অরুন্ধতী রায়ের প্রতিবাদ: বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব থেকে সরে দাঁড়ালেন ফিলিস্তিন ইস্যুতে
অরুন্ধতী রায় বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব থেকে সরে দাঁড়ালেন

অরুন্ধতী রায়ের প্রতিবাদ: বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব থেকে সরে দাঁড়ালেন ফিলিস্তিন ইস্যুতে

ভারতের সুপরিচিত লেখক ও সমাজকর্মী অরুন্ধতী রায় ফিলিস্তিনের গাজা পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিবাদে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। গত শুক্রবার বার্তা সংস্থা এএফপিকে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এই সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, উৎসবের জুরি প্রেসিডেন্ট ও জার্মানির খ্যাতনামা চলচ্চিত্র নির্মাতা ভিম ভেন্ডার্সের মন্তব্য তাঁকে স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ করেছে, যা তাঁকে অংশগ্রহণ না করার পথে চালিত করেছে।

জুরির মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া

বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে গাজা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে ভিম ভেন্ডার্স বলেন, চলচ্চিত্র রাজনীতির বাইরে থাকা উচিত। তিনি আরও দাবি করেন যে নির্মাতাদের রাজনীতির পাল্টা ভারসাম্য রক্ষাকারী হিসেবে দেখা উচিত। জুরির আরেক সদস্য ইভা পুশ্চিন্সকা এ বিষয়ে সরাসরি অবস্থান নিতে জুরির প্রতি প্রত্যাশা করা কিছুটা অন্যায্য বলে মন্তব্য করেন। অরুন্ধতী রায় তাঁর বিবৃতিতে এই দৃষ্টিভঙ্গিকে বিবেকবর্জিত আখ্যা দেন এবং বলেন, শিল্প রাজনৈতিক হওয়া উচিত নয়, তাঁদের এ মন্তব্য সত্যিই হতবাক করে দেওয়ার মতো ব্যাপার

অরুন্ধতী রায়ের অবস্থান ও পটভূমি

অরুন্ধতী রায় ১৯৯৭ সালে তাঁর উপন্যাস দ্য গড অব স্মল থিংস-এর জন্য বুকার পুরস্কার জয়ী ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী লেখক। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের তীব্র সমালোচক এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দৃঢ় সমর্থক। এবারের বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁকে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যেখানে ১৯৮৯ সালের চলচ্চিত্র ইন হুইচ অ্যানি গিভজ ইট দোজ ওয়ানজ-এর পুনরুদ্ধার করা সংস্করণ প্রদর্শনের কথা ছিল। অরুন্ধতী এই চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লেখার পাশাপাশি অভিনয়ও করেছেন।

তিনি গাজা ভূখণ্ডে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর ইসরায়েল রাষ্ট্রের গণহত্যা বলে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় নির্মাতা ও শিল্পীরা যদি দাঁড়িয়ে এটা বলতে না পারেন, তাহলে তাঁদের জেনে রাখা উচিত, ইতিহাস তাঁদের বিচার করবে

অন্যান্য প্রতিবাদ ও উৎসবের প্রতিক্রিয়া

গাজা ইস্যুতে উৎসব কর্তৃপক্ষের অবস্থানের প্রতিবাদে মিসরের দুই প্রয়াত নির্মাতার চলচ্চিত্রও প্রত্যাহার করা হয়েছে। চলচ্চিত্র দুটি হলো আতিয়াত আল আবনুদির স্যাড সং অব তোহা ও হুসেন শরিফের দ্য ডিজলোকেশন অব আম্বার। উৎসবের এক নারী মুখপাত্র এএফপিকে বলেন, বার্লিনালে এসব সিদ্ধান্তকে সম্মান জানায়। তিনি আরও যোগ করেন, আমরা তাঁদের স্বাগত জানাতে পারছি না বলে দুঃখিত। তাঁদের উপস্থিতি উৎসবের আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করত

বার্লিনালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব বা বার্লিনাল ঐতিহ্যগতভাবে সময়োপযোগী ও প্রগতিশীল আয়োজন হিসেবে পরিচিত, কিন্তু এবারের আসরে অনেক তারকা সমসাময়িক রাজনৈতিক ইস্যুতে অবস্থান গ্রহণে অনীহা দেখিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন অভিনেতা নিল প্যাট্রিক হ্যারিস অরাজনৈতিক কাজ করতে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে, মালয়েশীয় অভিনেত্রী মিশেল ইয়ো মার্কিন রাজনীতি নিয়ে সরাসরি মন্তব্য এড়িয়ে গেছেন।

উৎসবটি এর আগেও গাজা প্রসঙ্গে বিতর্কে জড়িয়েছে। ২০২৪ সালে সেরা প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার জিতেছিল নো আদার ল্যান্ড, যা ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুতির ঘটনা নিয়ে নির্মিত। জার্মানির সরকারি কর্মকর্তারা তখন সংশ্লিষ্ট বক্তব্যকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে সমালোচনা করেছিলেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ইসরায়েলে ১ হাজার ২২১ জন নিহত হন, যার জবাবে ইসরায়েল গাজায় সর্বাত্মক হামলা চালায়। এতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭১ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক ও প্রতিবাদের সৃষ্টি করেছে।