‘রইদ’ সিনেমা: গ্রামবাংলার প্রেম ও শিকড়ের গল্প
‘রইদ’ সিনেমা: গ্রামবাংলার প্রেম ও শিকড়ের গল্প

মেজবাউর রহমান সুমন ‘হাওয়া’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি এমন ছবি বানাতে চান যা বাংলাদেশের ইতিহাস ও আর্থসামাজিক পটভূমির প্রতিফলন ঘটাবে। তার ছবির গল্প হবে আমাদের নিজেদের গল্প, ভাষা হবে আমাদের ভাষা, জীবনযাত্রা হবে আমাদের জীবনযাপন, আর দৃশ্যায়নে থাকবে দেশের পরিবেশ। ‘হাওয়া’ যেমন আমাদের প্রচলিত চাঁদ সওদাগরের গল্প বলেছিল, তেমনি ‘রইদ’ও কি আমাদের প্রচলিত আদম–হাওয়ার গল্প? সিনেমা বুদ্ধিজীবী না হওয়ায় আমার কাছে মনে হয়েছে, এটি আমাদের দেশের চিরায়ত প্রেমের গল্প। যে প্রেম কখনো মসৃণ নয়, বরং বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। মজার ব্যাপার হলো, প্রকাশ না থাকলেও দুই পক্ষই তা টের পায়।

‘রইদ’–এর সাধু ও তার বউয়ের রসায়ন আমাদের আটপৌরে প্রেমের কথা মনে করিয়ে দেয়। গ্রামীণ মা–বাবাকে কখনো একে অপরকে ভালোবাসার কথা বলতে দেখিনি; বরং তারা বিষয়টি গোপন রাখতেন। হুমায়ূন আহমেদ যেমন ‘বহুব্রীহি’তে কাদেরের মুখ দিয়ে বলিয়েছিলেন, ভালোবাসা একটা শরমের ব্যাপার, কিন্তু দরকার আছে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে সবকিছু প্রচারসর্বস্ব হয়ে গেছে; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কে কতটা প্রলেপ মাখিয়ে প্রকাশ করতে পারে, সেই প্রতিযোগিতা চলছে। আমি বাস্তবে দেখেছি, আগের দিন স্বামী–স্ত্রী গদগদ ভালোবাসার পোস্ট দিয়েছেন, পরদিনই একে অপরের বিষোদ্‌গার করছেন, তৃতীয় দিনেই ছাড়াছাড়ি। সুমন মনে হয় সজ্ঞানে এসবের বিরুদ্ধে বিপ্লব ঘোষণা করেছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চিত্রকল্প ও শিকড়ের সন্ধান

‘রইদ’–এর চিত্রকল্প বারবার আমাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। যার শিকড় যত মজবুত, তার বাড় ততই দৃঢ় ও স্থায়ী। মেঠোপথ, ছনের ঘর, মাটির মেঝে ও দেয়াল, গাছের ডালের জানালা, চৌকি, কাঁসার আসবাব, একই ঘরে মানুষ ও গবাদিপশুর সহাবস্থান—এসব দৃশ্য গ্রামবাংলার চিরায়ত চিত্র। ছোটবেলায় দেখেছি, চৌকির নিচে থাকত নতুন ছানা ফোটানো মুরগি, আর মায়ের সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমাত ছাগলের বাচ্চা। দিনের বেলা গরমের সময় চৌকির ওপরে আব্বার পিঠের সঙ্গে পিঠ লাগিয়ে ঘুমিয়ে থাকত ছাগলটি। সাধুর বউয়ের ছাগলের নাম কুলসুম, যা রূপকথার দৈত্যের আত্মার মতো। বাড়ির পাশের কাশবন বা তালের জঙ্গল আবহমান গ্রামবাংলার প্রতিচ্ছবি। বাড়ি থেকে দূরে কলাপাতায় ঘেরা টয়লেট, বদনা হাতে সেখানে যেতে হয়—এসব দৃশ্য আমাদের শৈশবের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গবাদিপশুর গা গরম হলে আমাদের এলাকায় বলা হতো ‘ডাক এসেছে’। ছাগলের ডাক এলে পাড়ায় যার বাড়িতে ভোগড়া (পাঁঠা) আছে, তার বাড়ি থেকে পাল খাইয়ে আনা হতো। গরুর ডাক এলে সেটাকে নিয়ে যাওয়া হতো যার বাড়িতে আঁড়ি (এঁড়ে) গরু আছে, তার বাড়িতে। সাঁতার না–জানা আমাদের জন্য গরুর লেজ ধরে নদী পাড়ি দেওয়া ছিল বিশাল অ্যাডভেঞ্চার। গবাদিপশুকে গোসল দেওয়া, শীতের সময় বাড়তি কাপড় পরানো—এখনো গ্রামবাংলায় প্রচলিত। গ্রামের হাটের মেলায় এখনো সার্কাস আসে, পালাগানের আসর বসে। বৃষ্টি হলে ঘরে কুনোব্যাঙের দল ভিড় করে। টিনের প্লেটে খাওয়াদাওয়া, খাবারে লবণ বেশি হলে পানি ঢেলে দেওয়া—এসব এখনো দেখা যায়। ঝড়ের রাতের পর সকালে শিশুরা তালগাছের তলায় পাকা তাল খুঁজতে যায় কি না, জানি না। আমাদের পাড়ায় অনেক তালগাছ ছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে মিষ্টি তাল ছিল মুনা পালের গাছের। সালামদের পুকুরপাড়ের বাঁশঝাড়ের ভেতরের তালগাছ থেকে কতজনকে ভূতে ধরত। আজ আর কোনো তালগাছ নেই। সুমনকে ধন্যবাদ আমাদের অকৃত্রিম শৈশব ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য।

