থালাপতি বিজয়ের রাজনৈতিক উত্থান: তারকা থেকে মুখ্যমন্ত্রী
থালাপতি বিজয়ের রাজনৈতিক উত্থান: তারকা থেকে মুখ্যমন্ত্রী

ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে থালাপতি বিজয়ের নেতৃত্বাধীন তামিলাগা ভেটরি কাজাগাম (টিভিকে) দলের জয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্লাসে আগামী কয়েক দশক ধরে পাঠ্য হয়ে থাকতে পারে। নির্বাচনে জয়ী এই দলের অস্তিত্ব তিন বছর আগেও ছিল না, অথচ তাদের কাছে পরাজিত দ্রাবিড় মুনেত্র কাজাগামের (ডিএমকে) সাংগঠনিক ইতিহাস সাত দশকের বেশি পুরোনো। ডিএমকে ভারতের তৃণমূল পর্যায়ের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর একটি।

একটি বুথফেরত জরিপের আভাস

এবারের নির্বাচনে ডিএমকে দলের নেতা ও সদ্য সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন নিজের নির্বাচনী এলাকা কলাথুরেও হেরে গেছেন। মাত্র একটি বুথফেরত জরিপই এমন ফলাফলের আভাস দিতে পেরেছিল, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের চমকে দিয়েছে।

তারকা রাজনীতির নতুন মাত্রা

তামিলনাড়ুতে চলচ্চিত্রজগৎ থেকে রাজনীতিতে এসে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার নজির আগেও আছে, যেমন এম জি রামাচন্দ্রন ও জে জয়ললিতা। তবে এবার যা হয়েছে, তা শুধু পুরোনো ধরনের তারকা-রাজনীতির ধারাবাহিকতা নয়; এটি একেবারেই আলাদা ধরনের পরিবর্তন। টিভিকের বিজয়ের পেছনে যে ব্যাখ্যা বেশি শোনা যাচ্ছে তা হলো ‘স্টার পাওয়ার’ বা তারকার জনপ্রিয়তার জোরে জেতা। দলটির নেতা থালাপতি বিজয় চলচ্চিত্রজগৎ থেকে রাজনীতিতে এসেছেন এবং তাঁর বিশাল ভক্ত গোষ্ঠী আছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিজয়ের দল যেকোনো দৃঢ় নীতিগত পরিকল্পনা উপস্থাপন করার কারণে ক্ষমতায় আসেনি; তাদের প্রতিশ্রুতি পুরোনো দলগুলোর চেয়ে আলাদা কিছু ছিল না। বরং মানুষকে আকৃষ্ট করেছে চলচ্চিত্রের একটি চরিত্রকে বাস্তব রাজনীতিতে নিয়ে আসা। পর্দায় বিজয় যেভাবে একজন সৎ ও ন্যায়বিচারক নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, সেই ভাবমূর্তিটাই ভোটের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে কাজ করেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এমজিআর ও জয়ললিতার পথ থেকে ভিন্ন

এই জায়গাতেই বিজয়ের সঙ্গে এম জি রামাচন্দ্রন ও জে জয়ললিতার তুলনা মেলে না। তাঁরা তাঁদের তারকাখ্যাতিকে রাজনৈতিক সক্ষমতায় রূপান্তর করেছিলেন এবং সহজাতভাবেই দলীয় সংগঠন, অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও শাসন পরিচালনার দক্ষতা গড়ে তুলেছিলেন। তারকাখ্যাতি ছিল তাঁদের প্রবেশপথ, তবে সেটি তাঁদের কাজের ভিত্তি ছিল না।

নতুন রাজনৈতিক সূত্র: ভক্ত নেটওয়ার্কের ব্যবহার

এখন তামিলনাড়ুতে একটি কার্যকর রাজনৈতিক সূত্র দেখা যাচ্ছে—ভক্তদের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা, আবেগগত আনুগত্য কাজে লাগানো, একটি বিস্তৃত ইশতেহার দেওয়া ও জনপ্রিয়তাকে ভোটে রূপ দেওয়া। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পদ্ধতিতে কি সরকার চালানো সম্ভব?

টিভিকের সামনে পরীক্ষা

বিজয়ের দল টিভিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে। শাসন পরিচালনা এককালীন কোনো ঘটনা নয়; এটি নিয়মিত প্রক্রিয়া, আলোচনানির্ভর এবং অনেক ক্ষেত্রে মোহহীন কাজ। শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি না থাকলে, বিপুল জনসমর্থনও ভেঙে পড়তে পারে। তাহলে ভবিষ্যতে সতর্কবার্তার দৃষ্টান্তে পরিণত হওয়া এড়াতে টিভিকেকে এখন কী করতে হবে?

