জোহান মাসখানেক ধরে তার পাহাড়ের চূড়ায় কাঠের তৈরি বাংলো টাইপ ছোট্ট বাসাটায় আছে। চমৎকার সময় কাটছে তার। স্ত্রী ইভানা অবশ্য এখানে এই আকাশচুম্বী বাড়িতে অবসর কাটাতে রাজি হয়নি। তার নিজস্ব কিছু ব্যবসা আছে, সেগুলো ছেড়ে আসা তার পক্ষে সত্যিই কঠিন। তাই জোহানকে একাই আসতে হলো। আর ছেলেমেয়েরা তো আসবেই না, তারা যেন অন্য পৃথিবীর বাসিন্দা। তাদের জগৎ আলাদা, জেনারেশন ইনফিনিটি তারা। তবে পাহাড়ের চূড়ায় এই বাড়ি করতে জোহানের সারা জীবনের সঞ্চয় চলে গেছে, তা যাক। তার স্বপ্ন তো পূরণ হয়েছে। বাকি জীবন এখানে কাটিয়ে দিলে কেমন হয়? একটা বই লেখা যেতে পারে। তরুণ বয়সে কিছু লেখালেখির অভ্যাস ছিল। এখন আবার শুরু করা যেতে পারে...একটা বায়োগ্রাফি লিখলে কেমন হয়? তার জীবন খুব বর্ণাঢ্য না হলেও খুব খারাপও কেটেছে বলা যাবে না। ঠিক তখনই দরজায় ঠক ঠক শব্দ হলো। কেউ এসেছে। আশ্চর্য! এই সময় কে আসতে পারে? এই পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে কমপক্ষে দেড় দিন লাগে। কাজেই যে কেউ শখে চলে আসবে, এটা অসম্ভব কথা। অবশ্য সপ্তাহ শেষে রুহিন আসে। সে অবশ্য ডেলিভারিম্যান। তাকে আসতেই হয়, খাবারদাবারের ডেলিভারি নিয়ে আসে। কিন্তু আজ রুহিনের আসার ডেট নয়, তাহলে?
রোবটের আগমন
দরজায় ঠক ঠক শব্দে জোহান প্রশ্ন করল, 'কে?' গলাটা যান্ত্রিক মনে হলো জোহানের। দরজা খুলে হতভম্ব হয়ে গেল জোহান। তার দরজায় একজন 'পি থার্টি টু' রোবট দাঁড়িয়ে আছে। গায়ে একটি ভারী ওভারকোট। চার হাজার শতকে দরজায় একজন রোবট দাঁড়িয়ে থাকবে, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু যে রোবটদের তিন হাজার শতকেই সমূল ধ্বংস করা হয়েছে, তাদের কেউ একজন কী করে তার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে! রোবটটি বলল, 'বুঝতেই পারছ, আমি একজন পি থার্টি টু রোবট।' জোহান বিস্মিত হয়ে বলল, 'কী! কিন্তু তোমাদের তো গত শতাব্দীতেই...।' রোবটটি উত্তর দিল, 'না, দেখতেই পারছ, আমরা সবাই ধ্বংস হইনি। আমার সঙ্গে এক প্লাটুন পি থার্টি টু রোবট আছে। নিচের সমভূমিতে আমরা অপেক্ষা করছি। শোনো, যে কারণে তোমার এখানে আসা।' জোহান জিজ্ঞেস করল, 'কী কারণ?' রোবটটি বলল, 'তোমার বাড়িটি আমাদের দরকার।' জোহান অবাক হয়ে বলল, 'মানে?' রোবটটি পরিষ্কার করে বলল, 'মানে পরিষ্কার। আমরা আসলে একটা বিপ্লব করতে যাচ্ছি। পুরো পৃথিবী দখল করে নেব...অনেকটা নিয়েও ফেলেছি। বিভিন্ন সুবিধাজনক জায়গায় আমরা বেজক্যাম্প করছি। এই অঞ্চলে আমরা মনে করছি, তোমার বাড়িটিই সেরা।' জোহান দৃঢ়ভাবে বলল, 'অসম্ভব।'
হ্যালুসিনেশনের সন্দেহ
