ভারতের চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান কেভিএন প্রোডাকশনসের তিনটি সিনেমা ‘টক্সিক’, ‘জন নায়গন’ ও ‘কেডি: দ্য ডেভিল’ নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। এই তিনটি সিনেমায় মোট দেড় হাজার কোটি রুপি বিনিয়োগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বক্স অফিস বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই বিপুল বিনিয়োগ থেকে লাভবান হওয়া অত্যন্ত কঠিন। ভারতীয় চলচ্চিত্রশিল্পে বড় বাজেটের ঝুঁকি নতুন কিছু নয়, তবে একসঙ্গে তিনটি বিশাল প্রজেক্টে হাজার কোটির বেশি বিনিয়োগ নিঃসন্দেহে একটি দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্ত নিয়েই এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে কেভিএনের এই তিন সিনেমা। এগুলো ঘিরে যেমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তেমনি সমানতালে জটিলতা ও অনিশ্চয়তাও দেখা দিয়েছে।
শুরুটা ছিল স্বপ্ন দিয়ে
২০২০ সালে ভেঙ্কট কে নারায়ণ যখন কেভিএন প্রোডাকশনস প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তাঁর লক্ষ্য ছিল একেবারেই স্পষ্ট—কর্ণাটকের মাটির গল্পকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা। মাত্র ছয় বছরের মধ্যে সেই স্বপ্ন পূরণের পথে এগোতে গিয়ে সংস্থাটি এখন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে সাফল্য যেমন ইতিহাস গড়তে পারে, তেমনি ব্যর্থতা বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ২০২৬ সালে এই সংস্থার তিনটি বড় সিনেমা—‘টক্সিক’, ‘জন নায়গন’ ও ‘কেডি: দ্য ডেভিল’ একসঙ্গে বাজারে আসার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তিনটি সিনেমাই ভিন্ন ভিন্ন সমস্যার মুখে পড়েছে।
‘জন নায়গন’: সম্ভাবনার শীর্ষ থেকে অনিশ্চয়তার খাদে
তামিল তারকা বিজয় অভিনীত সিনেমাটি শুরু থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এটি কেভিএনের প্রথম তামিল ভাষার প্রযোজনা এবং একই সঙ্গে বিজয়ের ক্যারিয়ারের শেষ চলচ্চিত্র বলেও প্রচার ছিল। মুক্তির আগেই ছবিটি সেন্সর জটিলতায় পড়ে। ভারতের সার্টিফিকেশন বোর্ড থেকে ছাড়পত্র না পাওয়ায় বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এর মধ্যেই ঘটে আরেক বড় ধাক্কা—মুক্তির আগেই ছবিটির উচ্চমানের পাইরেটেড সংস্করণ অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি মাদুরাইয়ের কিছু গ্রামবাসী অভিযোগ তোলেন, ছবিতে তাঁদের সম্প্রদায়কে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে প্রতিবাদও শুরু হয়। সব মিলিয়ে ছবির মুক্তির তারিখ এখনো অনিশ্চিত।
অথচ শুরুতে এই ছবির ব্যবসা ছিল নজিরবিহীন। তামিলনাড়ুর প্রেক্ষাগৃহের স্বত্ব ১০৫ থেকে ১০৬ দশমিক ৫ কোটি রুপি বিক্রি হয়, বিদেশের স্বত্ব প্রায় ৮০ কোটি টাকায়। অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও ডিজিটাল স্বত্ব কিনেছিল প্রায় ২০০ কোটি রুপিতে, আর জি তামিল স্যাটেলাইট স্বত্ব ৬৪ কোটি রুপিতে কিনে নেয়। কিন্তু দীর্ঘ বিলম্ব ও অনিশ্চয়তার কারণে এই চুক্তিগুলোর কিছু বাতিল হয়ে যায় বা ঝুলে থাকে। ট্রেড বিশ্লেষকদের মতে, এই ছবির সম্ভাব্য ক্ষতি প্রায় ৩০০ কোটি রুপির কাছাকাছি হতে পারে।
