ছোট মনে হয়। রূপক দীর্ঘ হয়। ঘটনা না। কিছু দৃশ্য অনন্তের দিকে যাত্রা করে। আখ্যান পারে না।

ফলে অনেক সময় মনে হয়, রইদ তার নিজের শক্তির চেয়ে দর্শকের ঔদার্যের উপর বেশি নির্ভরশীল। তার ভালো-মন্দের চূড়ান্ত ফয়সালা যেন ইটসেল্ফ রইদের ভিতরে না, বরং দর্শকের ভিতরে। রইদ এই অর্থে দর্শকের সার্বভৌম ক্ষমতার কাছে পরাধীন। তার সমূহ অসম্পূর্ণতা যেন দর্শকের সদয় বিবেচনা প্রত্যাশা করে। দর্শকের মহত্ত্বের কাছে নতজানু। এবং এইখানেই তার নাজুকতা।

কারণ শিল্প যখন তার সমঝদারের অনুধাবনের জন্য অপেক্ষা করে, তখন তার স্বীয় সম্ভ্রম খানিকটা বিপন্ন হইয়া ওঠে বইকি। মহৎ শিল্প সাধারণত অনুগ্রহ চায় না। নিজের শক্তিতেই দাঁড়ায়। রইদ কিছুটা ব্যতিক্রম। সে দর্শকের সহানুভূতি চায়। চায় তার ধৈর্য। তার উদারতা। তার মহত্ত্ব। এবং আশ্চর্যজনকভাবে, এই ভঙ্গুরতার ভিতরেই তার সৌন্দর্য।

নির্মাতার দৃষ্টিভঙ্গি

এইখানেই ফিল্মমেকার মেজবাউর রহমান সুমন-বেপথু এক পরিব্রাজক। প্রথাবাদী বাজার সংস্কৃতির বাইরে এসে, দৃশ্য-শিকারি এই নির্মাতা যে বয়ান দাঁড় করাতে চাইলেন, তা তার সমুজ্জ্বল ও শক্তিমান সিনেমাসত্তার সাক্ষ্য বহন করে। এই লড়াই নিছক নান্দনিক না। ঐতিহাসিকও। কারণ বাজার যেখানে ঘটনা চায়, রক্ত চায়, খুন চায়, তিনি সেখানে নীরবতা নির্মাণ করেন। বাজার যেখানে উত্তর চায়, তিনি রহস্য বেছে নেন। বাজার যেখানে কাহিনি চায়, তিনি নির্মাণ করেন অনুভূতির ভূগোল।

সেই ভূগোল নির্মাণে লোকেশনের অবদান অনস্বীকার্য। বরং অনেক সময় মনে হয়, রইদের প্রকৃত নায়ক মানুষ না—ভূগোল। কাদামাটির উঠোন। তালগাছ। জঙ্গল। পুকুর। ধানের জমি। কুয়াশা। বাতাস। আলো। লোকেশন এখানে পটভূমি না। নিজেই এক চরিত্র। নিজেই এক নীরব সাক্ষী। অনেক সময় তো মনে হয়, লোকেশন নিজেই অধিকতর সিনেমা হয়ে উঠছে। সংলাপের আগে। ঘটনার আগে। এইখানে প্রকৃতি কেবল দৃশ্য না। নিয়তি।

ক্যামেরা ও সংগীতের ভূমিকা

জোহায়ের মুসাভ্বির জ্যোতির ক্যামেরা এই ভূগোলকে দান করে এক বিষণ্ণ মহিমা। অনেক সময় Days of Heaven-এর কথা মনে পড়ে। আলোর সেই ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্য। প্রকৃতির সেই ধীর বিষণ্ণতা। আবার পুরাণের অন্ধকারে আন্দ্রেই তারকোভস্কির The Sacrifice-এর প্রতিধ্বনিও শোনা যায়। আর নির্মাতার এই প্রায় সার্বভৌম, প্রায় স্বৈরাচারী চলচ্চিত্রভাষা স্মরণ করায় A Space Odyssey-কে। যেখানে পরিচালক দর্শকের মনোরঞ্জনের দায় নেন না। নিজের মহাবিশ্ব নির্মাণ করেন। দর্শক প্রবেশ করুক কিংবা না-ই করুক।

সংগীতের আলাপও ক্ষ্যামা দিলে কম কিছু হয় বটে। কারণ রাশেদ শরীফ শোয়েবের সংগীত এই চলচ্চিত্রে কেবল আবহ নির্মাণ করে না, নীরবতার গভীরতাও বাড়ায়। অনেক সময় সংগীত শোনা যায় না, অনুভব করা যায়। দৃশ্যের ফাঁকে ফাঁকে, বাতাসের ভিতরে, অপেক্ষার ভিতরে তার উপস্থিতি কাজ করে। কস্টিউমও উল্লেখের দাবি রাখে। কোনো অতিরিক্ত আয়োজন নাই। কোনো লোকদেখানো বাস্তবতা নাই। শুধু শরীরের সত্য। মাটির সত্য। দারিদ্র্যের সত্য। খানিক বিবস্ত্রতা। খানিক অনার্যতা। যেন চরিত্রগুলো পোশাক পরে নাই; নিজেদের নিয়তি পরিধান করছে।

স্থবিরতা ও প্রযোজনা

এ কথাও বলতে হবে রইদ তার স্ক্রিপ্টেই স্থবিরতা তৈরি করে। আরও ঘটনা, আরও কিছু চরিত্র যুক্ত হলে সিনেমার পরিভাষা, যেটা রইদ তৈরি করতে চাইছিল, খর্ব হত না হয়তো। চরিত্রসমূহের শৃঙ্খলিত আচার, পার্শ্ব চরিত্রসমূহের বিক্ষিপ্ত উপস্থিতি রইদের ন্যারেটিভকে তার সহজাত প্রবৃত্তি থেকে বিচ্যুত করে।

প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানকে ধন্যবাদ দিলে কম হয়। কারণ এই সময়ে দাঁড়িয়ে প্রথাবিরোধী, ঝুঁকিপূর্ণ, বাজার-অবাধ্য চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ করা কেবল ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত না—সাংস্কৃতিক অবস্থানও। এমন সিনেমা নির্মাণের জন্য শুধু নির্মাতার সাহস যথেষ্ট না; প্রয়োজন প্রযোজকের আস্থাও। সেই আস্থা দেখাইছে বঙ্গ। বাংলা চলচ্চিত্রে হয়তো এই ধরনের উদ্যোগই নতুন এক সময়ের সূচনা করতে পারে। তাদের এই যাত্রা অবিরাম চলুক।

কারণ রইদ শেষ পর্যন্ত কোনো কাহিনি না। কোনো ফ্যান্টাসিও না। বরং মানুষের আদিম স্মৃতির ভিতরে ঘুমাইয়া থাকা এক বিষণ্ণ পুরাণ। নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার পরে মানুষ যে প্রথম দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল—রইদ মূলত সেই দীর্ঘশ্বাসেরই আরেক নাম।