রোবটটি এ পর্যায়ে একটা হাসির ভঙ্গি করল এবং তার ভারী ওভারকোটের পকেটে হাত দিয়ে ছোট্ট একটা অস্ত্র বের করল। জোহান খেয়াল করে দেখল, অস্ত্রটি প্রাচীন পৃথিবীর একটা সাদামাটা অস্ত্র টু বোরের এম নাইনটিন পিস্তল, (মোজার্ট মিউজিয়ামে এই পিস্তলের ছবি আছে)। কোনো লেজার গান নয়। সামান্য টু বোরের এম নাইনটিন পিস্তল দিয়ে এরা বিপ্লব করবে! তখনই চিন্তাটা মাথায় এল জোহানের, তার কি হ্যালুসিনেশন হচ্ছে! বিষয়টা বুঝতে হলে একটু পেছনে যেতে হবে। জোহান একজন সচেতন মানুষ। এখন তার বয়স ৭৫ হলেও সে দুনিয়ার ভালো খোঁজখবর রাখে। এই তো গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে যখন পাশের ছায়াপথের একটি পৃথিবীবান্ধব গ্রহ থেকে গাছপালা আনা হয় এই পৃথিবীতে, তখনই তার সন্দেহ হয়েছিল। এই বিশেষ প্রজাতির গাছগুলো রাতের বেলায় প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে। পৃথিবীর স্বাভাবিক গাছের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি। অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড শরীরে প্রবেশ করলে হ্যালুসিনেশন হয়। এ নিয়ে সে একটি ফিচার লিখে পাঠিয়েছিল সম্পাদক রুক্সিনকে। রুক্সিন তার বন্ধু হলেও সে সেটা ছাপেনি। কেন ছাপল না? প্রশ্ন করেছিল জোহান। স্বভাবসিদ্ধ হাসির ভঙ্গিতে বলেছিল রুক্সিন, 'তুমি কি উদ্ভিদবিজ্ঞানী?' জোহান বলেছিল, 'না, আমি মোটেই উদ্ভিদবিজ্ঞানী নই। তবে তুমি জানো, আমার ইন্টারগ্যালাকটিক সব বিষয়েই পড়াশোনা আছে এবং আমি দুবার পিএইচডি করেছি এসব বিষয়েই...।' রুক্সিন বলেছিল, 'শোনো জোহান, তোমার এই থিওরি আপাতত ছাপতে পারছি না। কটা দিন যাক...বোঝো তো, সরকারের পলিসির ওপর আপাতত হাত দিতে পারছি না।'
সন্ধ্যার আগে সিদ্ধান্ত
টু বোরের এম নাইনটিন পিস্তলটির লিভার টানার শব্দে সংবিৎ ফিরে এল জোহানের। তিনি বললেন, 'ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমি বাড়িটি ছেড়ে দিচ্ছি।' রোবটটি বলল, 'হ্যাঁ, সেটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, তুমি নামতে শুরু করলে খুব দ্রুতই শহরে পৌঁছাতে পারবে মনে হচ্ছে।' জোহান বলল, 'বেশ, আমি চট করে আমার ব্যাগটা নিয়ে আসি। ব্যাগে আমার ওষুধপথ্য আছে...বুঝতেই পারছ, আমি বুড়ো মানুষ, ওষুধপথ্য লাগে...।' রোবটটি বলল, 'আচ্ছা।' জোহান তখন নিশ্চিত, তার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। কারণ, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। ভিন্ন গ্রহ থেকে অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করা বিশাল গাছগুলো এই পাহাড়েও প্রচুর পরিমাণে আছে। তারা নিশ্চয়ই কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করা শুরু করেছে...এরা সন্ধ্যা নামার আগেই এই প্রক্রিয়া শুরু করে...যে কারণে তার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। তা ছাড়া আজ ডায়াবেটিসের ওষুধ খাওয়া হয়নি। ডায়াবেটিস বাড়লেও অনেক সময় হ্যালুসিনেশন হয়...দুইয়ে দুইয়ে চার...। বাসার ভেতরে ঢুকে প্রথমেই ডায়াবেটিসের ওষুধ খেল জোহান। ফ্রিজ খুলে এক ঢোঁক অতিরিক্ত মিষ্টি আপেল জুস খেয়ে নিল। তারপর ব্যাগটা নিল হাতে; বিড়বিড় করে বলল, 'নিশ্চয়ই আমার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে...নিশ্চয়ই আমার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে...নিশ্চয়ই আমার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে...।'
