গত এক শ বছরে বিজ্ঞানীরা অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ এলাকায় নানা ধরনের অদ্ভুত ও চমৎকার সব প্রাণী আবিষ্কার করেছেন। তাঁরা সেখানে এমন এক জাতের মাছ খুঁজে পেয়েছেন, যা মানুষের কল্পনার চেয়ে বেশি রং দেখতে পারে। এত সব আবিষ্কারের পরও একটি মাছ বিজ্ঞানীদের চোখের আড়ালেই রয়ে গিয়েছিল। অদ্ভুত এ মাছের চেহারার সঙ্গে ছোটদের জনপ্রিয় টিভি শো ‘সেসেমি স্ট্রিট’–এর একটি কার্টুন চরিত্রের দারুণ মিল রয়েছে।
চলতি মাসে ‘ফিশ বায়োলজি’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বিজ্ঞানীরা এ নতুন প্রজাতির মাছ আবিষ্কারের কথা জানান। এটি মূলত একধরনের ঘোস্ট পাইপফিশ (Ghost pipefish), যার বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয়েছে ‘সোলেনোস্টোমাস স্ন্যাফেলুপাগাস’। সেসেমি স্ট্রিটের ম্যামথ হাতির মতো দেখতে বিখ্যাত চরিত্র মিস্টার স্ন্যাফেলুপাগাসের সঙ্গে অদ্ভুত চেহারার মিল থাকার কারণেই মাছটির এমন নামকরণ করা হয়েছে। মাছটির এ নাম শুনতে যেমন মজার ও আকর্ষণীয়, তেমনি এ প্রজাতির আরও কিছু দারুণ ও অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা বিজ্ঞানীদের চমকে দিয়েছে।
বিশ বছরের বেশি সময় আগের কথা। অস্ট্রেলিয়ার পোর্ট স্টিফেনস ফিশারিজ ইনস্টিটিউটের সমুদ্রবিজ্ঞানী ডেভিড হারাস্টি পাপুয়া নিউগিনির সাগরে স্কুবা ডাইভিং করছিলেন। পানির নিচে হঠাৎ তিনি এমন এক অদ্ভুত মাছ দেখতে পান, যা আগে কখনোই কোনো বিজ্ঞানী দেখেননি। মাছটির মুখ ছিল তার পুরো শরীরের সমান লম্বা। শুধু তা–ই নয়, মাছটির শরীর ছিল লম্বা আর ঢেউখেলানো বাদামি কমলা রঙের লোমে ঢাকা। দেখতে এতটাই অদ্ভুত ছিল যে সমুদ্রতলের একগুচ্ছ শেওলার ভেতর একে আলাদা করে চেনাই যাচ্ছিল না।
সাগরের তলা থেকে ফিরে এলেও মাছটির কথা কিছুতেই ভুলতে পারছিলেন না হারাস্টি। এর কয়েক বছর পর তিনি তাঁর এক সহকর্মীকে মনের ইচ্ছার কথা জানান। তিনি বলেন, এ লোমশ মাছ যদি সত্যিই পৃথিবীর কোনো নতুন প্রজাতি হয়ে থাকে, তাহলে তিনি এর নাম কার্টুন চরিত্রের নামানুসারে ‘মিস্টার স্ন্যাফেলুপাগাস’ রাখতে চান।
তার কিছুদিন পরই শুরু হয় অভিযান। হারাস্টির সঙ্গে যোগ দেন তাঁর সেই সহকর্মী ও ক্যালিফোর্নিয়া একাডেমি অব সায়েন্সেসের মৎস্যবিজ্ঞানী গ্রাহাম শর্ট। দুই বিজ্ঞানী নেমে পড়েন সেই রহস্যময় মাছের খোঁজে। হারাস্টি মাছটির সন্ধানে একে একে পাঁচবার পাপুয়া নিউগিনিতে যান। আর শর্ট খুঁজে বেড়ান জাদুঘরের বিশাল সব নমুনা সংগ্রহশালায়। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেলেও ২০২১ সালের আগে তাঁরা এমন কোনো মাছের খোঁজ পাননি।
