মায়া অ্যাঞ্জেলু ও রবীন্দ্রনাথ: খাঁচার পাখি থেকে বনের পাখিতে যাত্রা
মায়া অ্যাঞ্জেলু ও রবীন্দ্রনাথ: খাঁচার পাখি থেকে বনের পাখি

মার্গারিট অ্যানি জনসন, যিনি মায়া অ্যাঞ্জেলু নামে বেশি পরিচিত, তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত আমেরিকান কবি, স্মৃতিকথা লেখক, অভিনেত্রী ও নাগরিক অধিকারকর্মী। ১৯২৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জীবিত এই সাহিত্যিক মূলত তার আত্মজীবনীমূলক কবিতা 'আই নো হোয়াই দ্য কেজড বার্ড সিংস' (১৯৬৯) জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এই কবিতায় তিনি বর্ণবাদ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তার শৈশবের তিক্ত অভিজ্ঞতা ফুটিয়ে তুলেছেন।

আশ্চর্যজনকভাবে, এই কবিতা লেখার ৯১ বছর আগে, ১৮৯২ সালে, ৩১ বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন 'দুই পাখি' কবিতাটি। প্রশ্ন জাগে, বদ্ধ শৈশবের যন্ত্রণা কি দুই কবিকেই তাড়া করেছিল?

দুই ভিন্ন প্রান্তের দুই স্রষ্টা

মায়া অ্যাঞ্জেলু ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পৃথিবীর দুই প্রান্তের দুই ভিন্ন সময়ের স্রষ্টা। শ্রেণি, জাতি, লিঙ্গ ও ভাষা—সব দিক থেকেই তারা ভিন্ন। কিন্তু তাদের জীবনের শুরুর দিনগুলোতে বন্দি থাকার অভিজ্ঞতা দুজনকেই একই ভাবে ভাবিত করেছিল। তারা আমাদের শিখিয়ে গেছেন, 'And still I rise'—জীবন যেন মুক্তির আশায় আহুতি দেয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মায়ার শৈশব: খাঁচার ভিতর

মাত্র তিন বছর বয়সে মায়া ও তার দাদা বেইলিকে তাদের বিবাহবিচ্ছিন্ন বাবা-মা ট্রেনে বসিয়ে দেন দিদার বাড়ির উদ্দেশে। দিদা একটি দোকান চালাতেন প্রতিবন্ধী মামাকে নিয়ে। ছোট্ট মায়া বড় হতে থাকে মা-বাবার অমানবিকতায়, ভুগতে থাকে আত্মবিশ্বাসহীনতায়, ক্রুদ্ধ হয় শ্বেতাঙ্গদের বর্ণবিদ্বেষী মনোভাব ও দিদিমার অসহায় আপসে।

সাত বছর বয়সে মায়া ও তার ভাইবোনকে মা নিজের কাছে নিয়ে আসেন। মাত্র আট বছর বয়সে মায়ার মায়ের ছেলে-বন্ধু তাকে ধর্ষণ করে; পরে ধর্ষকটি খুন হয়। এই অভিজ্ঞতা মায়াকে নীরব করে দেয়। সংশয় ও অপরাধবোধের খাঁচায় বন্দি হন তিনি।

এই সময়ে মিসেস ফ্লাওয়ারের সান্নিধ্যে এসে মায়ার সামনে উন্মোচিত হয় সাহিত্য জগৎ। বইকে তিনি সারাজীবনের বন্ধু রূপে পান। কিন্তু ঘৃণা তাকে ছাড়ে না। শহরের একমাত্র দাঁতের ডাক্তার তার চিকিৎসা করতে অস্বীকার করে শুধু তার গায়ের রং 'কালো' বলে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রবীন্দ্রনাথের শৈশব: ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বন্দিদশা

