দুঃখেরা খোরপোশ চায়: নূর কামরুন নাহারের কবিতায় শহর-গ্রামের দ্বন্দ্ব ও মানবিকতা
নূর কামরুন নাহার কথাসাহিত্যিক হলেও তার তিনটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে—তোমার ভাগ চাই, জলের শরীর এবং দুঃখেরা খোরপোশ চায়। 'দুঃখেরা খোরপোশ চায়' গ্রন্থে ৩২টি কবিতা রয়েছে। কবিতাগুলোয় কামরুন নাহারের সৌন্দর্যবোধ এবং সমাজের কিছু অন্ধকার দিক উঠে এসেছে। এছাড়া কবির স্মৃতি-কাতরতার একটি অনুরণন লক্ষ্য করা যায়। প্রকৃতির বিভিন্ন অনুষঙ্গে কবি নিজেকে খুঁজে পেতে চেয়েছেন। সর্বোপরি কবির বিশুদ্ধ, মানবিক এবং সংবেদনশীল মনের পরিচয় প্রস্ফুটিত হয়েছে এই কাব্যগ্রন্থে। সমাজের অসংগতি বয়ানে কবির কাব্যস্বর ঋজু ও অকপট।
শহর-গ্রামের দোলাচল
নূর কামরুন নাহার ঢাকা শহরে বসবাস করেন। তার শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের বেড়ে ওঠাও এই শহরে। শহরের একঘেয়ে যান্ত্রিকতা কখনও কখনও জীবনে ক্লান্তি নিয়ে আসে। পূর্বপুরুষের স্মৃতিময় শৈশবের বসতবাড়ি, উঠান এবং নদীর কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে হয়। মাচায় ঝোলানো লাউ, পলিমাটির ঘ্রাণ, দিগন্তে মেঘের রথ—সবই কবিকে প্রবলভাবে কাছে টানে। কিন্তু চাইলেও এই শহরকে ছেড়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। শহর আর গ্রামীণ জীবনের এই দোলাচলের একটি চিত্র উঠে এসেছে 'বিষধর' নামক কবিতায়:
আমি বলি, শহর বিষধর সাপ
রক্ত হিম করা শক্ত প্যাঁচে
বেঁধেছে কষে।
নদীতে পড়েছে চরা
মৃত্তিকা মরা, মাটি ফাটা খরা।
শেষ পর্যন্ত শহরের পিচঢালা পথেই বয়ে চলে জীবনের রথ। এই শহরের জীবন রোবটের মতো—একথা সত্য। কিন্তু এখানেও ফাগুন আসে। বিকেলের হলুদ আলো আর বাতাসের নরম ছোঁয়ায় জীবন এখানেও রঙিন হয়ে ওঠে কখনও কখনও।
কাল ফাগুনের হাওয়া
রক্তাক্ত করেছে আমায় তমসায়, তৃষ্ণায়
নীলক্ষেত থেকে শাহবাগ, শাহবাগ থেকে রামপুরা
হাওয়ার আগুনে পুড়েছি আমি
কী এক অদ্ভুত নরম আততায়ী হওয়া!
কী স্নিগ্ধ আগুন! (ফাগুনের হাওয়া)
কবিতার ভাষা ও বৈশিষ্ট্য
নূর কামরুন নাহারের কবিতার স্বর নরম এবং মায়াময়। মিষ্টি একটি আবেশ ছড়িয়ে থাকে তার কবিতায়, জটিল এবং দুর্বোধ্য শব্দ দ্বারা ভারাক্রান্ত নয়। মানুষের চরিত্রের শঠতা এবং অন্ধকার দিক অথবা সমাজের অন্তর্গত যে অসুন্দর তা প্রকাশেও কবির ভাষা মৃদু ও সংযত। তার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো—ব্যক্তিগত জীবনে ঘটে যাওয়া অপ্রিয় বিষয়কেও তিনি কবিতায় তুলে আনেন দ্বিধাহীনভাবে।
কবিতায় তিনি ফেলে আসা অতীতে বারবার ফিরে যেতে চান। অতীত তাকে স্মৃতিকাতর করে। পরম মমতায় সেই স্মৃতির নানা অনুষঙ্গ তিনি তুলে আনেন। 'মাঝে মাঝে জ্বর হওয়া ভালো' কবিতায় তিনি বলেন:
মাঝে মাঝে জ্বর হওয়া ভালো
ভূতের গলির টিনের ঘর ফিরে আসে।
বিছানার পাশে আম্মা এসে বসে।
ছায়া-শরীর লেগে থাকে ছায়া-শরীরে
কপালে মায়া হাত-এ তো অনেক জ্বর- শরীর পুড়ে যাচ্ছে।
বাবার জীবনচিত্র
বাবাকে নিয়েও একটি কবিতা রয়েছে এই গ্রন্থে। অত্যন্ত আটপৌরে ভাষায় কবি বয়ান করেছেন তার বাবার সহজ, নিরাভরণ জীবন-আলেখ্য। তার বাবার যে জীবনচিত্র তিনি অঙ্কন করেছেন, সেটা শুধু তার একার বাবার জীবন নয়, আবহমান বাংলার নিম্ন মধ্যবিত্ত একজন চাকরিজীবী বাবার চিরন্তন প্রতিভূ হয়ে উঠেছেন তার বাবা। তার বাবা বগলে ছাতা নিয়ে অফিসে যেতেন। ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত হয়ে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরতেন। একদম ছাপোষা নিরীহ মানুষ ছিলেন তার বাবা, যিনি কখনো কোনো কিছুর প্রতিবাদ করতেন না। সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে তিনি নিজের জন্য নতুন জুতা, জামা, কোট কেনার কথা চিন্তা করেননি কখনো। তার জীবনে কোনো বিশ্রাম ছিল না। অবসরে ঘরের পুরনো আসবাব মেরামত করতেন নিজের হাতে। তার এই সবই ছিল সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য।
