সেই সময়টাতে আমি চরম অর্থকষ্ট আর টানাটানির মধ্যে বম্বেতে দিন কাটাতাম। একটা 'খোলি'-তে থাকতাম—ছোট্ট এক চিলতে ঘর, যার জন্য মাসে নয় টাকা ভাড়া গুনতে হতো। সেখানে না ছিল জলের ব্যবস্থা, না ছিল বিদ্যুৎ। রাত্রিবেলা গায়ের ওপর উড়ে এসে পড়ত ছারপোকা আর আরশোলা। আর চারদিকে ঘুরে বেড়াত ধেড়ে সাইজের সব ইঁদুর, এত বড় বড় ইঁদুর আমি জীবনেও দেখিনি।
আমাদের পট্টিতে সবার জন্য মাত্র একটা কমন বাথরুম ছিল, যার দরজা কখনো বন্ধ হতো না। প্রতিদিন ভোরবেলা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মেয়েরা—গুজরাটি, মারাঠি, ইহুদি, খ্রিষ্টান—সেখানে এসে ভিড় করত খাবার পানির লাইনে।
আমার অভ্যাস ছিল মেয়েরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই বাথরুমের কাজ সেরে ফেলা। কিন্তু একদিন ঘুম ভাঙতে একটু দেরি হয়ে গেল। আমি আর উপায় না পেয়ে পড়িমরি করে বাথরুমে ঢুকে পড়লাম এবং দরজা খোলাই রেখে দিলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের প্রতিবেশী এক মহিলা পানি নিতে বাথরুমে ঢুকেই তো একেবারে থমকে গেলেন! হাত থেকে পানির কলসি ফেলে দিয়ে তিনি এমনভাবে দৌড়ে পালালেন, যেন কোনো বাঘ তাকে তাড়া করছে। বাথরুমে দাঁড়িয়ে গোসল করতে করতে আমি তো হেসেই খুন!
একটু পরেই আবার দরজা খুলে গেল। এবার ভেতরে এলো ব্রিজমোহন। ততক্ষণে আমার গোসল করা শেষ, আমি জামাকাপড় পরছি।
ব্রিজমোহন এসে শুধু বলল, "আজ রোববার।"
কথাটা শুনেই আমার মনে পড়ে গেল, প্রতি রোববার ব্রিজমোহনকে বান্দ্রা যেতে হয় পেরিনের সঙ্গে দেখা করতে। পেরিন ছিল এক সাধারণ পারসি মেয়ে, যার সাথে প্রায় তিন বছর ধরে ব্রিজমোহন এক অদ্ভুত সম্পর্কে জড়িয়ে আছে। প্রতি রোববার আট আনা ধার করে ব্রিজমোহন বান্দ্রায় যায় শুধু পেরিনের পাশে বসে 'ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অফ ইন্ডিয়া'-এর 'ক্রসওয়ার্ড পাজল' সমাধান করতে। বেকার ব্রিজমোহন বাড়িতে যখন একা থাকত, তখনো অধিকাংশ সময় পেরিনের এই ধাঁধাগুলো নিয়েই মেতে থাকত। তার বুদ্ধিতে পেরিন অনেক পুরস্কার জিতলেও, ব্রিজমোহনকে কখনো তার এক আনা ভাগও দেয়নি। তবুও ব্রিজমোহন পেরিনকে ভালোবাসত। ফটোগ্রাফার ব্রিজমোহনের কাছে পেরিনের ছবির এক বিপুল সংগ্রহ ছিল—নানা ভঙ্গিমায়, নানারকম সাজে। কখনো টাইট শার্ট আর সালোয়ারে, কখনো শাড়িতে, আবার কখনো পশ্চিমা পোশাকে, এমনকি গোসলের পোশাকেও। সত্যি বলতে, পেরিন দেখতে তেমন কোনো রূপসি ছিল না; কিন্তু আমি কখনো মুখ ফুটে ব্রিজমোহনকে সে কথা বলিনি। মেয়েটি সম্পর্কে আমি কখনো বাড়তি কোনো কৌতূহলও দেখাইনি—সে কে, কী করে, কীভাবে তাদের আলাপ কিংবা আদৌ তাদের বিয়ে হবে কি না—এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনো প্রয়োজন বোধ করিনি। ব্রিজমোহন নিজেও যেচে কখনো কিছু বলেনি। আমাদের রুটিনটা ছিল একদম বাঁধা—প্রতি রোববার ভোরবেলা সে আমার থেকে আট আনা ধার করে বান্দ্রায় পেরিনের কাছে চলে যেত, আর ফিরত সেই পড়ন্ত বিকেলে।
এক রোববার বান্দ্রা থেকে ফিরে সে হঠাৎই আমায় বলে বসল, "আজ সব শেষ হয়ে গেল।"
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "কী শেষ হয়ে গেল?"
