দান্তে আলিগিয়েরির ‘ডিভাইন কমেডি’ বিশ্বসাহিত্যের অমর কাব্যগ্রন্থ। এটি তিন খণ্ডে বিভক্ত: ইনফার্নো (নরক), পুরগাতেরিও (শুদ্ধিলোক) এবং প্যারাদিসো (স্বর্গ)। দান্তে তাঁর অকালপ্রয়াত প্রেমিকা বিয়াত্রিসের সঙ্গে স্বর্গোদ্যানে সাক্ষাতের পরম মুহূর্তে কাব্যটি সমাপ্ত করেন। পরবর্তীকালে পাঠকরা এর মহত্ত্ব উপলব্ধি করে ‘ডিভাইন’ শব্দটি যুক্ত করেন।
জীবনের নিগূঢ় সত্য ও ধর্মীয় বাতাবরণ
দান্তে জীবনের সত্যকে তত্ত্বদর্শনের মাধ্যমে নয়, বরং উপলব্ধির মাধ্যমে উত্থাপন করেছেন। তিনি লিখেছেন, “আমাদের এই জীবনব্রজের মাঝপথে চরণিক, / আমি নিজবোধ ফিরে পাই এক আঁধারবিলীন বনে, / সরল সরণি হারিয়ে গিয়েছে যেখানে বাস্তবিক।” তবে এই আখ্যানে তিনি ধর্মীয় বাতাবরণ সৃষ্টি করেছেন, যা তাকে আদর্শ খ্রিষ্টান হিসেবে চিহ্নিত করে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে তিনি যীশুর প্রতি পূর্ণ সমর্পিত মানুষ, যার বিশ্বাস ও ঐশ্বরিক বাতাবরণে লুকিয়ে ছিল প্রেমের মোহনীয় রূপ। ধর্ম তার বহিরঙ্গ, অন্তরঙ্গ প্রেম।
ভার্জিলের সঙ্গ ও সীমাবদ্ধতা
প্রথম যৌবনের প্রেমিকা বিয়াত্রিসের প্রেমে দান্তে পাড়ি জমান অনধিগম্য অভিযানে। এই যাত্রায় তার সঙ্গী ছিলেন ইনিড মহাকাব্যের কবি ভার্জিল। দান্তে দেখিয়েছেন অখ্রিষ্টান হওয়ার কারণে নরকের ‘লিম্বো অব ইনফ্যান্টস’ (কাফেরদের লিম্বো) বৃত্তে ভার্জিলের শাস্তি হয়েছে, অনন্ত হতাশার মধ্যে দিনাতিপাতের শাস্তি। দান্তে নিজে খ্রিষ্টান হলেও তার কাব্যগুরুকে নরক থেকে উদ্ধার করার শক্তি তার নেই; বরং তিনি শাস্তি বহাল রেখে ঈশ্বরতুষ্টির ছলে লোকতুষ্টিকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
কাব্যের মহত্ত্ব ও রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “তোমার সৃষ্টির চেয়ে তুমি যে মহৎ”, কিন্তু দান্তের ক্ষেত্রে কি আমরা এই কথা বলতে পারি? হয়তো পারি না। তবে এ কথা মেনে নিতে হয় যে, কাব্যখানি শুধু মহৎ-ই নয়, জগতের পাঁচখানার মধ্যে একখানা।
ডিভাইন কমেডির সাহিত্যিক উৎস
দান্তের ডিভাইন কমেডির পরিকল্পনা ঠিক কোন সাহিত্যকর্ম থেকে আত্মস্থ হয়েছে তা অনুসন্ধানযোগ্য। হোমারের ওডেসিতে ওডিসাসের পাতাললোক পরিভ্রমণ, অর্ফিয়াসের মৃত্যুলোকে ভ্রমণের কাহিনি গ্রিক পুরাণে বিখ্যাত। কিন্তু ওডিসাস ও অর্ফিয়াস ছিলেন দেবপুত্র বা দেব-দৌহিত্র; রক্তমাংসের মানুষের এমন পরিভ্রমণ প্রাচীন সাহিত্যে দুর্লভ। ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারতে যুধিষ্ঠির সশরীরে স্বর্গে গিয়েছেন, যিনি যমপুত্র। অধিকাংশই দেব-দেবীর কাহিনিতে পূর্ণ; রক্তমাংসের মানুষ সশরীরে স্বর্গে পৌঁছানোর ইতিহাস দুষ্প্রাপ্য। দেবতাকে ছেড়ে মানুষের মধ্যে ফিরে আসার সূত্র ধরেই রেনেসাঁর সূত্রপাত।
