বাংলা ভাষায় এ পর্যন্ত ফিটজেরাল্ডের অনুবাদ হাতের নাগালে যতগুলো পাওয়া যায়, সেখান থেকে আমরা দুটি নমুনা উপস্থাপন করবো সর্বশেষ অনুবাদের সাথে তুলনা করার স্বার্থে। এছাড়া, একই গ্রন্থ ভিন্ন ভিন্ন হাতে কেন ভিন্ন রূপ গ্রহণ করে, সেই বিষয়টিও আমরা কিছুটা বুঝতে চেষ্টা করবো এই উদাহরণ থেকে।
তিনটি অনুবাদের নমুনা
প্রথম অনুবাদটি করেছেন রেজবিন নাহার মোনালিসা: "ছোটোবেলায় বাবার দেয়া কিছু উপদেশ আমি আজও মেনে চলি বা বলা যেতে পারে যে আজকের আমি হয়ে উঠার পিছনে বাবার উপদেশগুলোর বিরাট এক অবদান রয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে বাবার কথাগুলো খুব সাধারণ মনে হলেও, খুব সহজে কিছু গভীর কথা বাবা আমাকে শিখিয়েছিলেন। শৈশবে কোনো এক বিকালে বাবা আমাকে ঠিক এভাবে বলেছিলেন—"পৃথিবীর সবাই যে যার ভাগ্য নিয়ে জন্মায়, কারও সাথে কারও তুলনা করা বা মিল খোঁজা বেকার কাজ। তুমি কেবল এটা মনে রেখো, অনেকেই তোমার মতো সুযোগ-সুবিধা নিয়ে জীবনযাপন করে না।"
দ্বিতীয় অনুবাদটি কবীর চৌধুরীর: "যখন আমার বয়স আরো কম ছিল, আমি আরো দুর্বল ও অরক্ষিত ছিলাম, তখন আমার বাবা আমাকে কিছু উপদেশ দিয়েছিলেন। সেই উপদেশাবলীর কথা আমি তারপর থেকে বহুবার নিজের মনে ভেবে দেখেছি। তিনি বলেছিলেন, "যখন তোমার মনে কাউকে সমালোচনা করবার ইচ্ছা জাগবে, তখন শুধু এটা স্মরণ কর যে এই পৃথিবীতে তুমি যেসব সুযোগ-সুবিধা পেয়েছ সবাই তা পায়নি।"
তৃতীয় অনুবাদটি লায়লা ফারজানার: "আমার অল্পবয়সের আরো নাজুক বছরগুলিতে বাবা কিছু উপদেশ দিয়েছিল—যেগুলো আমি আজও মেনে চলি। "কারো সমালোচনা করার আগে একটা কথা মনে রেখো"—বাবা বলেছিল, "পৃথিবীতে সবাই তোমার মতো সুবিধা পায়নি।"
উপরে এফ স্কট ফিটজেরাল্ডের দ্য গ্রেট গ্যাটসবি উপন্যাসের শুরুর দুটি বাক্যের তিনটি অনুবাদ তিনজন অনুবাদকের। ভাবের মিল থাকলেও ভাষা, শৈলী আর অনুবাদের ধরনে রয়েছে বিস্তর পার্থক্য। মূল সংস্করণটি নিম্নরূপ: "In my younger and more vulnerable years my father gave me some advice that I’ve been turning over in my mind ever since. ‘Whenever you feel like criticizing any one,’ he told me, ‘just remember that all the people in this world haven’t had the advantages that you’ve had.’"