ব্রিজমোহন এবার বুকের ভেতর চেপে রাখা সবটুকু বোঝা হালকা করতে শুরু করল। সে একটানা বলে চলল, "পেরিনের সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়ে এলাম। ওকে সোজাসুজি বলে এসেছি—তুমি একটা অপয়া মেয়েমানুষ। যখনই তোমার সঙ্গে নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ করি, তখনই আমার চাকরি চলে যায়।" তখন পেরিনও ছাড়েনি, উলটো জবাব দিয়েছে, "তাহলে আর এসো না, দেখি এবার একটা পাকাপোক্ত চাকরি পাও কি না! আসলে দোষ আমার নয়, তুমিই একটা নির্বোধ আর অলস মানুষ। কাজ করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছেটাই তোমার নেই।"
এইটুকু বলে থামল ব্রিজমোহন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "কাল সকালে আমায় চার আনা ধার দিও। আমি একবার নানু ভাইয়ের কাছে গিয়ে দেখব, ওঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কোনো চাকরি জোটে কি না।"
নানু ভাই ছিলেন একজন সিনেমা পরিচালক। এর আগে তিনি বেশ কয়েকবার ব্রিজমোহনকে বাতিল করে দিয়েছিলেন। পেরিনের মতো ওঁরও ধারণা ছিল যে ব্রিজমোহন ভীষণ অলস প্রকৃতির লোক, তাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। তবুও আমি ব্রিজমোহনকে চার আনা দিলাম। পরদিন সকালে সে নানু ভাইয়ের কাছে গেল এবং বিকেলবেলা একবুক আনন্দ নিয়ে ফিরল। নানু ভাই তাকে আসলেই চাকরিতে নিয়েছেন! মাসিক আড়াইশো টাকা মাইনে, এক বছরের চুক্তি। এ কথা বলতে বলতেই সে পকেট থেকে একখানা একশ টাকার কড়কড়ে নোট বের করে দেখাল, "এটা আমার অ্যাডভান্স।"
সে বলতে লাগল, "আমার মনটা ছটফট করছে বান্দ্রায় গিয়ে পেরিনকে খবরটা দিতে। কিন্তু আবার মনে মনে ভয়ও হচ্ছে—খবরটা দিতে গেলেই যদি চাকরিটা হয়তো কালকেই খোয়াতে হয়! এই জিনিসটাই বারবার ঘটে চলেছে আমার জীবনে। সকালে চাকরি পেয়েছি, দুপুরে পেরিনকে জানাতে গেছি আর বিকেলেই চাকরিটা চলে গেছে! ভগবানই একমাত্র জানেন কোন তিথি-নক্ষত্রে ও জন্মেছিল। আমি মনে মনে ঠিক করে ফেলেছি ওর সঙ্গে আর দেখা করব না—অন্তত একটা বছর। এই একটা বছর মন দিয়ে রোজগার করব আর নিজের জন্য ভালো কিছু জামাকাপড় বানাব। তুমি তো জানোই, আমার একটা ভালো পোশাকও নেই!"
দেখতে দেখতে ছ'মাস কেটে গেল। ব্রিজমোহন এখন নিয়মিত অফিসে যায়, আসে। বেশ স্বচ্ছন্দেই দিন কাটছিল তার। নিজের জন্য দামি দামি সব জামাকাপড় বানালো, এমনকি এক ডজন কেমব্রিকের রুমালও কিনল। একজন শৌখিন মানুষের যা যা প্রয়োজন, তার সবই এখন ব্রিজমোহনের হাতের নাগালে।
এমন সময় একদিন একটা চিঠি এসে পৌঁছালো আমার হাতে—চিঠিটা ব্রিজমোহনকে লেখা। ওইদিন সন্ধেবেলা সে বাড়ি ফিরলে আমি চিঠিটা তাকে দিতে একদম ভুলে গেলাম। পরদিন সকালে যখন নাশতার টেবিলে চিঠিটা তার হাতে দিলাম, সে আঁতকে উঠে চিৎকার করে বলল, "ধ্যাততেরিকি ! আবার সেই...!"