‘টক্সিক’: বিলম্বের ধাক্কা, কিন্তু হিসাব এখনো নিয়ন্ত্রণে
যশ অভিনীত, গীতু মোহনদাস পরিচালিত ‘টক্সিক: আ ফেয়ারি টেল ফর গ্রোন–আপস’ ভারতীয় সিনেমার সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোর একটি। এর বাজেট ধরা হচ্ছে ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি রুপি। ছবিটি প্রথমে এপ্রিল, পরে মার্চ, তারপর জুন—এভাবে তিনবার মুক্তির তারিখ বদলেছে। সবশেষ ঘোষণা অনুযায়ী, ছবির নতুন মুক্তির তারিখ এখনো ঠিক হয়নি। তবে ‘জন নায়গন’–এর তুলনায় এই ছবির পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। এখনো স্যাটেলাইট বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। ফলে আর্থিক ক্ষতি আপাতত সীমিত। অন্ধ্র প্রদেশ ও তেলেঙ্গানার বিতরণ অধিকার ১২০ কোটি রুপিতে বিক্রি হয়েছে, যা কোনো অ–তেলেগু ছবির ক্ষেত্রে বিরল। আন্তর্জাতিক বাজারেও আগ্রহ রয়েছে। নির্মাতারা এখন বিশ্বব্যাপী মুক্তির পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন।
‘কেডি: দ্য ডেভিল’: বিতর্কের আগুনে প্রচারণা
এই তিন ছবির মধ্যে একমাত্র মুক্তি পেয়েছে ‘কেডি: দ্য ডেভিল’। কিন্তু সেটিও এসেছে বিতর্কের ঝড় পেরিয়ে। ছবির একটি গান ‘সারকে চুনার’ অশ্লীলতা ও আপত্তিকর উপস্থাপনার অভিযোগে সমালোচনার মুখে পড়ে। এমনকি গানটি সরিয়ে নেওয়া হয়। ট্রেলারেও অসংগত ফুটেজ থাকায় সেটিও নামিয়ে দেওয়া হয়। পরিচালক প্রেম জানিয়েছেন, গানটির নতুন সংস্করণ তৈরি করা হয়েছে এবং সেন্সরের জন্য জমা দেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত ছবিটি সেন্সর ছাড়পত্র পেয়েছে এবং মুক্তি পেয়েছে। যদিও এই ছবির আর্থিক ঝুঁকি তুলনামূলক কম, তবু বিতর্কের কারণে এর বক্স অফিস সম্ভাবনা কিছুটা প্রভাবিত হতে পারে।
তিন ছবি, তিন রকম সমস্যা
চলচ্চিত্র বিশ্লেষক রমেশ বালার কথায়, ‘একটি সংস্থা, তিনটি ছবি, আর তিন ধরনের সমস্যা।’ একদিকে সেন্সর ও আইনি জটিলতা, অন্যদিকে মুক্তির বিলম্ব, আরেক দিকে বিতর্ক—সব মিলিয়ে কেভিএন প্রোডাকশনস এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। এই তিন ছবিতে মোট বিনিয়োগ ১ হাজার ৫০০ কোটি রুপির বেশি। এই মুহূর্তে সংস্থাটির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এই তিন ছবির ভাগ্যের ওপর। ‘জন নায়গন’ মুক্তি পেলে কি ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে? ‘টক্সিক’ কি আন্তর্জাতিক বাজারে সাফল্য পাবে? ‘কেডি: দ্য ডেভিল’ কি বিতর্ক কাটিয়ে দর্শক টানতে পারবে? উত্তর এখনো অজানা। তবে এটুকু স্পষ্ট—বড় স্বপ্ন দেখার সাহস যেমন আছে, তেমনি সেই স্বপ্নের মূল্যও দিতে হচ্ছে কেভিএন প্রোডাকশনসকে।