অনুবাদের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
আমরা যদি লক্ষ্য করি, তাহলে দেখতে পাবো প্রথম অনুবাদটি রীতিমতো ব্যাখ্যা বিশ্লেষণমূলক। দ্বিতীয়টি মূলের কাছাকাছি হলেও মূলের ভাষিক সৌকর্য এবং বাক্যশৈলী কিছুটা বিসর্জিত। যেমন 'আরো দুর্বল ও অরক্ষিত ছিলাম', এবং 'সেই উপদেশাবলীর' অংশটুকু একটু খেয়াল করুন। তৃতীয় অনুবাদের দিকে তাকালে আমরা দেখবো, এই সমস্ত বাহুল্য বর্জনের উদাহরণ; ইংরেজি বাক্যশৈলীকে কোনো রকম আতিশয্য ছাড়াই বাংলায় তর্জমা করা সম্ভব হয়েছে। এই উদাহরণগুলো দেখানোর দুটি উদ্দেশ্য: এক. আমরা চাইলে—মূলের স্বাদ অক্ষুণ্ন রেখেই অনুবাদ করতে পারি—অন্তত গদ্যের ক্ষেত্রে। দুই. বাংলা ভাষার সক্ষমতা সম্পর্কে যাদের ধারণা দারিদ্রসীমার নিচে, তারা তৃতীয় উদাহরণটি দেখলেই বুঝতে পারবেন যে বাংলাভাষা এতই সম্ভাবনাময় যে অন্যভাষার অভিব্যক্তিকে কোনো রকম পরিবর্তন না করেই নাগরিকত্ব দেয়া সম্ভব।
কোনো কোনো লেখকের ক্ষেত্রে পরিবর্তন অমার্জনীয় গোস্তাকি, কারণ মূলের বাক্যশৈলী পরিবর্তন বা তরল করার অর্থই হলো মূলের সৌন্দর্য কেবল লুপ্ত করাই নয়, এমনকি মূল লেখকের বৈশিষ্ট্যকেই নিশ্চিহ্ন করা। এবং ফিটজেরাল্ডের এই উপন্যাসটি যারা মূলে পড়েছেন তারা জানেন যে লেখক এই উপন্যাসটি মিলন-হুমায়ূনদের মতো সরল বর্ণনায় লিখেননি। এই লেখকের ভাষা, প্রায় প্রত্যেক বাক্যই উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রধর্মিতা ও রহস্যে ঠাসা।
লায়লা ফারজানার অনুবাদের বিশেষত্ব
এই কথাটা বুঝাবার জন্য আমি আরেকটি উদাহরণ মূল থেকে দিচ্ছি: "At 158th street the cab stopped at one slice in a long white cake of apartment-house." কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক লায়লা ফারজানার অনুবাদে এই অংশটি অনূদিত হয়েছে এভাবে: 'অ্যাপার্টমেন্ট-বাড়ির লম্বা সাদা কেকের এক ফালিতে ক্যাব থামলো।' বাড়িটাকে এখানে তুলনা করা হয়েছে সাদা কেক-এর সাথে, আবার বাড়ির একটি অংশকে তুলনা করা হয়েছে সেই কেক-এর একটা টুকরোর (slice) সাথে। আমরা দেখতে পাচ্ছি ফারজানার সতর্ক ও সৎ অনুবাদে মূলের প্রায় সবটুকুই এখানে হাজির। বর্ণনার অভিনবত্ব এবং কাব্যগুণ এই তর্জমায় সফলভাবেই এসেছে। মূল লেখক ইচ্ছে করলেই বলতে পারতেন, গাড়িটা একটা সাদা বাড়ির সামনে এসে থামলো। এরকম বর্ণনা দিলে এটি আর ফিটজেরাল্ডের হতো না।
ভাষিক বৈশিষ্ট্য একজন লেখকের ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে তা সৈয়দ হক, মাহমুদুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহির এবং সর্বশেষ আবু হেনা মোস্তফা এনাম পর্যন্ত আমরা লক্ষ্য করেছি। এদের একজনের সাথে আরেকজনের ভাষিক মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। অমিলের এই স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করা অনুবাদকেরও দায়িত্ব। অনুবাদে আমরা স্বাধীনতা নেবো যদি লক্ষ্য ভাষায় মূলের অভিব্যক্তির প্রকাশে কোনো সীমাবদ্ধতা থাকে। সেরকম থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যেখানে সেই সীমাবদ্ধতা নেই, সেখানে ভাষাকে অকারণে এলায়িত, তরল ও ব্যাখ্যামূলক করাটা অনুচিত।