মায়ার মতো থেঁতলানো শৈশব রবীন্দ্রনাথের ছিল না। তিনি ছিলেন সুপুরুষ, শিক্ষিত ও অভিজাত। কিন্তু রবীন্দ্র-শৈশবও কি এক অর্থে খাঁচায় বন্দি ছিল? 'জীবনস্মৃতি'-তে তিনি বাল্যবেলার বন্দিদশার কথা লিখেছেন—বাইরের আকাশ ও প্রকৃতিকে জানালা দিয়ে দেখা, মা-বাবার নৈকট্য ছাড়া গৃহভৃত্যদের তত্ত্বাবধানে কাটানো সময়।

রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত জীবন অতীব সুখের ছিল না। অবিশ্রান্ত মৃত্যুর মিছিল থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছেন, ক্রমশ আঁকড়ে ধরেছেন উপনিবেশদের সান্নিধ্য। 'গুরুদেব' উপাধি ছেড়ে হয়ে উঠতে চেয়েছেন কবি ও গানের মানুষ। দেশ, ধর্ম ও জাতির সীমাবদ্ধতা তাকেও কুরে কুরে খেয়েছে।

মায়ার পথ: খাঁচা থেকে মুক্তি

মাঝে কিছুদিন নিজের বাবার কাছে থাকতে যায় মায়া। বাবার বান্ধবী তার গায়ে হাত তোলে। এবার মায়া ঘরের মায়া ছাড়ে। গৃহহীন রাস্তার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে থাকতে শুরু করে। হাই স্কুলে এন্ট্রান্স পরীক্ষার আগেই চাকরি শুরু করে রাস্তার ছোট প্যাসেঞ্জার গাড়ির কন্ডাক্টর হিসেবে। তিনি সান ফ্রান্সিসকোর প্রথম কৃষ্ণাঙ্গী নারী কন্ডাক্টর হন।

এরপর মায়া গর্ভবতী হন; প্রেমিক তাকে ছেড়ে চলে যায়। বেইলির পরামর্শে গর্ভবতী অবস্থা স্কুলে না জানিয়ে পরীক্ষা দিয়ে পাস করেন। উথাল-পাতাল কিশোরী মায়া কখন যেন 'মা মেরি' হয়ে ওঠেন। পুত্রসন্তান প্রসব করেন। খাঁচার পাখি মায়া এবার গান গেয়ে ওঠে। সেই গান ছড়িয়ে পড়ে তার কর্মে—কখনো নর্তকী, কখনো লেখিকা, আবার কখনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও প্রশাসক হিসেবে। পাশাপাশি চলতে থাকে সফল চলচ্চিত্র নির্মাণ।

মার্টিন লুথার কিংয়ের অনুপ্রেরণায় মায়া হয়ে ওঠেন আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গীদের নাগরিক অধিকার রক্ষার আন্দোলনের মুখ। কিন্তু চোখ ঝলসানো সাফল্যও তার শৈশবের খাঁচাবন্দি জীবনের স্মৃতি মুছতে পারে না।

'দুই পাখি' ও 'কেজড বার্ড'

মায়ার 'আই নো হোয়াই দ্য কেজড বার্ড সিংস' ও রবীন্দ্রনাথের 'দুই পাখি' কবিতায় 'খাঁচার পাখি' ও 'বনের পাখি'র প্রতীকী ব্যবহার লক্ষণীয়। তবে রবীন্দ্রনাথ মায়ার মতো আশাবাদী নন; তিনি কবিতা শেষ করেন 'খাঁচার পাখি'র হতাশা দিয়ে: 'হায়! মোর শকতি নাহি উড়িবার।'

মায়া অ্যাঞ্জেলু ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—দুজনেই শৈশবের বন্দিদশা অতিক্রম করে বিশ্বসাহিত্যে অমর হয়ে আছেন। তাদের জীবন ও সাহিত্য আমাদের শেখায়, খাঁচা ভেঙে বনের পাখি হওয়ার সাহস রাখতে হবে।