যখন দক্ষিণী সিনেমার সুপারস্টার থালাপাতি বিজয় তামিলনাড়ুর নির্বাচনি ময়দানে নামার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন অনেকেই বিষয়টিকে তার তারকা ইমেজ ও ভক্তদের কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক স্থান দখলের আরেকটি চেষ্টা হিসেবেই দেখেছিলেন। তামিলনাড়ুতে অবশ্য চলচ্চিত্র তারকাদের নেতা হিসেবে নির্বাচিত করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। অতীতে এম জি রামচন্দ্রন (এমজিআর) এবং জয়ললিতার মতো কিংবদন্তিরা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তবে কমল হাসান কিংবা রজনীকান্তের মতো মহাতারকারা তাদের বিশাল ভক্তকুলকে রাজনৈতিক ভোটব্যাংকে রূপান্তর করতে ব্যর্থ হন। কিন্তু সেই অসাধ্যই সাধন করেছেন বিজয়; তার দল ‘টিভিকে’ এখন তামিলনাড়ুর একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
একক বৃহত্তম দল হিসেবে বিজয়ের উত্থান
একক বৃহত্তম দল হিসেবে বিজয়ের এই রাজনৈতিক উত্থান কোনও আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এর পেছনে ছিল সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। এটি কেবল ডিএমকে-র ওপর মানুষের ক্ষোভের ফসল নয়। এটা সত্যি যে প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর ওপর মানুষের ক্লান্তি ছিল, তবে বিজয়ের এই রাজনৈতিক চিত্রনাট্য রজনীকান্তের মতো তার পূর্বসূরিদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।
বিজয় কী ভিন্নভাবে করেছিলেন?
বিজয় আসলে কী ভিন্নভাবে করেছিলেন, যা রজনীকান্ত কিংবা কমল হাসানের মতো তার চেয়েও বেশি জনপ্রিয় দুই মহাতারকা করতে পারেননি? বেশ কয়েকটি কারণে বিজয়ের এই ব্লকবাস্টার নির্বাচনি পারফরম্যান্সকে একটি বড় ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর এই কারণেই তিনি ১৯৭৭ সালে এমজিআরের পর তামিলনাড়ুর প্রথম অভিনেতা-থেকে-মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পথে রয়েছেন এবং ভাঙতে চলেছেন ৪৯ বছরের পুরোনো এক রেকর্ড। জয়ললিতা নিজেও তার নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন। তবে তার হাতে এআইএডিএমকে-র মতো একটি প্রতিষ্ঠিত দল আগে থেকেই ছিল।
বিজয়ের পক্ষে যা কাজ করেছে
বিজয়ের এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল তার স্পষ্ট বার্তা। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তিনি অভিনয় ছেড়ে দেবেন এবং পূর্ণকালীন রাজনীতিবিদ হিসেবে কাজ করবেন। এর মাধ্যমে বিজয় প্রমাণ করেছেন যে তিনি রাজনীতি নিয়ে যথেষ্ট গম্ভীর এবং তার এই পদক্ষেপ কোনও সাময়িক বিষয় নয়। এর জন্য তিনি তার দীর্ঘ তিন দশকের ক্যারিয়ার এবং ৭০টি মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিকে বাজি ধরেছিলেন।
কিন্তু এই স্পষ্টতার অভাব ছিল রজনীকান্তের মধ্যে। রাজনীতিতে আসার বিষয়ে দীর্ঘ এক দশক ধরে ভক্তদের মধ্যে জল্পনা-কল্পনা জিইয়ে রাখার পর শেষ পর্যন্ত কোনও নির্বাচনে অংশ না নিয়েই রজনীকান্তের রাজনৈতিক অভিলাষ ভেস্তে যায়। রজনীকান্ত তার স্টাইলিশ ভঙ্গিতে সিগারেট ও সানগ্লাস ঘোরানো দিয়ে ভক্তদের মন জয় করলেও ভোটারদের এ বিষয়ে আশ্বস্ত করতে পারেননি যে তিনি দীর্ঘ সময় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকবেন।
অন্যদিকে কমল হাসান আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিলেন। তার দল ‘মক্কাল নিধি মাইয়াম’ (এমএনএম) ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং ২০২১ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। তবে দল একটি আসনও জিততে পারেনি এবং তাদের ভোট কেবল শহরাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল। ২০২৬ সালের মধ্যে কমল হাসানের সেই দল হারিয়ে গেছে এবং তিনি এখন ডিএমকে-র সমর্থনে রাজ্যসভার একজন সাংসদ।