বাবাকে কিছু চাইতে দেখিনি।
কখনো শখ করতে দেখিনি
বই ছাড়া বাড়তি কিছু কিনতে দেখিনি।
আমার বাবা রাজা ছিলেন না
আমার বাবার মুখ চকচক করত ঘামে
তার কাঁধে একটি জোয়াল ছিল
আমাদের সংসারের প্রতিটি পয়সায়
ঘামের নোনা দাগ ছিল।
প্রকৃতি ও নদীর প্রতি টান
শহরের ইট-কাঠ, সারি সারি গাড়ি, ছকে বাঁধা সাজানো জীবনে কোনো প্রাণ নেই। মানুষ এখানে শরীরের সন্ধানে মত্ত থাকে, হৃদয়ের উষ্ণতা কেউ খোঁজে না। এই জীবন কবির কাঙ্ক্ষিত নয়। বরং প্রকৃতির প্রতি কবির রয়েছে অবারিত ভালোবাসার টান। এই টানেই কবি বারবার প্রকৃতির কাছে ফিরে যেতে চান। বিশেষ করে নদীর নৈসর্গিক সৌন্দর্য, তার দুইপারের নির্মল বাতাস কবিকে যেন নতুন জীবনের হাতছানি দেয় 'সোমেশ্বরী'। 'সোমেশ্বরী' কবিতায় নদীর সঙ্গে জীবনের এক অসাধারণ যোগসূত্র কল্পনা করেছেন কবি। একদা এই স্রোতস্বিনী নদী উত্তাল যৌবনে দুকুল প্লাবিত করে বয়ে চলতো। কালের পরিক্রমায় নদীর সেই যৌবন রহিত আজ। সোমেশ্বরীর তীরে দাঁড়িয়ে কবি নিজের পড়ন্ত জীবনের কথা স্মরণ করেন:
সোমেশ্বরী! যোগিনী নারী, জল নেই স্রোত নেই
শান্ত-গম্ভীর, সাধনায় স্থির, আহা! পাহাড়ি মেয়ে
চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাস, ভুলে গেছে জন্মের ইতিহাস।
পড়ন্ত বেলায় আমাকে দেখি, আমি সোমেশ্বরীর চোখে
জল নেই, স্রোত নেই, বুকে চরা, তবু বয়ে চলা।
'দুঃখেরা খোরপোশ চায়' মুক্ত ছন্দে লেখা। প্রেম ও প্রকৃতির প্রতি রয়েছে কবির গভীর অনুরাগ। কিন্তু তার প্রেমের যে অনুভব তা সুখের নয়। শহরের এই প্রেমে হৃদয়ের চেয়ে শরীরই মুখ্য। বরং কবির প্রকৃতি-বন্দনা নিখাদ এবং আবেগঘন। নদী নিয়ে লেখা কবিতায় তার নিপুণ শিল্প কুশলতার পরিচয় মেলে। কয়েকটি উদ্ধৃতি দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে:
- নদীতে চাঁদ ডুবে থাকে ঘোর মাতাল
রুপালি রূপের নেশায় কাঁপে নদী উত্তাল।
মগ্ন চাঁদ জেগে থাকে নদীর বুকের ভেতর
বাতাসে কাঁপন ওঠে জোয়ারের ডাকে
গোল চাঁদ ভেঙে ভেঙে ঢেউয়ে ঢেউয়ে
একাকার হয় জলের কাচে উদ্দাম নাচে। (ঘোড়াউত্রার পূর্ণিমায়) - ধানক্ষেত যেন সবুজ শাড়ির আঁচল
ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় দিগন্তের নীল পাহাড়ের কোল।
তারার সাথে ফুটে থাকে বুনোফুল
মৃত্তিকার রঙ্গে ভাসে আকাশের কুল
পাখিরা টুপ করে ফেলে যায় রঙিন পালক। (সোমেশ্বরী) - কেন আমাকে ফেরাতে চাও উৎসমুখে।
তুমি কি জানো না পূর্বপুরুষেরা
কাঁধের জোয়াল গাইগরু, সোঁদামাটির গন্ধ ছেড়ে
গোলামির জোয়াল নিয়েছিল কাঁধে। (কেন আমাকে ডাকো মেঘনা)
মানবিকতা ও উপসংহার
কবি কামরুন নাহার তার চারপাশের মানুষ এবং ঘটনাপ্রবাহ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং যেসব ঘটনা তার মনে ছায়া ফেলে শিল্পের তুলিতে তা কবিতায় চিত্রিত করেন। কোনো গোঁড়ামি ও পশ্চাৎপদতা তাকে ছুঁতে পারে না। তিনি মনে করেন:
আমাদের কোন ধর্ম নেই জাত নেই, শ্রেণি নেই
আমরা মানুষ,
আমরা ভালোবেসেছি মানুষের অভিধায়। (আমাদের কোনো ধর্ম ছিল না)
দুঃখেরা খোরপোশ চায়। নূর কামরুন নাহার। প্রকাশক: ফেরারি প্রকাশনী। প্রচ্ছদ: রাজিব রায়। মূল্য: ২২০ টাকা। পৃষ্ঠা: ৪৮।