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "ব্যাপারটা কী! কার চিঠি?"
চামচের কোণা দিয়ে খামটা খুলতে খুলতে বিরক্তমুখে ব্রিজমোহন বলল, "আবার কার হবে? পেরিনের! ওর হাতের লেখা আমি এক মাইল দূর থেকে চিনতে পারি।"
"কী লিখেছে ও?"
"আবার কী! সামনের রোববার দেখা করতে বলেছে। অবশ্যই ওর খুব জরুরি কোনো কথা আছে। দেখো, আমার এই চাকরিটাও এবার না চলে যায়!" ব্রিজমোহন যেন বেশ উত্তেজিত হয়েই জবাব দিল।
আমি কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললাম, "কী যা-তা বলছ?"
সে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল, "তুমি দেখে নিও, রোববার পেরিনের সঙ্গে দেখা করব আর সোমবার নানু ভাই অকারণে আমার কোনো খুঁত ধরে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে দেবেন। মিলিয়ে নিও আমার কথা।"
আমি বললাম, "তা অতই যদি জানো, তাহলে পেরিনের সঙ্গে দেখা করতে না গেলেই তো হয়!"
"তা হয় না; ও আমাকে দেখা করতে বলেছে মানে আমাকে যেতেই হবে।"
"কেন?"
"আসলে আমিও তো কাজ করতে করতে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, টানা ছ'মাস তো চাকরি হয়ে গেল! একদিন দু'দিনের ব্যাপার তো নয়" এই বলে ব্রিজমোহন অদ্ভুত এক হাসি হাসল। তারপর উঠে চলে গেল।
পরদিন ভোরবেলাতেই ব্রিজমোহন বান্দ্রার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল। বিকেলে ফিরে এলো ঠিকই, কিন্তু নিজের থেকে একটা কথাও বলল না। আমি যেচে জিজ্ঞেস করলাম, "তাহলে, মেয়েটার সঙ্গে দেখা হলো?"
ব্রিজমোহন নির্বিকারভাবে বলল, "হ্যাঁ দেখা হলো। আর আমি ওকে বলেছি, এই চাকরিটাও বোধহয় আমার আর বেশিদিন থাকবে না।"
এরপর সে বলল, "এখন তবে চলো বাইরে যাই, রেস্টুরেন্টে বসে কিছু খাই।" আমরা হাজি হোটেলে গিয়ে খেতে বসলাম। কিন্তু আমি সচেতনভাবেই পেরিনকে নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন করলাম না। ব্রিজমোহন শুধু খেয়ে উঠে বলল, "দেখা যাক, কাল কী হয়।"
আমি মনে মনে নিশ্চিত ছিলাম কিছুই হবে না। কিন্তু পরদিন ব্রিজমোহন অনেক আগেই কাজ থেকে ফিরে এলো। আমাকে দেখে একগাল হেসে বলল, "আবার সেই পেরিনের কারসাজি!"
আমি চমকে উঠে বললাম, "আবার কী হলো?"
"নানু ভাইয়ের স্টুডিও সিল হয়ে গেছে! আর সবাইকে বলে দেওয়া হয়েছে বাড়ি ফিরে যেতে। সত্যি বলতে, আমার জন্যই এসব হলো। নয়তো নানু ভাই আর কোম্পানির অন্যদের জীবন তো আজ কত আনন্দেই কাটার কথা ছিল!" এই বলে ব্রিজমোহন অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
"সত্যিই ভারী অদ্ভুত ঘটনা।" আমি বললাম। ব্রিজমোহন হাত বাড়িয়ে তার অতি প্রিয় ক্যামেরাটা তুলে নিল এবং কেমন এক নির্বিকার ভঙ্গিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ব্রিজমোহন আবারও বেকার হয়ে গেল। এই ক'মাসে যা কিছু জমিয়েছিল, সব ফুরিয়ে যেতেও সময় লাগল না। অবলীলায় সে আবার ফিরে গেল তার সেই পুরনো রুটিনে। প্রতি রোববার সকালে আমার সামনে এসে দাঁড়াত, আটটা আনা ধার নিয়ে রওনা দিত বান্দ্রার উদ্দেশ্যে। সেখানে পেরিনের সাথে ঘণ্টা দুয়েক কাটানো, আর পড়ন্ত বিকেলে শূন্য পকেটে এক বুক ক্লান্তি নিয়ে ঘরে ফেরা।
একদিন আমি আর নিজের কৌতূহল চেপে রাখতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, "আচ্ছা ব্রিজমোহন, পেরিন কি তোমায় সত্যি ভালোবাসে?"