অবশেষে ২০২১ সালে আসে সেই সময়। অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের কয়েকজন স্কুবা ডাইভার দাবি করেন যে তাঁরা সাগরের তলদেশে কিছুটা খাটো ও লোমশ মাছকে সাঁতার কাটতে দেখেছেন। এ খবর পাওয়ামাত্রই দুই বিজ্ঞানী দ্রুত ছুটে যান সেই রিফে ও সাগরের নিচে অনুসন্ধানে। প্রথমবার ডাইভ করে তাঁরা কিছুই পাননি। কিন্তু দমে না গিয়ে দ্বিতীয়বার যখন তাঁরা সাগরের তলদেশে নামলেন, তখনই তাঁদের সামনে হাজির হলো এক জোড়া অদ্ভুত ঘোস্ট পাইপফিশ।
সেই আনন্দের মুহূর্ত মনে করে বিজ্ঞানী শর্ট বলেন, ‘মাছ দুটির দেখা পেয়ে পানির নিচেই আমরা খুশিতে একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছিলাম, হাত মেলাচ্ছিলাম। আনন্দের চোটে আমি পানির নিচেই চিৎকার করে উঠেছিলাম।’
নতুন প্রজাতির মাছটি খুঁজে পাওয়ার পর গবেষকেরা সেটিকে ল্যাবরেটরিতে নিয়ে আসেন। সেখানে ডিএনএ পরীক্ষা করে তারা শতভাগ নিশ্চিত হন যে এটি সত্যিই ‘ঘোস্ট পাইপফিশ’–এর সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রজাতি। মাছগুলো দেখতে হুবহু সামুদ্রিক প্রবাল বা শেওলার ডালপালার মতো। এরা সাগরের তলদেশে থাকা ছোট ছোট পোকামাকড় বা জলজ প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে। দেখতে অনেকটা সি–হর্স বা সমুদ্রঘোড়ার মতো হলেও এরা কিন্তু একদম আলাদা।
ঘোস্ট পাইপফিশের অন্যান্য প্রজাতির তুলনায় ‘সোলেনোস্টোমাস স্ন্যাফেলুপাগাস’ মাছটি বেশ অনন্য। আকারে এরা সাধারণ ঘোস্ট পাইপফিশের প্রায় অর্ধেক। দৈর্ঘ্যে মাত্র ৪ থেকে ৫ সেন্টিমিটার। আকারে এত ছোট হলেও এদের স্বভাব কিন্তু বেশ আক্রমণাত্মক। এরা অন্যান্য ছোট মাছও শিকার করে খেতে পারে। ল্যাবে মাছটির সিটি স্ক্যান করার সময় বিজ্ঞানীরা এর পেটের ভেতর আস্ত একটি ছোট মাছের কঙ্কাল খুঁজে পেয়ে অবাক হয়ে যান।
তবে মাছটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর পুরো শরীর চুলের মতো ছোট ছোট নরম তন্তুতে ঢাকা। ‘আইন্যাচারালিস্ট’ (iNaturalist) নামের একটি বিজ্ঞান প্ল্যাটফর্মের তথ্য ঘেঁটে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন যে সমুদ্রের এই স্নাফেলুপাগাস মাছটিকে গত কয়েক বছরে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের টোঙ্গা, পাপুয়া নিউগিনি ও নিউ ক্যালেডোনিয়ার সাগরেও দেখা গেছে। একেক এলাকার পরিবেশ অনুযায়ী মাছগুলোর রঙেও রয়েছে দারুণ বৈচিত্র্য। কোনোটি উজ্জ্বল লাল বা বেগুনি আবার কোনোটি মাটির মতো গাঢ় কমলা বা বাদামি রঙের হয়ে থাকে।