লায়লা ফারজানার অনুবাদের বৈশিষ্ট্য হলো মূলের স্বাদটুকু লক্ষ্য ভাষায় সর্বোচ্চ মাত্রায় চারিয়ে দেয়া। যেমন ধরা যাক নিচের বাক্যটির বাংলা তর্জমা: "The lawn started at the beach and ran toward the front door for a quarter of a mile, jumping over sun-dials and brick walks and burning gardens—finally when it reached the house drifting up the side in bright vines as though from the momentum of its run." (The Great Gatsby, F. Scoot Fitzgeald, P-8) "সৈকত থেকে শুরু করে কোয়ার্টার মাইল জুড়ে সদর দরজা পর্যন্ত বিস্তৃত এর প্রাঙ্গণটি; সূর্য-ঘড়ি আর ইট বিছানো পায়ে চলার পথ পাড়ি দিয়ে, জ্বলন্ত বাগানের উপর আছড়ে পড়ে—ছুটতে ছুটতে অবশেষে বাড়ির পাশের উজ্জ্বল দ্রাক্ষালতাগুলো অতিক্রম করে এসে দাঁড়ায়।" (পৃ ২০)
উপরের এই অনুবাদে মূলের প্রায় কিছুই হারায়নি—ভাষা ও বর্ণনাশৈলীকে শক্ত মুঠোয় তিনি ধরে রেখেছেন; বাংলা ভাষার গ্রহণক্ষমতাকে নিশ্চিত করে তুলেছেন বাক্যগঠনের সুবোধ্য নির্মাণে। অথচ বাক্যটি মূলে—ইংরেজি ভাষায় অবিরল না হলেও—অনুষঙ্গের চিত্রল বর্ণনার কারণে দুষ্প্রাপ্য। যা মূল ভাষাতেই দুষ্প্রাপ্য তা লক্ষ্য ভাষায় গিয়ে অনুবাদের জন্য কতটা সমস্যার জন্ম দিতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।
জটিল বাক্য অনুবাদের চ্যালেঞ্জ
আমাদের অনুবাদকদের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় যখন তারা ইংরেজি জটিল বাক্যের মুখোমুখি হন। এটা ঠিক যে বাংলা ভাষার স্বাভাবিক চলনে জটিল বাক্যগঠনের দৃষ্টান্ত খুব কম। কিন্তু বাংলা গদ্যের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা লক্ষ্য করবো এই ভাষার প্রতিভাবান লেখকদের হাতে জটিল বাক্য গঠনের—ক্ষীণ হলেও—একটা ধারা ঠিকই গড়ে উঠেছে। জীবনানন্দ দাশ, সুধীন দত্ত বা বুদ্ধদেব বসুদের হাতে বাংলা গদ্যে জটিল বাক্যরীতির সফল নির্মাণ আমাদেরকে দেখিয়ে যে নিরীক্ষার স্তর পেরিয়ে এই ভাষায় জটিল বাক্য নির্মাণ কেবল সম্ভবই না, তা সুবোধ্য ও উপভোগ্য রূপেই হাজির করা সম্ভব। তাদের সাধনার ফলে বাংলা ভাষায় বাক্যরীতির এই অর্জনকে এড়িয়ে আমাদের অনেক অনুবাদকই হয় ভীরুতাবশত কিংবা আস্থাহীনতার কারণে অনেক সময়ই ইংরেজি জটিল বাক্যগুলোকে ভেঙে ফেলে বাংলা তর্জমা করে থাকেন। এটাকে আমি লক্ষ্য ভাষার দুর্বলতা নয়, বরং ভাষার উপর অনুবাদকের দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করবো। ফারজানার বাংলা ভাষাজ্ঞান এই দুর্বলতা থেকে পুরোপুরি মুক্ত।