ব্রিজমোহন মৃদু হাসল, যেন খুব জানা এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। বলল, "না, ও অন্য একজনকে ভালোবাসে।"
"তবে প্রতি রোববার তোমার সঙ্গে ও দেখা করতে চায় কেন?"
ব্রিজমোহন খাট থেকে উঠে বসে বলল, "হয়তো ও আমাকে বেশ মজাদার লোক বলে মনে করে। কিংবা আমার তোলা ছবিতে ওকে বেশি সুন্দর দেখায় বলে... অথবা আমি ওর সব ক্রসওয়ার্ড পাজলগুলো মিলিয়ে দিই বলে। মন্টো, আমি এই ধাঁচের মেয়েদের খুব ভালো চিনি। এরা এদের নিজের প্রেমিকের মধ্যে যা খুঁজে পায় না, তা অন্যের মধ্যে খোঁজে। তারপর দুটো মানুষকে জোড়াতালি দিয়ে নিজের মনের মতো করে একটা পুতুল বানিয়ে নেয়। এরা আসলে ভীষণ রকমের ফ্রড!"
"তাহলে তুমি জেনেশুনেও ওর কাছে যাও কেন?" আমি অবাক হয়ে তাকালাম।
"আমার বেশ মজা লাগে।"
"কীসের মজা?"
ব্রিজমোহনের চোখে এক অদ্ভুত চপলতা খেলে গেল, "ঠকতে মজা লাগে! যতবার ওর কাছে গেছি, আমার কাজ চলে গেছে। আমি দেখতে চাই এই খেলাটা কতদূর পর্যন্ত গড়ায়। তবে আমার একটা ইচ্ছে আছে মন্টো, আমি একদিন ওকে ঠিক ঠকিয়ে দেব।"
"কীভাবে?"
"আমার চাকরি চলে যাওয়ার আগেই আমি নিজে চাকরিটা ছেড়ে দেব। বসকে গিয়ে সোজাসুজি বলব যে তিনি আমায় বরখাস্ত করার আগেই আমি চলে যাচ্ছি। আর আসল কথা হলো, তিনি তো আমায় তাড়াচ্ছেন না, আমায় তাড়াচ্ছে পেরিন—যার নাকটা এত লম্বা যে ছবি তুলতে গেলে ক্যামেরার লেন্সে এসে ঠেকে যায়!" ব্রিজমোহন হাসতে হাসতে বলল, "দেখা যাক, এই বাজিটা আমি জিততে পারি কি না।"
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "ভারী অদ্ভুত ইচ্ছে তো তোমার!"
"আমার সবকিছুই অদ্ভুত," ব্রিজমোহন উদাসীন গলায় বলল। "এই তো গত রোববার আমি পেরিনের একটা চমৎকার ফটো তুলে দিলাম। ওটা ওর প্রেমিকের নাম দিয়ে কম্পিটিশনে পাঠানো হবে, আর দেখো ওটা ঠিকই কোনো না কোনো পুরস্কার জিতে নেবে!"
ব্রিজমোহন মানুষটা আসলেই এক পরম বিস্ময়। কতবার যে সে নিজের তোলা অসাধারণ সব ছবি পেরিনের বন্ধুর নাম দিয়ে পাঠিয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই। সেই ছবিগুলো যখন 'ইলাস্ট্রেটেড উইকলি'-এর পাতায় ছাপা হতো, পেরিনের চোখমুখ খুশিতে ঝলমল করে উঠত। কিন্তু ব্রিজমোহন কোনোদিন সেই মানুষটাকে নিয়ে ঈর্ষা বা বিদ্বেষ পুষে রাখেনি। সে শুধু জানত, লোকটা কোনো একটা মিলে কাজ করে এবং দেখতে বেশ সুপুরুষ।
আর এক রোববার, বান্দ্রা থেকে ফিরে ব্রিজমোহন ঘরে ঢুকেই গম্ভীর গলায় ঘোষণা করল, "পেরিনের সঙ্গে আমার সব সম্পর্ক শেষ!"