তা ছাড়া, রজনীকান্ত বা কমল হাসানের মতো বিজয়ের বড় পর্দায় রাজকীয় এন্ট্রি ছিল না। তামিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে (কলিউড) তার শুরুটা ছিল অত্যন্ত সাধারণ। এই সাধারণত্বই মানুষের সঙ্গে তার সংযোগ তৈরি করতে সাহায্য করেছে।
টিভিকে’র স্বতন্ত্র পরিচয়
দ্বিতীয়ত, বিজয়ের একটি বড় কৌশল ছিল তার দল টিভিকে-কে প্রতিষ্ঠিত দ্রাবিড়ীয় দলগুলো থেকে আলাদা হিসেবে তুলে ধরা। শুরুতেই টিভিকে জানিয়ে দিয়েছিল যে তারা ডিএমকে ও এআইএডিএমকে এই দুই দলের কোনোটির সঙ্গেই জোটে যাবে না। এর ফলে বিজয় নিজেকে একজন পরিচ্ছন্ন বিকল্প এবং শক্ত দুর্নীতিবিরোধী নেতা হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছেন। এটি কেবল শহুরে ও তরুণ ভোটারদের কাছে দলটির আদর্শগত স্পষ্টতা দেয়নি, বরং বড় দলগুলোর ছায়ায় নিজেদের হারিয়ে যাওয়া থেকেও রক্ষা করেছে।
অন্যদিকে, কমল হাসান ও রজনীকান্ত নিজেদের আলাদা পথ তৈরি করার চেষ্টা করলেও ডিএমকে বা এআইএডিএমকে-র বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ করা থেকে সচেতনভাবে বিরত ছিলেন। তারা ভোটারদের আকর্ষণ করার মতো কোনও নতুনত্ব নিয়ে আসতে পারেননি। বিজয়ের মতো তাদের জনসভাতেও হাজার হাজার মানুষের ভিড় হতো, কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত ভোটে রূপ নেয়নি।
আরেকটি বড় পার্থক্য হলো, ২০২৪ সালে দল গঠনের আগে বিজয় দীর্ঘ সময় ধরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন। ২০২০ সালের শুরুর দিকে সিনেমার প্রচারণার সময় তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ করতে শুরু করেন। তিনি সবসময়ই দর্শক ও ভক্তদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। ২০১৯ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) সমালোচনা করে তিনি প্রথম ‘রাজনীতিক বিজয়’-এর বার্তা দিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ টি এস সুধীরের মতে, বিজয়ের ৮৫ হাজারেরও বেশি ফ্যান ক্লাব এবং তাদের নেটওয়ার্ক এই বিজয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে। এই নেটওয়ার্কটি প্রায় ১০ বছর ধরে সামাজিক কাজ করার মাধ্যমে একটি ছায়া রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে কাজ করেছে। রাজনীতিতে দৃশ্যমান হওয়া অত্যন্ত জরুরি। এই ‘বিজয় আর্মি’র সদস্যদের তামিলনাড়ুর প্রতিটি রাস্তা ও গলিতে দেখা যেত।
জেন জি নেতা
এ ছাড়া, অন্যান্য সুপারস্টারদের তুলনায় বয়সও বিজয়ের পক্ষে গেছে। রজনীকান্ত যখন রাজনীতিতে আসার ঘোষণা দেন তখন তার বয়স ছিল ৭০-এর বেশি। কমল হাসানের বয়স ছিল ৬৫-র ওপরে। অন্যদিকে ৫১ বছর বয়সী বিজয়কে যুবসমাজ বা ‘জেন জি’ নেতা হিসেবে দেখা হয়। তামিলনাড়ুর ২ কোটিরও বেশি তরুণ ভোটারের কাছে তার জনপ্রিয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, তামিলনাড়ুর ভোটারদের প্রায় ৪১.৫ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৯ বছরের মধ্যে।
তা ছাড়া, তার ভক্তদের একটি বড় অংশ ৩৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী হওয়ায় তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ সক্রিয় কর্মী হয়ে উঠেছিলেন। এটি অনলাইনে তাদের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া প্রচারণা রুখে দিতে সাহায্য করেছে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে



