‘প্রেশার কুকার’: সিডনিতে মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলা ছবি যা সমাজের চাপ ও নারীর সংগ্রাম তুলে ধরেছে
‘প্রেশার কুকার’: সিডনিতে মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলা ছবির আলোচনা

‘প্রেশার কুকার’: সিডনিতে মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলা ছবি যা সমাজের চাপ ও নারীর সংগ্রাম তুলে ধরেছে

রায়হান রাফীর নির্মিত ‘প্রেশার কুকার’ ছবিটি সিডনির অবার্নের রিডিং সিনেমাস হলে মুক্তি পেয়েছে, যা বাংলা চলচ্চিত্র জগতে একটি আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। এই ছবির নামকরণই প্রথমে দর্শকদের আগ্রহ বাড়িয়ে তোলে, যেখানে প্রেশার কুকার যন্ত্রের মাধ্যমে সমাজে নারীদের উপর চাপের রূপক তুলে ধরা হয়েছে। খাবার সেদ্ধ করার এই যন্ত্রটি যেমন অধিক চাপে কাজ করে, তেমনি নারীরাও সমাজের বিভিন্ন চাপের মুখোমুখি হয়, যা এই ছবির কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু হিসেবে কাজ করেছে।

ছবির বিষয়বস্তু ও কাহিনির গভীরতা

‘প্রেশার কুকার’ ছবিটি শহরের চার প্রকার মেয়েদের গল্প বলেছে—নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত। প্রতিটি শ্রেণির নারীর জীবনযাত্রা, সংগ্রাম, এবং সমাজের চাপকে থ্রিলার আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হয়েছে। মূল কাহিনি নিম্নবিত্ত মেয়ে রেশমাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে, যার মাধ্যমে দর্শকরা নিম্নবিত্ত নারীদের দৈনন্দিন সংগ্রামের একটি বাস্তব চিত্র দেখতে পায়। রেশমার চরিত্রে নাজিফা তুষির অভিনয় এতটাই জীবন্ত যে, এটি দর্শকদের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

ছবিটির শুরুতে অকালপ্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদকে উৎসর্গ করা হয়েছে, যা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে কাজ করে। তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ ছবির সাথে ‘প্রেশার কুকার’-এর যোগসূত্র রয়েছে, যেখানে উভয় ছবিই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পটভূমি তুলে ধরেছে। রায়হান রাফী এই ছবিতে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মাধ্যমে খাঁটি গালাগাল ও রূঢ় বাস্তবতা উপস্থাপন করেছেন, যা ভদ্রসমাজের জন্য হজম করা কিছুটা কঠিন হতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সমাজের চাপ ও নারীর অবস্থান

এই ছবিতে দেখানো হয়েছে যে, নারীর সামাজিক অবস্থান যাই হোক না কেন, তারা প্রায়ই অসহায়ত্ব বোধ করে। নিম্নবিত্ত মেয়েরা স্বামী ও সন্তানের জন্য সবকিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকে, আবার একবার ভয় কাটিয়ে উঠলে তারা অসম সাহসী হয়ে ওঠে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত নারীরাও ক্ষমতা ও প্রেক্ষাপটের চাপে নিজেদের পরিবর্তনের গল্প বলেছে। ছবিটি নায়কবিহীন হওয়ায় এটি বাংলা চলচ্চিত্রের একটি ব্যতিক্রমী দিক, যা ১৯৯৭ সালের ‘পালাবি কোথায়’ ছবিকেও শ্রদ্ধা জানায়।

প্রায় ৩০ বছরের ব্যবধানে, ‘প্রেশার কুকার’ দেখাচ্ছে যে নারীদের জীবনে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি, শুধু প্রেক্ষাপট বদলেছে। সমাজের চাপ এখনো একই রকম রয়ে গেছে, যা এই ছবির মাধ্যমে দর্শকদের সামনে উন্মোচিত হয়েছে। প্রবাসী জীবনের সাথে এই ছবির বাস্তবতা মিলে যায়, যেখানে দর্শকরা নিজেদের জীবনের ঝামেলা ও সংগ্রামের প্রতিফলন খুঁজে পায়।

দর্শক প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা

সিডনির সিনেমা হলে ছবিটি দেখার সময় দর্শকদের মধ্যে একটি থমথমে পরিবেশ লক্ষ্য করা গেছে, যা ছবির গভীর প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়। রায়হান রাফীকে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে এমন একটি সময়োপযোগী ও সাহসী ছবি নির্মাণের জন্য, যা নারী কেন্দ্রিক থ্রিলার ধারায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে কিছু দর্শক মনে করেন যে কাহিনির যোগসূত্র আরও শক্তিশালী হতে পারত, যদিও তিন ঘণ্টার ব্যাপ্তিতে এই পরিসরের কাহিনি উপস্থাপন করা একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ ছিল।

পরিশেষে, ‘প্রেশার কুকার’ ছবিটি বাংলা চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, যা সমাজের চাপ, নারীর সংগ্রাম, এবং বাস্তবতার কঠিন দিকগুলোকে সাহসীভাবে তুলে ধরেছে। অস্ট্রেলিয়ার দর্শকদের জন্য এই ছবি দেখার সুযোগ তৈরি করে দেওয়ায় পথ প্রোডাকশনকে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে, এবং এটি প্রবাসী ও দেশের দর্শকদের মাঝে আলোচনার জন্ম দেবে বলে আশা করা যায়।