ছড়া ‘সফদার ডাক্তার’ স্রষ্টা হোসনে আরা, নাম মুছল অ্যামাজন
ছড়া সফদার ডাক্তারের স্রষ্টা হোসনে আরা, নাম মুছল অ্যামাজন

ছোটবেলায় পড়া ছন্দ মেলানো ছড়া বা কবিতাটি অ্যামাজন থেকে প্রকাশিত একটি বইয়ে দেখে খুব আনন্দ হলো। অবাক হলাম দেখে যে লেখকের নাম লোপাট! লেখা ছিল প্রচলিত। ভাবনা তাড়া করল। কর্মস্থির হলো সঙ্গে সঙ্গে। ছড়ার স্রষ্টা কে বা কার কার ছড়াটির কথা মনে পড়ছে, এ বিষয়ে অনেকের কাছে মেসেজ পাঠানো হলো। কথা হলো, বই ও তাতে ছাপা ‘সফদার ডাক্তার’ কীভাবে হাজির হলো।

ছড়ার বই নিয়ে আনন্দ ও বিস্ময়

ঈদ উপলক্ষে নানা উপহারসমগ্রীর সঙ্গে ছোট্ট নীরব বইও উপহার পেল। পড়তেও শেখেনি সে, কথাও বলা শেখা হয়নি তার। তবে বই নিয়ে খেলতে ভালোবাসে। নীরবের খালামণি, যে নিজে বাংলা জানে না, সেই যুক্তরাষ্ট্রে বসে নীরবকে বাংলা ছড়ার বই জোগাড় করে পাঠিয়েছে, এটাই আমাদের সবাইকে অবাক করল।

ছড়ার বইটা ছোট–বড় সবাই নেড়েচেড়ে দেখছিল। বড়দেরও বইটা স্মৃতিকাতর করে তুলল। তাদের ছড়া পড়ার শৈশব কবেই তো উধাও হয়ে গেছে। তবে ‘হাট্টিমা টিম টিম’, ‘ঐ দেখা যায় তাল গাছ ঐ আমাদের গাঁ’, ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে’ ছড়াগুলো তাদের অনেক স্মৃতি উসকে দিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বইয়ের বর্ণনা ও সম্পাদনার অভাব

বইয়ের প্রথম মলাটে নিচে লেখা ‘বাংলা স্কুল ইন্টারন্যাশনাল’, আর শেষের পাতায় ভেতরে লেখা ‘ম্যানুফ্যাকচার্ড বাই অ্যামাজন ডটকম’। বইটি সুন্দর। ছাপাই-বাঁধাই, সংযোজিত ছবি, সব বেশ ভালো। তবে সম্পাদনা কে বা কারা করেছে, তার কোনো উল্লেখ নেই। কিছু ছড়া বিভিন্ন লেখকের নামসহ সযত্নে ছাপা হয়েছে আর কিছু ছড়ায় লেখকের নাম নেই। সেগুলোকে প্রচলিত ছড়া বলে ছাপা হয়েছে। কিছু হয়তো সত্যিকার অর্থেই প্রচলিত।

তেমনই একটি ছড়া বা কবিতা ‘সফদার ডাক্তার’। ছোটবেলায় অনেকেই ছড়াটি পড়েছেন, নিশ্চিত ছিলাম। আমাদের দেশে ছোটদের পাঠ্যবইয়ে ছড়াটি কোনো এক সময় ছিল। অবাক করা ব্যাপার হলো, অ্যামাজন থেকে বাংলা স্কুল ইন্টারন্যাশনালের আওতায় প্রকাশিত বইটিতে ‘সফদার ডাক্তার’–এর লেখকের নাম নেই। বলা হচ্ছে, এটি প্রচলিত ছড়া।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এটা তো ‘হাট্টিমা টিম টিম’ বা ‘চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে’ অথবা ‘দোল দোল দুলুনি, রাঙা মাথায় চিরুনি’ ছড়ার মতো প্রচলিত নয়। এই কবিতা বা ছড়ার একজন লেখক ছিলেন অবশ্যই।