ইবনে সিনার মেরাজনামা ও আবুল আলা-আল-মা’আরির রিসালাতুল গুফরান
দান্তের কাব্যের প্রেরণা খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হবে মুসলিম দার্শনিক ইবনে সিনার মেরাজনামা গ্রন্থে। এটি ইসলামি ঐতিহ্যের পয়গম্বর মুহাম্মদ (স)-এর মেরাজ বা ঊর্ধ্বগমনের প্রেক্ষাপটে রচিত আধ্যাত্মিক গ্রন্থ। ইবনে সিনা মেরাজকে চেতনার বিভিন্ন স্তরের যাত্রারূপে উল্লেখ করেছেন। দান্তে এই কাঠামো ব্যবহার করে ভার্জিলকে পথপ্রদর্শক গুরু হিসেবে নিয়েছেন। অপরদিকে সিরীয় কবি আবুল আলা-আল-মা’আরি (৯৭৩-১০৫৭) তার রিসালাতুল গুফরান গ্রন্থটি রচনা করেন আনুমানিক ১০৩৩ খ্রিষ্টাব্দে। এই আরবি কাব্যগ্রন্থে স্বর্গ-নরকের ভ্রমণ দেখানো হয়েছে। রিসালাতুল গুফরান ষোলোআনাই কাব্য, যা গঠন-শৈলীতে নিজস্ব কাঠামো লাভ করেছে। তৎকালীন গ্রিস-ইতালিতে সুপ্রাপ্য আরব সাহিত্য রিসালাতুল গুফরানই দান্তের ডিভাইন কমেডির আকর বলে নির্ভয়ে বলা যায়।
গ্রিক-প্যাগান সংস্কৃতির প্রভাব
ডিভাইন কমেডিতে দান্তে গ্রিক-প্যাগান সংস্কৃতির ঐতিহ্যের জাগরণ ঘটিয়েছেন। তিনি ফ্লোরেন্সের ধনাঢ্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, বিশ্বাসে খ্রিষ্টান কিন্তু সংস্কৃতিতে গ্রেকো-রোমান। নরকের প্রথম বৃত্ত লিম্বো থেকে শেষবৃত্ত পর্যন্ত, তিনি অ্যাকেরন নদী, স্টাইক্স নদী পাড়ি দিচ্ছেন গ্রিক চরিত্রের সঙ্গে। নরকের মাঝি ক্যারন ভীষণ ভয়ংকর হলেও দান্তের আপনজন; তাই তাকে হার্মোনিয়ার নেকলেসটি ঘুষ হিসেবে দিতে হয় না। মেডুসা ও তিন গর্গন-কন্যা তার ঘরেরই মেয়ে। নরকের তিন বিচারক এককালে ইতালি ও গ্রিসের নানান দ্বীপরাষ্ট্রের রাজা ছিলেন। ফলে মাতা ম্যারির সঙ্গে সাক্ষাতের পূর্বে গ্রিক পুরাণের দেবতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটাই স্বাভাবিক।
উপসংহার
দান্তে ঠিক মহাকাব্য রচনা করেননি, তবে রচনা করেছেন মহান কাব্য। জীবনসত্যের উন্মোচন করতে চেয়েছেন তার পুরো জীবনজুড়ে, কাব্য-সাধনা সেই সত্যের পথকে প্রসারিত করেছে। প্রেমে ও ঔদাস্যে, বোধে ও প্রজ্ঞায়, বিশ্বাসে ও সমর্পণে কবির সমস্ত জীবন স্নাত ছিল; এরই স্মারক-শিল্প, এরই শাশ্বত-সম্ভাষণ তার ডিভাইন কমেডি। তার কাব্যের মহত্ত্ব তাকে করেছে চিরপ্রাসঙ্গিক। দান্তের ব্যক্তি-আদর্শের কারণে সংকুচিত হই, তার কাব্যাদর্শকে গ্রহণ করি। প্রাচীন ধ্রুপদী কাব্যের বেদিতে তিনি সেই শেষফুল, যা নিবেদিত হয়েছে বিশ্ব-প্রাণের মহা অর্চনায়।



