‘ইটারনিটি’ সিনেমা: অনন্তকালের ভালোবাসার দ্বন্দ্বে এক অসাধারণ ফ্যান্টাসি রোমান্স
‘ইটারনিটি’ সিনেমা: অনন্তকালের ভালোবাসার দ্বন্দ্ব

‘ইটারনিটি’: অনন্তকালের ভালোবাসার এক মর্মস্পর্শী যাত্রা

আইরিশ নির্মাতা ডেভিড ফ্রেইন ২০২৫ সালের আলোচিত সিনেমা ‘ইটারনিটি’-তে নিয়ে এসেছেন জীবন, মৃত্যু ও অনন্তকালের ভালোবাসার এক অভিনব দর্শন। এই ফ্যান্টাসি রোমান্টিক কমেডি সিনেমাটি দর্শকদের নিয়ে যায় এক অদ্ভুত আফটারলাইফ বা পরকালের জগতে, যা দেখতে অনেকটা ব্যস্ত ট্রানজিট স্টেশনের মতো।

গল্পের সূচনা: এক আকস্মিক মৃত্যু ও অনন্ত যাত্রা

পঁয়ষট্টি বছরের দাম্পত্য জীবন কাটানো ল্যারি ও জোআন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও তাঁদের মধ্যে লেগেই থাকে খুঁটিনাটি নিয়ে মান-অভিমান। একদিন পরিবারের অনাগত শিশুর জেন্ডার রিভিল পার্টিতে যান তাঁরা। উৎসবের আমেজে ভরা সেই পার্টিতে ল্যারির হাতে আসে জোআনের প্রথম স্বামী লিউকের একটি পুরোনো ছবি। কোরিয়া যুদ্ধে মারা যাওয়া লিউকের সেই ছবি দেখে আবেগতাড়িত হয়ে খাবার খেতে গিয়ে গলায় প্রিটজেল আটকে যায় ল্যারির। মুহূর্তেই দম বন্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি।

এই আকস্মিক মৃত্যুর মাধ্যমেই শুরু হয় ‘ইটারনিটি’-র যাত্রা। ল্যারি চোখ খুলে নিজেকে আবিষ্কার করেন এক অদ্ভুত স্টেশনে, যা দেখতে ষাটের দশকের পুরোনো অভিজাত হোটেলের মতো। তিনি অবাক হয়ে দেখেন, তাঁর জরাগ্রস্ত শরীর আর নেই—ফিরে পেয়েছেন যৌবন। অর্থাৎ জীবনের যে বয়সে তিনি সবচেয়ে বেশি সুখী ছিলেন, সেই বয়সের শারীরিক গঠন।

পরকালের নিয়ম ও অপেক্ষার গল্প

এই স্টেশনে ল্যারির দেখা হয় এক ‘আফটারলাইফ কনসালট্যান্ট’ বা পরকাল পরামর্শকের সঙ্গে। এই পরামর্শকের কাজ হলো মৃত আত্মাদের জন্য তাদের পছন্দমতো একটি জগৎ বেছে দেওয়া। পরিচালকের কল্পনার জগতে অনন্তকাল কাটানোর জন্য রয়েছে হাজারো অপশন।

  • বিচ ওয়ার্ল্ড: যারা সারা জীবন সমুদ্রের পাড়ে কাটাতে চান
  • ম্যান-ফ্রি ওয়ার্ল্ড: পুরুষদের ঝামেলা এড়াতে চান যারা
  • স্টুডিও ৫৪ ওয়ার্ল্ড: আশির দশকের গ্ল্যামার পছন্দ করেন যারা

তবে এই পরকালের একটি কড়া নিয়ম আছে—একবার কোনো জগৎ বেছে নিয়ে সেখানে ঢুকে পড়লে আর ফিরে আসা যাবে না। ল্যারি সিদ্ধান্ত নেন তিনি কোনো জগৎ এখনই বেছে নেবেন না। তিনি অপেক্ষা করবেন তাঁর স্ত্রী জোআনের জন্য।

জোআনের আগমন ও কঠিন সিদ্ধান্ত

জোআনের শরীরে বাসা বেঁধেছে মরণব্যাধি ক্যানসার। চিকিৎসকেরা সময় বেঁধে দিয়েছেন। কিন্তু পরিবারের আনন্দ মাটি হবে ভেবে সেই খবর গোপন রেখেছিলেন তিনি। মৃত্যুর পর জোআন যখন সেই স্টেশনে পৌঁছান, তখন ল্যারি ভেবেছিলেন তাদের পুনর্মিলন হবে। কিন্তু গল্প মোড় নেয় অন্যদিকে।

সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছে জোআনের প্রথম স্বামী লিউক। যে জোআনের জীবন থেকে বহু দশক আগে হারিয়ে গিয়েছিল, সেও যৌবনের চেহারা নিয়ে এতকাল অপেক্ষা করেছে শুধু জোআনের জন্য। এখন জোআনকে নিতে হবে এক কঠিন সিদ্ধান্ত—সে কার সঙ্গে তার অনন্তকাল কাটাবে?