লেখকের নাম খোঁজার প্রচেষ্টা

পরিচিত কয়েকজনের কাছে বার্তা পৌঁছাল। যেমন ছবি আপা, জেসমিন আপা, রীতা শিরিন, বাবলী, নূরজাহান, লুনা সাইদ, ইয়াসমিন সুলতানা। সবারই মনে পড়ল ছড়াটির কথা। সবাই লেখকের নাম মনে করতে পারছিলেন না। তবে এই ছড়া কোনো এক সময় পাঠ্যবইয়ে ছিল, তা–ও দু–একজন মনে করালেন।

তবে বন্ধু বাবলী সঙ্গে সঙ্গে লেখকের নাম জানিয়ে মেসেজের উত্তর দিল। কেউ লিখলেন গুগলে খুঁজলে বা এআইকে জিজ্ঞাসা করলেই লেখকের নাম জানা যাবে।

আমার উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। বুঝতে চেয়েছিলাম, কতজন ছোটবেলার ছড়ার কথা মনে রেখেছেন। অবাক হলাম এবং ভালোও লাগল, সবারই ছড়াটির কথা মনে ছিল। তবে ডা. বাবলীই একমাত্র লেখকের নাম তৎক্ষণাৎ জানিয়েছিল।

অল্প সময়ের মধ্যেই অনেকে উৎসাহ নিয়ে নানা তথ্য পাঠালেন। কেউ কেউ ইউটিউব ঘেঁটে ছড়ার আবৃত্তিও পাঠালেন।

বাংলাভাষীরা বিস্মৃতিপ্রবণ নয়, তা বোঝা গেল। ছড়াটি নামহীন কোনো একজনের নয়। ছড়াটি ছন্দোময়, তাই আমাদের অনেকের শৈশব পালিয়ে গেছে কবে কোন অজানায়, তবে ছড়া রয়ে গেছে হৃদয়ে গেঁথে। বিস্মিত আমি সবার সহৃদয় সাড়া পেয়ে। আন্তরিক ধন্যবাদ সবাইকে।

হোসনে আরা: ছড়াকারের পরিচয়

এই ছড়াকারের নাম হোসনে আরা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন চব্বিশ পরগনা জেলার পিয়ারা গ্রামে ১৯১৬ সালে জন্ম। পড়ার খুব আগ্রহ দেখে তাঁর বাবা সাত বছর বয়সে মেয়েটি ঢাকায় চাচার কাছে পাঠিয়েছিলেন লেখাপড়া শিখতে।

লেখিকা ছিলেন বাংলাদেশের স্বনামধন্য বহুভাষাবিদ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর ভ্রাতুষ্পুত্রী বা ভাতিজি, অন্য কথায় ভাইয়ের মেয়ে। পরবর্তী সময়ে সেই মেয়ে শিশুসাহিত্যিক ও ছড়াকার হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। ‘সফদার ডাক্তার’ হোসনে আরার অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ছড়া।

অ্যামাজন থেকে প্রকাশিত ‘হাট্টিমা টিম টিম’ বইটি যে বইয়ের সম্পাদক বা সম্পাদকমণ্ডলী বলে কেউ নেই, তাতে হোসনে আরার নাম উল্লেখ করার মতো দায়িত্বশীল কাউকে পাওয়া যায়নি।

বাংলা ভাষায় লেখা বলেই ছোট্ট নীরবকে হাজার মাইল মাইল দূর থেকে বইটি উপহার হিসেবে পাঠানো হয়েছে।

আমার তথ্যদাতাদের একজন জানিয়েছেন, লেখিকা হোসনে আরা ১৯৯৯ সালে ঢাকায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।

কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগ

আমি আইনজীবী হিসেবে আরও একটি বিষয়ে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করছি, যা হলো এই ছড়ার ও লেখিকার অন্যান্য সৃষ্টিকর্মের ওপর তাঁর স্বত্ব বা কপিরাইট আজও বহাল। অ্যামাজন লেখিকার নামই শুধু মুছে দেয়নি, তার কপিরাইটও লঙ্ঘন করেছে।

আমার আনন্দ এটুকুই যে অ্যামাজন বাংলা ভাষায় বাচ্চাদের জন্য বই প্রকাশ করেছে এবং লোকে তা কিনছেও। যেমন নীরবের অবাংলাভাষী খালামণি।