প্রথমত: ভক্ত নেটওয়ার্ককে রাজনৈতিক কর্মিবাহিনীতে রূপান্তর

বিজয়ের যে ভক্ত নেটওয়ার্ক আছে, সেটিকে একটি রাজনৈতিক কর্মিবাহিনীতে রূপান্তর করতে টিভিকেকে উদ্যোগ নিতে হবে। ফ্যান ক্লাব গড়ে ওঠে আনুগত্যের ভিত্তিতে, কিন্তু রাজনৈতিক কর্মিবাহিনী গড়ে তুলতে হয় নীতি, সাংবিধানিক কাঠামো এবং স্থানীয় শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে। এর জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত রাজনৈতিক শিক্ষা, জেলা পর্যায়ের প্রশিক্ষণ শিবির, বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক কর্মশালা আয়োজন এবং কল্যাণমূলক সেবা, ফেডারেল ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক নীতিসংক্রান্ত বিষয়গুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক সম্পৃক্ততা।

দ্বিতীয়ত: অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও নেতৃত্বের গভীরতা বৃদ্ধি

দলটির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও নেতৃত্বের গভীরতা বৃদ্ধি করতে হবে। টিভিকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারিতে এমন নেতা প্রয়োজন, যাঁরা নীতির কথা স্পষ্টভাবে বলতে পারবেন, নির্বাচনী এলাকা সামলাতে পারবেন এবং দায়িত্ব নিতে পারবেন। যদিও এম জি রামাচন্দ্রন ও জয়ললিতার দলে তাঁদের অনুপস্থিতিতে হাল ধরার মতো কোনো নেতা ছিল না বললেই চলে, যার প্রভাব আজও অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেত্র কাজাগাম (এআইএডিএমকে) দলে দেখা যায়। জয়ললিতার মৃত্যুর পর দলটি এখন তৃতীয় স্থানে নেমে গেছে।

তৃতীয়ত: সরকার পরিচালনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হওয়া

দলটিকে মুখের কথায় নয়, সরকার পরিচালনার মধ্য দিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এর অর্থ হলো স্বাস্থ্যসেবা, পানি ব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থান এবং নগর পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিস্তারিত নীতিপত্র তৈরি করা এবং সেগুলো জনগণের পর্যালোচনার জন্য উন্মুক্ত রাখা। নির্বাচনী স্লোগানকে দ্রুত সময়সীমা, বাজেট, জবাবদিহির ব্যবস্থাসহ বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনায় রূপ দিতে হবে।

চতুর্থত: তৃণমূল পর্যায়ের উপস্থিতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া

দলটিকে তাদের তৃণমূল পর্যায়ের উপস্থিতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ের নেটওয়ার্ক ও ভোটারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মতো বিষয়গুলো ডিএমকে ও এআইএডিএমকের মতো দলগুলোর শক্তির জায়গা ছিল। টিভিকেকে অনুষ্ঠাননির্ভর জনসমাবেশের রাজনীতি থেকে বের হয়ে নিয়মিত জনসম্পৃক্ততার দিকে যেতে হবে।

পঞ্চমত: পর্দা ও রাষ্ট্রকে আলাদা করা

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, টিভিকেকে টিভির পর্দা ও রাষ্ট্রকে আলাদা করতে হবে। অভিনেতা বিজয় ও রাজনৈতিক নেতা বিজয় একই নিয়মে চলতে পারবেন না। শাসনকাজ পরিচালনা করতে গেলে আপস করা, ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে এবং এমন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যা চলচ্চিত্রে দেখা যাওয়া নৈতিকতার সঙ্গে সব সময় মিলবে না। এই রূপান্তরকে সৎ ও স্বচ্ছভাবে সামাল দিতে পারলে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হবে।

তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

তামিলনাড়ু আগেও তারকাখ্যাতির রাজনীতিতে সাড়া দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি এমন একটি রাজ্য, যেখানে পেরিয়ার ই ভি রামাস্বামী ও এম করুণানিধির মতো নেতা জন্মেছেন। এই নেতারা মনে করতেন, রাজনীতি শুধু আবেগের লেনদেন নয়; বরং একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক প্রকল্প। এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার পেছনে ভোটারদের দায় নেই; বরং দলগুলোই সেটাকে নতুনভাবে গড়ে তোলা বন্ধ করেছে। মতাদর্শের জায়গাটি নামমাত্র প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়েছে, নেতৃত্ব সীমিত হয়ে গেছে। সেই অর্থে বিজয়ের জয়ী হওয়াটা আসলে কোনো আকস্মিক পরিবর্তন নয়; বরং দীর্ঘ পরিবর্তনের ফল।

বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, বিজয় তামিলনাড়ুর রাজনীতিকে আরেকটি নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। তিনি ডিএমকে ও এআইএডিএমকের বহু দশকের আধিপত্য ভেঙে দিয়েছেন। এখনকার চলচ্চিত্র তারকারা চেষ্টা করেও তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে সফল হতে পারছেন না বলে যে ধারণাটি গড়ে উঠেছিল, সেটিও ভেঙে দিয়েছেন বিজয়।

দ্য ওয়্যারে প্রকাশিত এ মন্তব্য প্রতিবেদনটি লিখেছেন জন জে কেনেডি। তিনি একজন শিক্ষাবিদ, কলাম লেখক ও রাজনীতি বিশ্লেষক। জন জে কেনেডি ভারতের বেঙ্গালুরুতে বসবাস করেন।