প্রকৃত সত্য
বাইরে এসে দেখে, দরজায় কেউ দাঁড়িয়ে নেই। তার মানে, সত্যিই তার হ্যালুসিনেশন হচ্ছিল, জোহানের ধারণা সঠিক। পি থার্টি টু রোবটের কোনো পাত্তা নেই। উফ্…আনন্দে হুই বলে একটা চিৎকারও দিয়ে ফেলল জোহান। ব্যাগটা ঘরের ভেতর ছুড়ে দিয়ে বারান্দার চেয়ারটায় যখন বসতে যাবে, তখন দেখে হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে আসছে তার স্ত্রী ইভানা...! জোহান চিৎকার করে বলল, 'ইভানা!' ইভানা বলল, 'হ্যাঁ আমি...উফ্ উফ্।' জোহান জিজ্ঞেস করল, 'তু-তুমি কোত্থেকে?' ইভানা বলল, 'কেন, শোনোনি কিছু?' জোহান বলল, 'কী শুনব?' ইভানা কাঁদতে শুরু করে বলল, 'পৃথিবী দখল করে নিয়েছে পি থার্টি টু রোবটরা। ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়েছে চারদিকে...আমি কোনোমতে পালিয়ে এসেছি...' জোহানের মনে হলো, নিশ্চয়ই দ্বিতীয় পর্যায়ে হ্যালুসিনেশন শুরু হয়েছে তার...ইভানার পক্ষে এভাবে এখানে একা আসা অসম্ভব একটা ব্যাপার...।
শেষ পরিণতি
ঠিক তখনই সেই রোবটকে দেখা গেল, তার পেছনে আরও দুজন। ওরা তিনজনই দেখতে প্রায় একই রকম। তবে প্রথম লোকটার হাতের এম নাইনটিন পিস্তলটার কারণে তাকে আলাদা করা যাচ্ছে। লোকটা তার যান্ত্রিক গলায় একটু কাশল, তারপর বলল, 'দুঃখিত! মিস্টার জোহান, আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই, সিদ্ধান্ত একটু বদলেছি,' বলেই তার হাতের টু বোরের এম নাইনটিন পিস্তল থেকে গুলি ছুড়ল। এই পিস্তলের বুলেটের থ্রাস্ট অনেক বেশি। ইভানার বুকেই সম্ভবত আঘাত করল বুলেটটি, হতভম্ব জোহান দেখল ছিটকে পড়ল ইভানা, তারপর গড়িয়ে পড়ে গেল পাহাড় থেকে নিচে...চিৎকার দিতে যাবে, তার আগেই দ্বিতীয় বুলেটটি আঘাত হানল জোহানকে। আছড়ে পড়ল জোহান। উপুড় হয়ে পড়ল সে। তীব্র একটা ব্যথা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে জোহানের, মাথা ঘুরিয়ে ইভানা যেদিকটায় ছিটকে পড়েছে পাহাড় থেকে, সেদিকে তাকানোর চেষ্টা করল...পারল না। ধপ করে মাথাটা কাঠের পাটাতনের ওপর পড়ে গেল। তখনই টের পেল, টু বোরের এম নাইনটিন পিস্তল হাতে লোকটা তার দিকে এগিয়ে আসছে। ঝুঁকে পড়ে তার কানের কাছে মুখটা এনে যান্ত্রিক গলায় ফিসফিস করল লোকটা, 'মিস্টার জোহান, আপনি ঠিকই ধরেছেন, এটা হ্যালুসিনেশন, তবে রিপিটেড হ্যালুসিনেশন! একটা মিথ্যাকে বারবার বললে যেমন সত্যি হয়ে যায়, অনেকটা ওই রকম আরকি...আমাদের বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক!'