সে উদাস গলায় বলল, "আমার একখানাও ভালো জামাকাপড় নেই জানো। শেঠ নিয়াজ আলি একটা নতুন সিনেমা বানানোর তোড়জোড় করছেন। ওখানে আমি কাজ পেয়ে যাব—দু-এক দিনের মধ্যেই। তুমি কি বলতে পারো নিয়াজ আলির অফিসটা ঠিক কোথায়?"
আমি আমার এক বন্ধুকে ফোন করে নিয়াজ আলির অফিসের ঠিকানাটা ওকে জোগাড় করে দিলাম। পরদিন বিকেলে অফিস থেকে ফিরে ব্রিজমোহন বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে আমার চোখের সামনে একটা টাইপ করা কাগজ মেলে ধরল।
"দেখে নাও মন্টো, নিয়াজ সাহেবের সঙ্গে পাকা চুক্তি। নতুন ছবির জন্য। মাসে দুশো টাকা। পরে আরও বাড়বে।"
"তা পেরিনের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছ কবে?" এবার আমার হাসবার পালা।
"হ্যাঁ, এ চিন্তাটা আমারও মাথায় এসেছিল," ব্রিজমোহন মাথা চুলকে বলল, "তবে এখনই তাড়াহুড়ো করাটা ঠিক হবে না। আগে হাত-পা একটু সোজা করি, ভালো জামা-প্যান্ট বানাই। এই অগ্রিম পঞ্চাশ টাকা পেয়েছি, এর থেকে তুমি পঁচিশ রাখো।"
আমি ওর হাত থেকে পঁচিশ টাকা নিয়ে পাইস হোটেলের পুরনো ধারটা মিটিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। এরপর কয়েকটা মাস আমাদের বেশ ভালোই কাটল। আমি রোজগার করি একশো টাকা, ব্রিজমোহন দুশো। জীবন যেন আবার একটা সুন্দর ছন্দে ফিরছিল। কিন্তু মানুষের ভালো সময় বোধহয় বেশিদিন সয় না। হঠাৎ মাস পাঁচেক বাদে আবার সেই চিঠি এসে হাজির—পেরিনের লেখা। ব্রিজমোহনের ভাষায় ওটা ছিল 'মৃত্যু পরোয়ানা'। সত্যি বলতে কী, চিঠিটা দেখে আমার মনের ভেতরটাও এক অজানা আশঙ্কায় শিউরে উঠল।
কিন্তু ব্রিজমোহনকে দেখলাম বেশ হাসিমুখেই খামটা খুলতে। ছোট্ট কয়েক লাইনের চিঠি। আমি উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "এবার কী চায় মেয়েটা?"
"সামনের রোববার দেখা করতে যেতে বলেছে। খুব জরুরি কাজ আছে নাকি।" চিঠিটা আবার খামে পুরতে পুরতে ব্রিজমোহন উত্তর দিল।
"তুমি কি সত্যিই যাবে?"
"যেতেই হবে মন্টো।"
আমি এবার ওর হাত দুটো ধরে বললাম, "ভগবানের দোহাই ব্রিজ, যেও না। আমাদের কত সুন্দর শান্ত দিন কাটছে এখন। তুমি কি ভুলে গেছ, তোমার ওই বান্দ্রা যাওয়ার আট আনা জোগাড় করতেও একসময় আমার কত কষ্ট করতে হয়েছে!" ব্রিজমোহন শুধু বিষণ্ণ একটা হাসি হেসে বলল, "মনে হচ্ছে সেই কষ্টের দিনগুলো আবার ফিরে আসতে চলেছে।"
পরদিন রোববার ভোরবেলা ব্রিজমোহন বান্দ্রার ট্রেনে উঠে পড়ল। বিকেলে যখন ফিরে এলো, ওর চোখেমুখে ক্লান্তি আর জেদের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। আমাকে দেখেই বলল, "পেরিনকে সোজাসুজি বলে এলাম—এবার নিয়ে মোট বারো বার হবে যে তোমার ওই অলক্ষুনে মুখ দেখার অপরাধে আমার চাকরিটা চলে যাবে। দয়া করে এবার আমায় রেহাই দাও!"
