অক্সফোর্ড ইউনিয়ন: বিতর্কের ঐতিহ্যবাহী মঞ্চ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ নয়
অক্সফোর্ড ইউনিয়ন: বিতর্কের ঐতিহ্যবাহী মঞ্চ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়

যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত অক্সফোর্ড শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ‘অক্সফোর্ড ইউনিয়ন’ বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এবং সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ একটি বিতর্ক সভা বা ডিবেটিং সোসাইটি। ১৮২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি গত দুই শতক ধরে বিশ্বনেতা, বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী এবং তারকাদের মুক্ত আলোচনা ও বিতর্কের একটি অনন্য মঞ্চ হিসেবে পরিচিত।

ইতিহাস ও পরিচিতি

সংগঠনটির বিখ্যাত হওয়ার কারণ এর প্রায় ২০০ বছরের ইতিহাস। পাশাপাশি বিশ্ব রাজনীতি ও সমসাময়িক ইস্যুতে উচ্চমানের বিতর্কের জন্যও এটি পরিচিত। অনেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক নেতার প্রাথমিক বক্তৃতার মঞ্চ ছিল এটি। এখানকার বিতর্ক ও বক্তৃতার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ভিডিও প্ল্যাটফর্মে ব্যাপকভাবে দেখা হয়।

সম্প্রতি বিতর্ক

সেই বিখ্যাত অক্সফোর্ড ইউনিয়ন সোসাইটিতে গত রবিবার (১৪ জুন) অনুষ্ঠিত হয় ‘দ্য স্টুডেন্ট-লেড আপরাইজিং অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব পোস্ট-রেভল্যুশনারি বাংলাদেশ’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা। এই সভায় অংশ নেন বাংলাদেশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুই সমন্বয়ক কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং ছাত্রশিবির নেতা ও ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তবে সম্প্রতি অনুষ্ঠানটিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে বিতর্ক। এক পক্ষের দাবি, হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সাদিক কায়েম অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে ওই আলোচনা সভায় অংশ নিয়েছেন। একই দাবি সাদিক কায়েমের একটি ভিডিও বক্তব্য এবং বিভিন্ন ফেসবুক পোস্টেও দেখা যায়। অন্যদিকে আরেক পক্ষ বলছে, এটি ছিল অংশগ্রহণকারীদের নিজস্ব উদ্যোগ ও অর্থায়নে আয়োজিত একটি কর্মসূচি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এদিকে ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানার ও বিভিন্ন ফ্যাক্টচেকারদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হাসনাত আবদুল্লাহ ও সাদিক কায়েম অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে নয়; বরং অক্সফোর্ড ইউনিয়ন সোসাইটিতে আয়োজিত একটি প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়েছেন, যার মূল আয়োজক ছিল ‘অক্সফোর্ড বাংলা সোসাইটি’ নামের একটি স্বাধীন সংস্থা।

অক্সফোর্ড ইউনিয়ন বনাম অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়

নামের কারণে অনেকেই অক্সফোর্ড ইউনিয়নকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক ছাত্রসংসদ মনে করেন। বাস্তবে এটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি সংগঠন। মূলত শিক্ষার্থীদের বাকস্বাধীনতা ও মুক্তচিন্তার চর্চার জন্যই এর যাত্রা শুরু হয়েছিল।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, উনিশ শতকের শুরুর দিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মতত্ত্ব ও রাজনীতিসহ কিছু বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। সেই বাধা অতিক্রম করে স্বাধীনভাবে আলোচনা ও বিতর্কের সুযোগ তৈরি করতে কয়েকজন শিক্ষার্থী ‘ইউনাইটেড ডিবেটিং সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে অক্সফোর্ড ইউনিয়ন নামে পরিচিতি পায়।

