বিশ্ব রাজনীতির প্রতিধ্বনি: অস্কার মঞ্চে উত্তপ্ত মুহূর্ত
গাজায় গণহত্যা, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা, ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘায়িত সংঘাত—বিশ্ব মানচিত্র ক্রমাগত অস্থিরতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবন অনিশ্চয়তার এক গভীর ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে, যেখানে যুদ্ধের আঁচ প্রতিদিনের অস্তিত্বকে স্পর্শ করছে। এই বৈশ্বিক বাস্তবতারই এক শক্তিশালী প্রতিধ্বনি শোনা গেল এবারের অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডের মঞ্চে। 'যুদ্ধ নয়', 'ফ্রি প্যালেস্টাইন'-এর দাবি, মানবিক সংকট, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও ফ্যাসিবাদবিরোধী উচ্চারণে অনুষ্ঠানটি হয়ে উঠেছিল স্পষ্টতই রাজনৈতিক উত্তাপে পরিপূর্ণ। আর ঠিক এই উত্তপ্ত পরিবেশেই ঘোষণা করা হলো সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার-এর নাম।
পল টমাস অ্যান্ডারসন ও টমাস পিঞ্চনের সৃজনশীল মিলন
পল টমাস অ্যান্ডারসন ও টমাস পিঞ্চনের এই চলচ্চিত্রকে একটি দাপুটে 'ব্রোমান্স' হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। ২০১৪ সালে পিঞ্চনের ইনহেরেন্ট ভাইস উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ নির্মাণ করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন অ্যান্ডারসন। এবার তিনি পিঞ্চনের আরেক উপন্যাস ভিনল্যান্ড থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ভিন্ন আঙ্গিকে তৈরি করেছেন ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার। ফলাফল হিসেবে উঠে এসেছে এক অদ্ভুতুড়ে, মস্তিষ্ককে টানটান করে রাখা অ্যাকশন থ্রিলার, যেখানে কমিক বইয়ের চরিত্ররা যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। চরিত্রদের আচরণ অচেনা ও অস্বস্তিকর, তাদের শক্তি ও সামর্থ্যের সঙ্গে সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষোভ মিশে গেছে। তারা একের পর এক ঘটনার ভেতর ঢুকে পড়ে, একটি সংঘাত শেষ হওয়ার আগেই আরেকটিতে জড়িয়ে যায়। নিরবচ্ছিন্ন গতির কারণে প্রায় আড়াই ঘণ্টার এই চলচ্চিত্রটি দর্শকদের মধ্যে ক্লান্তি তৈরি করে না।
উপন্যাস থেকে চলচ্চিত্র: রাজনৈতিক বাস্তবতার অন্বেষণ
কেন এই চলচ্চিত্রকে দুই স্রষ্টার 'ব্রোমান্স' বলা হচ্ছে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ভিনল্যান্ড উপন্যাসের গভীরে। ১৯৯০ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি ক্যালিফোর্নিয়ার পটভূমিতে রচিত, যেখানে ১৯৬০-এর দশকের হিপ্পি সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক প্রতিবাদকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তরুণদের বিদ্রোহী চেতনা, তাদের সংগঠন ও আন্দোলন কীভাবে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মুখে ভেঙে পড়ে, সেই ইতিহাস এখানে পুনর্ব্যক্ত হয়েছে।
- কাউন্টার-কালচার ও 'মাদকবিরোধী যুদ্ধ'-এর নামে নিয়ন্ত্রণ
- অভিবাসীদের ওপর নিপীড়ন ও ভোগবাদী সংস্কৃতির বিস্তার
- টেলিভিশন ও মিডিয়ার মাধ্যমে সমাজ নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া
এই সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক গভীর রাজনৈতিক বাস্তবতা, যেখানে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অবক্ষয়, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের ভেতর রাষ্ট্রের অনুপ্রবেশ, নজরদারি এবং প্যারামিলিটারি বাহিনীর হাতে অঢেল ক্ষমতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমেরিকার রাজনীতির 'প্যারানয়েড স্টাইল' এখানে রূপ নিয়েছে একধরনের পাগলাটে, প্রায় ফার্সিক্যাল প্রতিরোধে।
চলচ্চিত্রের কাহিনী: বিপ্লব ও দমনের দ্বন্দ্ব
ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার-এ একটি সশস্ত্র বিপ্লবী গোষ্ঠীর গল্প বলা হয়েছে, যাদের কেউ চরমপন্থী, কেউ বামপন্থী হিসেবে বর্ণনা করে। মূলত হিপ্পি-উত্তর আমেরিকান বাম রাজনীতির এক ভাঙাচোরা, র্যাডিক্যাল রূপ এই দল। শুরুতেই তারা একটি ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টারে হামলা চালায়, যেখানে সংখ্যালঘু ও বহিরাগতদের 'অবৈধ' তকমা দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। হামলার মধ্য দিয়ে তারা বন্দীদের মুক্ত করে।
এই দলের নেতৃত্বে রয়েছেন পারফিডিয়া—এক অকুতোভয়, মারমুখী নারী, যিনি কথা বলেন না বরং সিদ্ধান্ত দেন। তার সঙ্গী বব—দেখতে ভদ্র কিন্তু ভেতরে এলোমেলো, ফুর্তিবাজ ও আইনকে তোয়াক্কা না করা এক বিপ্লবী। কিন্তু রাষ্ট্রের হাত দীর্ঘ। সামরিক ঘাঁটিতে হামলার সময় দলটি ভেঙে পড়ে, কেউ নিহত হয়, কেউ বন্দী হয়, কেউ পালিয়ে বাঁচে। পারফিডিয়া বন্দী হন কর্নেল স্টিভেন লকজয়ের হাতে, যিনি একজন উগ্র, অভিবাসনবিরোধী ও ক্ষমতালোভী সামরিক কর্মকর্তা। ফলে সেখানে পারফিডিয়া শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, ব্যক্তিগতভাবেও নিপীড়নের শিকার হন।
বব পালিয়ে যায় তাদের সন্তানকে নিয়ে এক নির্জন, আপাতশান্ত জীবনে, যেন বিপ্লবের অধ্যায় শেষ। কিন্তু বিপ্লব মানে কেবল সরকার বদল নয়, সিস্টেম বদলানোর আকাঙ্ক্ষা। আর সেই আকাঙ্ক্ষাকে রাষ্ট্র নির্মমভাবে দমন করে, বারবার একই বার্তা দেয়—বিপ্লবীকে হয় মেরে ফেল, নয় দমন করো, নয়তো তাকে জনতার শত্রু বানিয়ে দাও।
হলিউডের রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের ধারাবাহিকতা
পশ্চিমা চলচ্চিত্র বারবার এই রাষ্ট্রীয় আতঙ্ককে পর্দায় ফিরিয়ে এনেছে। ভি ফর ভেনডেটা, মাইনরিটি রিপোর্ট, স্টারশিপ ট্রুপারস, ইডিওক্রেসি—প্রতিটি চলচ্চিত্রই ভিন্নভাবে ক্ষমতা, নজরদারি ও ফ্যাসিবাদী প্রবণতার কথা বলে। আমেরিকান হিস্ট্রি এক্স বা বোলিং ফর কলাম্বাইন-এর মতো নন-ফিকশন চলচ্চিত্রগুলোও সমাজের ভেতরের সহিংসতা ও মতাদর্শিক সংকটকে উন্মোচন করে। এমনকি দ্য হ্যান্ডমেডস টেল-ও দেখায় কীভাবে একটি রাষ্ট্র ধীরে ধীরে ফ্যাসিবাদী কাঠামোয় রূপ নিতে পারে।
এই পটভূমিতে ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার আলাদা। এটি কোনো প্রচলিত ফ্যাসিস্ট ডিস্টোপিয়া নয়, বরং এটি দেখায় আদর্শকে কীভাবে রাষ্ট্র ধুলায় মিশিয়ে দেয়। এখানে সামরিক শক্তি, পুলিশি দমন ও শ্বেত আধিপত্য মিলেমিশে যেকোনো ভিন্নমতকে সহজেই 'রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে' পরিণত করে। সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা মানুষগুলো তাই আদর্শ প্রচারে নয়, বরং টিকে থাকার লড়াইয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
মূলধারার বিনোদন ও রাজনৈতিক বক্তব্যের সমন্বয়
তবে এটি শেষ পর্যন্ত একটি মূলধারার চলচ্চিত্র—ওয়ার্নার ব্রাদার্সের প্রযোজনা। ফলে রাজনৈতিক বক্তব্যকে বিনোদনের ছাঁচে ঢালতেই হয়েছে। দ্রুত গতি, ভারী অস্ত্র, হামলা, ব্যাংক লুট, যৌনতা, স্যাটায়ার এবং রুদ্ধশ্বাস গাড়ি তাড়া—হলিউডি চলচ্চিত্রের সব উপাদানই এখানে উপস্থিত। এই দ্বৈত চরিত্রই চলচ্চিত্রটিকে একদিকে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে, অন্যদিকে পুরস্কার জয়ের পর সেটিকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
চলচ্চিত্রের শেষাংশে বব তার মেয়েকে ফিরে পায়—এক নতুন প্রজন্ম, যে নিজেকে নিজেই গড়ে তুলেছে। ববের নিজের সময় হয়তো ফুরিয়ে এসেছে, কিন্তু স্বপ্ন মরে যায় না। যুদ্ধ যেমন শেষ হয় না, স্বপ্নেরও শেষ নেই—ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার যেন একের পর এক যুদ্ধের অনন্ত ধারাবাহিকতা।