  1. ল্যারির সঙ্গে, যার সঙ্গে দীর্ঘ সংসার করেছে, সুখে-দুঃখে পাশে ছিল
  2. লিউকের সঙ্গে, যে তাকে তীব্রভাবে ভালোবাসত, কিন্তু সময়ের আগেই হারিয়ে গিয়েছিল

অভিনয়শিল্পীদের অসাধারণ পারফরম্যান্স

এই সিনেমাটি অভিনয়শিল্পীদের জন্য ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ তাঁদের তরুণ শরীরে বয়স্ক ও অভিজ্ঞ মনের প্রতিফলন ঘটাতে হয়েছে। জোআন চরিত্রে এলিজাবেথ ওলসেন অনবদ্য অভিনয় করেছেন। তিনি এমন এক নারী চরিত্রের রূপদান করেছেন, যিনি সারা জীবন অন্যের খুশির জন্য নিজের ইচ্ছা বিসর্জন দিয়েছেন। মৃত্যুর পর এই অদ্ভুত পরিস্থিতিতে পড়ে তিনি প্রথমবারের মতো নিজের সুখকে প্রাধান্য দেওয়ার সাহস সঞ্চয় করেন।

মাইলস টেলার ল্যারি চরিত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। ল্যারির চরিত্রে একধরনের চার্ম বা আকর্ষণীয় দিক ফুটে উঠেছে। মৃত্যুর পর লিউকের উপস্থিতি তাকে নতুন করে লড়াই করতে শেখায়। অন্যদিকে ক্যালাম টার্নার লিউকের চরিত্রে ক্ল্যাসিক নায়কোচিত আভিজাত্য নিয়ে এসেছেন।

সিনেমার টেকনিক্যাল দিক

সিনেমার সেট ডিজাইন ও ভিজ্যুয়াল এফেক্টস প্রশংসার দাবি রাখে। স্টেশন, হোটেল ও বিভিন্ন কাল্পনিক জগতের দৃশ্যগুলো চোখের জন্য আরামদায়ক। বিশেষ করে কৃত্রিম সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখানোর জন্য পর্দা ব্যবহারের বিষয়টি বেশ নান্দনিক। পার্শ্বচরিত্রগুলোও গল্পের গতি ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। ডা’ভাইন জয় র‍্যান্ডলফ এবং জন আর্লি এজেন্ট বা পরামর্শক হিসেবে দুর্দান্ত কাজ করেছেন।

গল্পের দার্শনিক দিক

‘ইটারনিটি’ সিনেমায় জোআনের দ্বন্দ্বটি আসলে দুটি ভিন্ন ধরনের ভালোবাসার দ্বন্দ্ব। লিউকের প্রেম যেন আকাশে ভেসে থাকা মেঘের মতো কল্পনার জগতে ভেসে থাকে। অন্যদিকে ল্যারির ভালোবাসাও সত্য, কিন্তু পুরোপুরি বাস্তবতানির্ভর। পরিচালক এমনই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে হালকা মেজাজে এক গভীর দর্শন ভাবনা তুলে এনেছেন।

সিনেমায় নব্বইয়ের দশকের ‘ঘোস্ট’ বা ‘ডিফেন্ডিং ইউর লাইফ’-এর মতো সিনেমাগুলোর ছায়া স্পষ্ট। স্ট্রিমিং সার্ভিসের যুগে এমন হাই-কনসেপ্ট রোমান্টিক কমেডি এখন আর খুব একটা দেখা যায় না। সেই শূন্যস্থান পূরণ করার এক দুর্দান্ত প্রচেষ্টা এই সিনেমা।

সমালোচনা ও উপসংহার

সিনেমাটির কিছু জায়গায় গল্পের যুক্তি কিছুটা নড়বড়ে মনে হতে পারে। প্রথম দিকে আবেগের প্রাধান্য থাকলেও শেষের দিকে চিত্রনাট্যকারেরা যেন কাহিনির জট খোলার দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। ফলে ক্লাইম্যাক্সটি যতটা শক্তিশালী হতে পারত, ততটা মনে হয়নি।

তবু ডেভিড ফ্রেইন ‘ইটারনিটি’ সিনেমায় গতানুগতিক প্রেমের গল্পের বাইরে গিয়ে অনন্তকালের ভালোবাসার এক নতুন সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছেন। আধুনিক যুগের দর্শকের রুচি মাথায় রেখেও তিনি পুরোনো দিনের সিনেমার নস্টালজিয়া ধরে রেখেছেন। রোমান্টিক কমেডি ঘরানার সিনেমা যাঁরা উপভোগ করেন, তাঁদের জন্য সিনেমাটি বেশ উপভোগ্যই হবে।

সিনেমার মূল তথ্য: ইংরেজি ভাষার এই সিনেমাটির দৈর্ঘ্য ১ ঘণ্টা ৫৪ মিনিট। এটি স্ট্রিমিং করা যাবে অ্যাপল টিভিতে। পরিচালনা করেছেন ডেভিড ফ্রেইন এবং প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন এলিজাবেথ ওলসেন, মাইলস টেলার ও ক্যালাম টার্নার।