নিচের ইংরেজি বাক্যটির বাংলা তর্জমা দেখলেই পাঠক টের পাবেন: "Not even the effeminate swank of his riding clothes could hide the enormous power of that body—he seemed to fill those glistening boots until he strained the top lacing and you could see a great pack of muscle shifting when his shoulder moved under his thin coat. It was a body capable of enormous leverage—a cruel body." (p-9) "এমনকি অশ্বারোহী-পোশাকের, মেয়েলি আভিজাত্যও তার বিশাল শরীরের পুরুষালি বৈশিষ্ট্যকে আড়াল করতে পারেনি—চকচকে বুটের ফিতাগুলোকে উপর পর্যন্ত টেনে এনে বাঁধার সময়, তার সরে যাওয়া পাতলা কোটের নিচে, কাঁধটির সুঠাম পেশিগুলো দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল। তার সুগঠিত শরীর যেন যে কোনো কিছু করতে সক্ষম—এক নিষ্ঠুর শরীর।" (পৃ-২০)
ইংরেজিতে একাধিক বাক্যাংশের সমাহারে একটি দীর্ঘ বাক্য তৈরি করেছেন মূল লেখক। এবং শুরুর দিকেই আমরা এই লেখকের শিল্পিত ভাষাভঙ্গির কথা কিছুটা আভাস দিয়েছিলাম। এই রকম ভাষা তৈরির মাধ্যমে লেখক যে শিল্পরুচি ও ভাষিক দক্ষতার কারণে অন্যদের থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছেন, সেটা লক্ষ্য ভাষায় অক্ষুণ্ন রাখতে পারলে লেখকের প্রতি সুবিচার করা হয়।
নিচে আমরা আরেকটা নমুনা দেবো মূল লেখকের ঢেউ-খেলানো ভাষার নমুনা ও তেমনি তরঙ্গশোভন তর্জমার: "A breeze blew through the room, blew curtains in at one end and out the other like pale flags, twisting them up toward the frosted wedding cake of the ceiling—and then rippled over the wine-colored rug, making a shadow on it as wind does on the sea." (P-10) "এক দমকা বাতাস হঠাৎ ঘরের মধ্যে বয়ে যায়, ফ্যাকাশে পর্দাগুলোকে পতাকার মতো এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে উড়িয়ে, ছাদের হিমায়িত বিবাহ-কেকের দিকে মোচড় নিয়ে—মদ-রঙা কার্পেটের উপর ঢেউ খেলিয়ে একটি ছায়া ফেলে—যেন সমুদ্রে বয়ে চলে বাতাস।" (পৃ-২১)
এই তর্জমায় ইংরেজি wine-colored rug-এর বাংলা রূপ ধারণ করেছে 'মদ-রঙা কার্পেট'—আমাদের সংস্কৃতিতে যেহেতু মদের বাহুল্য নেই, তাই wine-colored-এর 'মদ-রঙা' শব্দটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। মদের অনেক ধরন যেমন আছে, আছে রঙও। সুতরাং বাংলায় মদ-রঙা বলতে কী রঙ বুঝাবে তা নিয়ে পাঠক সন্দিহান হয়ে উঠতে পারেন। wine-এরও আছে একাধিক রঙ, এখানে যে wine-এর উল্লেখ আছে, তা সম্ভবত Red wine-কেই ইঙ্গিত করছে। কিন্তু আমাদের দেশ যেহেতু মদ-মত্ত নয়, বরং সোমরস অনভিজ্ঞ, ফলে লাল ওয়াইন বলার কোনো অর্থই হয় না। সেই কারণেই অনুবাদক শুধু 'মদ-রঙা' বলে ক্ষান্ত হয়েছেন।
এই উপন্যাসের কাব্যস্পর্শী কিছু বর্ণনাকে অনুবাদক কীভাবে সামলেছেন তারও কিছু নমুনা আমরা পরখ করবো যাতে করে একদিকে বাংলা ভাষার গ্রহণক্ষমতা, অন্যদিকে ভাষার প্রতি অনুবাদকের দায়টুকু আমরা বুঝে উঠতে পারি। যেমন নিচের দুটো অংশই আমরা মূলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারি: "They were both in white and their dresses were rippling and fluttering as if they had just been blown back in after a short