"তা ও কী বলল?" আমি জানতে চাইলাম।
"ও বলল, 'তুমি একটা আস্ত গাধা'।"
"ঠিকই তো বলেছে ও।" আমি সায় দিলাম।
"একশো ভাগ ঠিক বলেছে!" ব্রিজমোহন বুক পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে আমার সামনে ধরল, "তাই তো কাল সকালে অফিসে গিয়ে আমি নিজেই ইস্তফা দিয়ে দেব। পেরিনের সামনে বসেই ওটা লিখেছি। চাকরি চলে যাওয়ার আগেই এবার আমি নিজে কাজটা লাথি মেরে ছেড়ে দেব!"
আমি কাগজের টুকরোটার দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইলাম। ব্রিজমোহন পেরিনের সেই তথাকথিত 'অপয়া' মায়াজাল ভাঙতে পারল কি না জানি না, তবে ভাগ্যের সাথে এই অদ্ভুত খেলায় সে নিজের মতো করে জেতার একটা মরিয়া চেষ্টা অন্তত করে গেল।
পরদিন খুব ভোরেই ব্রিজমোহন বেরিয়ে গেল। কিন্তু বিকেলে যখন ও ঘরে ফিরল, ওর চোখেমুখে সেই চিরচেনা চপল জেদ বা উত্তেজনার লেশমাত্র ছিল না; বরং সেখানে ভর করেছিল এক ম্লান, নিস্পৃহ বিষণ্নতা।
আমি ওর মেঘাচ্ছন্ন চেহারা দেখে কিছুটা শঙ্কিত হয়েই জিজ্ঞেস করলাম, "কী হলো ব্রিজমোহন? সব চুকেবুকে গেল?"
সে কোনো উত্তর দিল না। কেমন এক নিরাসক্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে শুধু আলতো করে মাথা নাড়ল। ফিসফিস করে বলল, "কিছু না, পুরো ব্যাপারটাই মিটে গেল।"
আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম, "মানে? কী মিটে গেল?"
ব্রিজমোহন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য চোখে চেয়ে রইল দেওয়ালের দিকে। তারপর শান্ত গলায় বলতে শুরু করল, "মানে হলো—আমি যখন বুকে একরাশ পাথর বেঁধে নিয়াজ আলির হাতে ইস্তফাপত্রটা তুলে দিলাম, উনি সেটা পড়ে রেগে যাওয়ার বদলে হোহো করে হেসে উঠলেন। তারপর ড্রয়ার থেকে একটা টাইপ করা চিঠি বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন, আমার বেতন নাকি দুশো থেকে বাড়িয়ে তিনশো টাকা করা হয়েছে! তাও আবার এই চলতি মাস থেকে নয়, গত মাস থেকেই ওটা কার্যকর হয়ে গেছে!"
কথাগুলো শেষ করে ব্রিজমোহন অদ্ভুত একটা ম্লান হাসল।
সেইদিন থেকে পেরিনের প্রতি ব্রিজমোহনের মনে আর বিন্দুমাত্র কৌতূহল বা আকর্ষণ অবশিষ্ট রইল না। পরে একদিন সে আমাকে বেশ আক্ষেপের সুরেই বলেছিল, "পেরিনের ওই তথাকথিত অভিশাপটা যখন চিরতরে মুছে গেল মন্টো, ঠিক তার সঙ্গে সঙ্গেই পেরিন নামের মেয়েটাও আমার মন থেকে কর্পূরের মতো উবে গেল। তবে সত্যি বলতে, আমার জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর আর সুন্দর অধ্যায়টাও আজ ওখানেই শেষ হয়ে গেল। এখন আমার মনে শুধু একটাই বড় চিন্তা তাড়া করে বেড়াচ্ছে—পেরিন তো আর নেই, তবে এখন থেকে আমার চাকরিটা খাবে কে?"



