‘প্রেশার কুকার’: ঢালিউডের নারীবাদী সিনেমায় নগরজীবনের চাপ ও সংগ্রামের রূপক
ফরিদুর রেজা সাগরের প্রযোজনা ও রায়হান রাফীর পরিচালনায় নির্মিত ‘প্রেশার কুকার’ সিনেমাটি একটি নারীবাদী ও সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হিসেবে দর্শকদের সামনে হাজির হয়েছে। এই চলচ্চিত্রে ঢাকা শহরের চারজন নারীর ব্যক্তিগত সংগ্রাম, মধ্যবিত্ত সমাজের আর্থিক টানাপোড়েন এবং পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর অন্ধকার দিকগুলো তীক্ষ্ণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। হাইপারলিংক স্টাইল ব্যবহার করে বহু বছর ধরে চলমান নারীর সংগ্রামশীলতাকে আধুনিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা বাংলা চলচ্চিত্রে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
নামকরণের প্রতীকী অর্থ ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
‘প্রেশার কুকার’ নামটি প্রতীকী অর্থে বেছে নেওয়া হয়েছে, যা নাগরিক জীবনে নারীদের সম্মুখীন হওয়া মানসিক, সামাজিক ও পারিবারিক চাপের রূপক হিসেবে কাজ করে। আধুনিক নগরজীবনের জটিলতা ও ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশার চাপ বোঝাতেই এই নামকরণ অত্যন্ত জুতসই হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২০ সালে ভারতের তেলেঙ্গানায় মুক্তি পাওয়া একই নামের একটি তেলেগু সিনেমা রয়েছে, যা পারিবারিক কমেডি ড্রামা হিসেবে পরিচিত। তবে ঢালিউডের এই সিনেমার গল্প, চরিত্র ও বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন, যেখানে ঢাকা শহরকে একটি বিশালাকায় ‘প্রেশার কুকার’ হিসেবে রূপকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
নির্মাণশৈলী ও গল্প বলার কৌশল
রায়হান রাফী এই সিনেমায় স্ক্রিপ্টিং, নির্মাণশৈলী ও গল্প বলার ঢঙে নতুন স্তরের পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। পুরো গল্পকে মেটাফোরিক্যাল বা রূপকধর্মী হিসেবে উপস্থাপনের মাধ্যমে ঢাকা শহরকে কেবল একটি লোকেশন নয়, বরং একটি জীবন্ত চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা, ঘিঞ্জি লোকালয়, নাইট ক্লাব ও নাগরিক যান্ত্রিকতা সংলাপ ও দৃশ্যে এমনভাবে আনা হয়েছে, যা প্রতিটি মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। সংলাপগুলো ধারালো ও বাস্তবসম্মত, যা চরিত্রগুলোর ইমোশনাল গ্রাফ ও আবেগের বহিঃপ্রকাশ সতেজভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
চরিত্র বিশ্লেষণ ও অভিনয়
সিনেমাটিতে শবনম বুবলী, নাজিফা তুষি, মারিয়া শান্ত এবং স্নিগ্ধা চৌধুরীর অভিনয় দর্শকদের গভীর প্রভাব ফেলেছে। প্রতিটি চরিত্র সমাজের বিভিন্ন স্তরের নারীর প্রতিচ্ছবি হিসেবে কাজ করে:
- রেশমা (নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায়): শত প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই, যা নারীর অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক।
- বুবলী: উচ্চমধ্যবিত্ত সংসারী নারী হিসেবে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দেওয়ার চিত্র।
- স্নিগ্ধা চৌধুরী ও মারিয়া শান্ত: আধুনিক শহরের তরুণী ও কর্মজীবী নারীদের প্রতিনিধিত্ব করে, যারা করপোরেট জগৎ ও ব্যক্তিজীবনে সূক্ষ্ম বৈষম্য ও মানসিক হেনস্তার শিকার হন।
নাজিফা তুষির অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসনীয়, যেখানে তাঁর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, চাহনি ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চরিত্রের গভীরতা বাড়িয়েছে। ‘হাওয়া’ সিনেমার পর এটি তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অভিনয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সামাজিক বার্তা ও সমালোচনা
‘প্রেশার কুকার’ সিনেমায় নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা, দৈহিক ও মানসিক নিষ্ঠুরতা, শহুরে জীবনের যান্ত্রিকতা, একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতা, এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নৈতিক অবক্ষয়ের মতো নেতিবাচক সামাজিক অসংগতিগুলো সুনিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। স্পা সেন্টারে কর্মরত নারীদের জীবনের গুমোট পরিস্থিতি ও দেহ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হওয়ার নিষ্ঠুর পরিণতি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে চিত্রিত হয়েছে। এছাড়া, পুলিশ বাহিনীর ঘুষ, দুর্নীতি ও বিচার–বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের চিত্রায়ণ ঢালিউডের ইতিহাসে অভিনব বলে বিবেচিত হচ্ছে।
সঙ্গীত ও কারিগরি দিক
সিনেমার গান ও নেপথ্য সংগীত কেবল বিনোদনের জন্য নয়, বরং গল্পের মানসিক চাপ ও থ্রিলার আমেজ ফুটিয়ে তোলার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রেশার কুকারের বাষ্পের শব্দ, ধাতব ঘর্ষণ ও পানির টগবগানির শব্দগুলো নেপথ্য মিউজিকের সঙ্গে মিশিয়ে দর্শকদের মনে একধরনের দমবন্ধ করা অস্বস্তি তৈরি করা হয়েছে। ঢাকা শহরের একাকিত্ব ও যান্ত্রিকতা নিয়ে কিছু বিরহী গান ও আবহসংগীত রয়েছে, যা দর্শকদের ‘লাইফ ইন আ... মেট্রো’ সিনেমার আমেজ মনে করিয়ে দেয়।
সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
সিনেমাটি এর সাহসী নির্মাণ ও ভিন্নধর্মী গল্পের জন্য প্রশংসিত হলেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে:
- কিছু দৃশ্যে অতিরিক্ত স্ল্যাং বা অশ্লীল ভাষার ব্যবহার, যা ছোটদের জন্য উপযুক্ত নয়।
- পুলিশের একপেশে নেতিবাচক চিত্রায়ণ ও গুমোট কালার গ্রেডিং।
- অসম্পূর্ণ বা ধীরগতির ক্লাইম্যাক্স এবং অযথা দীর্ঘ করা দৃশ্য, যা দর্শকদের কাছে বিরক্তিকর লেগেছে।
তবে এসব দুর্বল দিক সত্ত্বেও, ‘প্রেশার কুকার’ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি মোড় ঘোরানো সিনেমা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রায়হান রাফী বাণিজ্যিক সিনেমার গণ্ডি পেরিয়ে নারীপ্রধান এই সামাজিক সিনেমা নির্মাণে সাহস দেখিয়েছেন, যা ভবিষ্যতে ঢালিউডকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
পরিশেষে, ‘প্রেশার কুকার’ কেবল একটি বিনোদনধর্মী সিনেমা নয়; বরং এটি আমাদের সমাজের অবদমিত নারীসত্তার এক নিঃশব্দ আর্তচিৎকার, যা দর্শকদের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে।