এর সদস্যদের অধিকাংশই অক্সফোর্ডের শিক্ষার্থী। তবে প্রশাসনিকভাবে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নয়; এটি একটি স্বাধীন সংগঠন, যার নিজস্ব নির্বাচন, কমিটি ও কার্যক্রম রয়েছে। এটি একটি সদস্যভিত্তিক সংগঠন, যেখানে মূলত শিক্ষার্থীরা সদস্য হন, তবে কিছু ক্ষেত্রে অন্যরাও সদস্য হতে পারেন। এর সদস্যরা নিয়মিত বিতর্ক, বক্তৃতা, প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন।

প্রধান কার্যক্রম

সাপ্তাহিক বিতর্ক

অক্সফোর্ড ইউনিয়নের সবচেয়ে পরিচিত কার্যক্রম হলো সাপ্তাহিক বিতর্ক। শিক্ষাবর্ষ চলাকালে প্রতি সপ্তাহে সমসাময়িক রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, দর্শন ও আন্তর্জাতিক নানা ইস্যু নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে প্রাণবন্ত বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বিতর্কে শিক্ষার্থীরা নিজেদের যুক্তি, বিশ্লেষণ ও বাগ্মিতার দক্ষতা তুলে ধরার সুযোগ পান।

বিখ্যাতদের আমন্ত্রণ ও বক্তৃতা

বিতর্কের পাশাপাশি বিশ্বের খ্যাতিমান ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানিয়ে বক্তৃতার আয়োজনও করে সংগঠনটি। অতিথিরা বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সরাসরি প্রশ্নের উত্তর দেন। এ কারণে অক্সফোর্ড ইউনিয়নের মঞ্চকে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী বুদ্ধিবৃত্তিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

নেতৃত্ব ও বিতর্ক প্রশিক্ষণ

নেতৃত্ব ও বিতর্ক দক্ষতা উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সংগঠনটি। সদস্যদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে দল পাঠানো হয়। পাশাপাশি বল ড্যান্স, গার্ডেন পার্টিসহ নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনও পরিচালনা করে তারা।

এই মঞ্চে কারা এসেছেন

অক্সফোর্ড ইউনিয়নের মঞ্চে কথা বলা যেকোনও ব্যক্তির জন্যই অত্যন্ত সম্মানজনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গত দুই শতকে অক্সফোর্ড ইউনিয়নের মঞ্চে বক্তব্য রেখেছেন বিশ্বের বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ও রিচার্ড নিক্সন, মানবাধিকারকর্মী ম্যালকম এক্স এবং দালাই লামা। বিজ্ঞানীদের মধ্যে আলবার্ট আইনস্টাইন ও স্টিফেন হকিংও এই মঞ্চে বক্তব্য দিয়েছেন। এছাড়া তারকা ও শিল্পীদের মধ্যে মাইকেল জ্যাকসন, এলটন জন, মরগান ফ্রিম্যান, জনি ডেপ ও শাকিরার মতো বিশ্বখ্যাত তারকারাও এখানে উপস্থিত হয়েছেন।

অক্সফোর্ড ইউনিয়নের গুরুত্ব

অক্সফোর্ড ইউনিয়নকে অনেকেই রাজনীতি ও নেতৃত্বের ‘আঁতুড়ঘর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। যুক্তরাজ্যের একাধিক প্রধানমন্ত্রীসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অনেক রাজনৈতিক নেতা ছাত্রজীবনে এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাদের অনেকেই পরবর্তীকালে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছেছেন। বিতর্কিত বিষয় নিয়েও খোলামেলা আলোচনার জন্য সুপরিচিত অক্সফোর্ড ইউনিয়ন। মতাদর্শগত পার্থক্য বা বিতর্কের আশঙ্কা থাকলেও বাকস্বাধীনতার নীতিকে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিদের বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হয়।

দুই শতকের বেশি সময় ধরে মুক্তচিন্তা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং যুক্তিনির্ভর আলোচনার চর্চা করে আসা অক্সফোর্ড ইউনিয়ন আজও বিশ্বজুড়ে বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক ও নেতৃত্ব বিকাশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ধরে রেখেছে।