flight around the house. I must have stood for a few moments listening to the whip and snap of the curtains and the groan of a picture on the wall." (P 10-11) "দুজনের পরনেই সাদা পোষাক; চোখ ধাঁধানো সাদা পোশাকগুলো ফুঁসে উঠে এমনভাবে কাঁপছিল, যেন তারা বাড়ির চারপাশে একটি সংক্ষিপ্ত উড়ান দিয়ে এই মাত্র এখানে অবতরণ করেছে। সংগত কারণেই পর্দার চাবুকাঘাত আর দেয়ালে একটি ছবির আর্তনাদে আমি কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিলাম।" (পৃ-২১)
"It was the kind of voice that the ear follows up and down as if each speech is an arrangement of notes that will never be played again." (P-12) "ব্যাপারটা এমন যে তার কণ্ঠস্বরকে উপলব্ধি করতে আমার কানকে ক্রমাগত উদারা-মুদারায় এমনভাবে অনুসরণ করতে হয়েছিল যেন, তার প্রতিটি বক্তব্য স্বরের এক একটি বিন্যাস, যা দ্বিতীয়বার বাজানো হবে না।" (পৃ-২২)
প্রথম উদাহরণে মূল ভাষায় একের পর এক চিত্রকল্পগুলো যেভাবে জড়ো হয়েছে, সেগুলোকে যথাযথ বিন্যাসে এবং মূলের সম্পূর্ণ অভিঘাতসহ বাংলা ভাষায় ছন্দোময় করে তুলেছেন অনুবাদক। 'পর্দার চাবুকাঘাত' আর 'ছবির আর্তনাদ'—বাংলা সাহিত্যে এমন বর্ণনা বিরল। কিন্তু মূলের অনুসরণে অনুবাদক যখন এই রকম শব্দদীপ জ্বালিয়ে লক্ষ্য ভাষাকে আলোকিত করেন, তখন পাঠক ভাষার নতুন ব্যঞ্জনে আপ্যায়িত হয়ে তৃপ্ত বোধ করেন।
দ্বিতীয় উদাহরণটি যেন অনুবাদকের দক্ষতাকে তুঙ্গ পর্যায়ে নিয়ে গেছে যখন তিনি up and down as if each speech is an arrangement of notes-এর তর্জমা করেন এভাবে: 'ক্রমাগত উদারা-মুদারায় এমনভাবে অনুসরণ করতে হয়েছিল যেন, তার প্রতিটি বক্তব্য স্বরের এক একটি বিন্যাস,' অর্থাৎ, এ-কেবল আক্ষরিক অনুবাদ নয়, অক্ষর ভেদ করে তা প্রবেশ করেছে ভাষার অন্তর্গত শৈল্পিক বিন্যাসে। অনুবাদকের সাঙ্গীতিক জ্ঞানের এক পরোক্ষ প্রক্ষেপই এই বর্ণনাকে করে তুলেছে লালিত্যমধুর।
উপসংহার
স্কট ফিটজেরাল্ড মার্কিন কথাসাহিত্যে কেন এত বরেণ্য হয়ে উঠেছেন তা এই উপন্যাসটি পাঠ করলে বুঝা যাবে। ফিটজেরাল্ডের এই চিরায়ত উপন্যাসটি ইংরেজি ভাষায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল আজ থেকে একশ বছর (১৯২৫) আগে। প্রায় একশ বছর পর বাংলা ভাষায় লায়লা ফারজানার হাতে সফল অনুবাদে প্রকাশিত হওয়ায় পাঠকরা লাভবান হলেন। একজন আদর্শ ও সফল অনুবাদক যে-কোনো সৃষ্টিশীল লেখকের মতোই ভাষার সিদ্ধিদাতা গণেশ। তার সমসাময়িক ও পরবর্তী লেখকদের জন্য ভাষিক ও শৈল্পিক মুক্তির ইশারাগুলো কীর্ণ করে রাখেন ভাষার জমিনে। ভালো অনুবাদ মানেই সাহিত্যের সম্ভাবনার বীজ রোপণ করা। আমার বিবেচনায় দ্য গ্রেট গ্যাটসবি-র সার্থক অনুবাদ এটি। বাংলা ভাষায় এরকম অনুবাদ হওয়া মানে বাংলা ভাষার সক্ষমতার পরিধি বৃদ্ধি পাওয়া যা ভাষার ক্ষেত্রে একজন সফল অনুবাদকের বড় অবদান বলে বিবেচিত হতে পারে। কবি ও অনুবাদক লায়লা ফারজানাকে অভিবাদন জানাই এই অসামান্য অনুবাদের জন্য।