ভাষা ও সংলাপের স্পর্শ

যারা এই সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছেন, তাদের কারও বাড়ি কুষ্টিয়ার গ্রামাঞ্চলে কি না, জানি না। বহুদিন বাদে শৈশবের ভাষার আন্তর্জাতিক প্রয়োগ দেখলাম। গ্রামের দাদারা নাতিদের কান ধরে বলতেন, ‘এই শালা দুলাভাই বল, নাহলে কান ছাড়ব না।’ কী মিষ্টি একটি সম্বোধন! শহরে এসে জানলাম, ‘শালা’ একটি গালি। ‘রইদ’–এ শুনলাম ‘শালা আঁড়িচুদা তুমি এটাই বুঝতি পারছ না’—গ্রামের চরম গালি। ‘ভোদাই’ও শুনলাম বহুদিন পর। আমাদের এলাকায় ‘কথা’ বলা হয় ‘কতা’, ‘কোথায় যাব’ বলা হয় ‘কঅনে যাবা’, ওষুধের বোতলের ছিপি বলা হয় ‘কাগ’, ‘মিঞেভাই’ ডাক শুনে কত দিন পর। কুকুরকে বলা হয় ‘কুত্তো’।

অভিনয় ও নির্মাণের নিখুঁততা

ছবির চরিত্রগুলো বাস্তবের মতো মনে হয়েছে; মনে হয়নি আমি অভিনয় দেখছি। বরং মনে হয়েছে, আমি একটি গ্রামের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি আর ঘটনাগুলো সত্যিকার অর্থেই ঘটছে। তুষি নিজেকে দিনে দিনে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। ‘হাওয়া’, ‘প্রেশার কুকার’, ‘রইদ’—সব চরিত্রেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। বিশেষ করে তার পোশাক–পরিচ্ছদ, সাজগোছ ও চলাফেরা এত নিখুঁত যে আগে কোনো ছবিতে দেখিনি। হুমায়ূন আহমেদের একটি লেখায় পড়েছিলাম, সুন্দরী প্রতিযোগিতা জিতে আসা এক মেয়েকে পুরস্কারস্বরূপ নায়িকা বানানো হয়েছিল; তিনি দৃশ্য বুঝিয়ে মেকআপ করিয়ে দিতেন, কিন্তু সেই নায়িকা বাড়তি মেকআপ নিয়ে নিজের সৌন্দর্য প্রমাণ করতে চাইতেন। ‘রইদ’–এ তুষির পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পুরোটাই চরিত্রের সঙ্গে মানানসই। কথা বলা, চলাফেরা, ওঠাবসা—সব নিখুঁত।

সাধু চরিত্রটি দেখে নিজের ছোটবেলার খেলার সাথির কথা মনে পড়ে গেল। আমাদের বাড়িতে বছর ঠিকা হিসেবে একজন রাখাল ছিল, আরও একজন ছিল যার জন্ম ব্রিটিশ আমলে, আমরা তাকে ‘ব্রিটিশ’ বলে ডাকতাম। তার শারীরিক গঠন, লুঙ্গি উঁচু করে বাঁধা, একটু কুঁজো হয়ে হাঁটা—সবই সাধু চরিত্রে ফুটে উঠেছে। সাধুর সহকর্মীও দুর্দান্ত অভিনয় করেছে; তার মুখের ভাষাও আমার খুব পরিচিত।

‘রইদ’–এর ঐতিহাসিক প্রভাব

সুমনের কথার প্রতিধ্বনি করেই শেষ করি: আমাদের ছবি হবে আমাদের মতো, হলিউড, বলিউড, টালিউড বা মলিউড কারও মতো নয়। আমরা তাদের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা নিতে পারি, কিন্তু গল্প, চিত্রকল্প, চরিত্র নির্মাণ—সব হবে আমাদের মতো করে। তাহলেই আমাদের ছবি বিশ্বদরবারে আলাদা আসন করে নেবে। ‘রইদ’–এর সবকিছু নিয়ে কথা হোক, ভালো হোক বা মন্দ। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের ছবি নিয়ে যত আলোচনা হবে, ততই চলচ্চিত্রশিল্প এগিয়ে যাবে। ‘রইদ’ দেখে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই ছবি একদিন ইতিহাস হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই ছবির রেফারেন্স দিয়ে কথা বলবে, প্রতিটি দৃশ্য নিয়ে আলাপ–আলোচনা করবে। জীবনানন্দ দাশের কবিতা যেমন সময়ের সঙ্গে বোধগম্য ও জনপ্রিয় হয়েছে, ‘রইদ’ নিয়েও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গবেষণা করবে।

পরিশেষে, এমন ছবি আরও তৈরি হোক। বাংলাদেশের শহুরে ও গ্রামীণ জনপদের অলীক কিন্তু দুর্ভেদ্য পর্দা উঠে যাক। বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থেই সবার বাংলাদেশ হয়ে উঠুক। স্ক্রিনস্কোপ ও দেশি ইভেন্টসকে ধন্যবাদ ছবিটি অস্ট্রেলিয়ার দর্শকদের দেখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। তবে ঠিক সময়ে ছবি শুরু করা ও বিজ্ঞাপন প্রচারের ব্যাপারে আরও সংযম প্রয়োজন।