বাংলা প্রবাদ 'গোবরে পদ্মফুল' ফোটার সার্থক একটি রূপায়ণ দেখা গেল শঙ্খ দাশগুপ্তের 'চা গরম' চলচ্চিত্রে। 'প্রিয় মালতী' চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশি এই তরুণ পরিচালক বিশ্বজনীন খ্যাতি কুড়িয়েছেন। শুধু দর্শকের মনোরঞ্জনের জন্য একটি বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ নয়, চলচ্চিত্রের অ-আ-ক-খ শৈল্পিক নৈপুণ্য অক্ষুণ্ন রেখে একটি সামাজিক আবেদন সৃষ্টি, মনের সংবেদনশীল অনুভূতিতে আঁচড় কেটে যাওয়াও তাঁর একটি লক্ষ্য।
প্রান্তিক মানুষের জীবনচিত্র
প্রান্তিক মানুষের জীবন-জীবিকা, কঠিন লড়াই–সংগ্রামে প্রাত্যহিক বেঁচে থাকা, রোগ প্রতিপালন, তিলে তিলে মরে যাওয়া, অশিক্ষা-কুশিক্ষা, মাদক সেবন, চিরাচরিত সংস্কার—নিবিড় গবেষণায় সবই উঠে এসেছে 'চা গরম' নামাঙ্কিত চলচ্চিত্রে। কাহিনি ও চিত্রনাট্য লিখেছেন সাইফুল্লাহ রিয়াদ।
ডা. আইরিন নামের সদ্য পাস করা তরুণী চিকিৎসক নির্জন নিবিড় প্রকৃতির সংস্পর্শে থেকে পরবর্তী পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেবেন বলে চা–বাগানে আসেন। এরপর জড়িয়ে পড়েন বাগানের প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে। এই চলচ্চিত্রের একটি অংশে এসে ২০০৩ সালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস এবং সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রের অনুপ্রেরণায় নির্মিত গৌতম ঘোষের 'আবার অরণ্যে' চলচ্চিত্রটির কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল, যেখানে পুলিশের হাতে বন্দী হওয়া গহিন অরণ্যের পরিচিত মাস্টারমশাই শহুরে লেখক, বুদ্ধিজীবীদের উদ্দেশে তীর্যক বাণে বলেছিলেন, 'অরণ্য ভ্রমণে এসেছেন! অরণ্য মানে শুধু মহুয়ার মদ আর মেয়েছেলে নয়...।'
শহুরে বনাম গ্রামীণ বাস্তবতা
এখানেও আমরা দেখছি, শহুরে তরুণী ডাক্তারের কাছে চা–বাগান সম্পর্কে ভাসা–ভাসা ধারণা ছিল; একটা প্রশান্ত নিবিড় শান্তির রোমান্টিক অনুভূতির জায়গা। প্রথমে সে ধাক্কা খেল, যখন দেখল এখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক কাজ করে না। মোবাইলে ইন্টারনেট সংযোগ পেতে হলে নির্দিষ্ট জায়গায় পাহাড়ের অনেক ওপরে যেতে হয়। এদিকে মোবাইল ইন্টারনেট ছাড়া আজকের জীবন অচল! পরিচালক এখানে মোবাইল সংস্থার নাম উল্লেখ করে একপ্রকার বিজ্ঞাপনও করে দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রেও তিন দশক আগে থেকে এ রকম কাহিনির গতির ভেতরে বিজ্ঞাপন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নৈপুণ্য আমরা পেয়েছি। প্রতিষ্ঠান বা বিজ্ঞাপন এগুলো তো আজকের জনজীবনেরই একটি অংশ। চরকির মতো প্রতিষ্ঠান যদি এই চলচ্চিত্র নির্মাণে পাশে এসে না দাঁড়াত, এত সুন্দর একটা অনুপ্রেরণার গল্প সামনে আসত না।
'আবার অরণ্যে'র মাস্টারমশাইয়ের মতো চা–বাগানের ম্যানেজার এখানে আইরিনের প্রথম ধারণা বদলাতে সাহায্য করল। যে চা আমরা প্রতিদিন স্বচ্ছন্দে একবার বা বহুবার পান করি, চা–বাগানের প্রথম সকালে আইরিনও গভীর আমেজে চুমুক দিতে যাবে, সেই চায়ের মধ্যে কত শ্রমিকের রক্ত, ঘাম লেগে আছে! ম্যানেজারের প্রতিটি কথায় কেমন রাগী, রাগী। কিন্তু এই একটি তীর্যক বাণে, শহুরে কন্যাকে সাহায্য করল রক্ত, ঘাম ফেলা শ্রমিকদের সংগ্রামের সঙ্গে মিশে যেতে। এখানেই সে গোবরের মধ্যে পদ্ম—চা–বাগানের মেধাবী উজ্জ্বল নন্দিনীকে আবিষ্কার করল। পট ও প্রেক্ষাপট যদিও সম্পূর্ণ ভিন্ন, নন্দিনী নামটিও প্রাণশক্তিতে ভরপুর রবীন্দ্রনাথের 'রক্তকরবী'র নন্দিনীকে মনে করিয়ে দেয়।
অভিনয় ও চরিত্রায়ন
ডা. আইরিন চরিত্রে সুন্দর উতরে গিয়েছেন সাফা কবির। তাঁর চাহনির মধ্যে নেপালি কন্যা বলিউডজয়ী মনীষা কৈরালার মুখ মনে পড়ে যায়। ঠিক যেভাবে আইরিনের বন্ধু মানে পরবর্তী সময়ে জীবনসঙ্গী হবে সেই মিঠু, পার্থ শেখের মধ্যে বিপ্লবী চে গুয়েভারার মতো আংশিক রূপ ধরা পড়ে। নন্দিনী চরিত্রে সারাহ জেবিন অদিতি 'কালো মেয়ের কালো হরিণ চোখ'–এর সার্থক রূপদান।
চা–বাগানের দরিদ্র প্রান্তিক পরিবারের কন্যা ঠিকমতো যাঁদের খাওয়া জোটে না, সঠিক চিকিৎসার অভাবে অসুখ চেপে রাখে, মেধাবী, ভালো রেজাল্ট সত্ত্বেও পড়াশোনা বন্ধ, মা নেই, মাতাল বাবা বাড়িতে অশান্তি করে—সে একজন উঠতি সমবয়সী তরুণীর মতো সাজগোজ করবে কী করে? তবু তার চুলের বিনুনি, ঝুঁটি বাঁধা ভালো লাগে। ওড়না জড়িয়ে রাখা ভালো লাগে। মায়ের শাড়ি পরে অসাধারণ দেখায়। আবার সাফা কবিরের রূপের মধ্যে শহুরে মধ্যবিত্ত তরুণীর সৌন্দর্য ধরা পড়ে, পাহাড়ি রোমান্টিক রূপে তিনি মিলেমিশে যান। চশমা পরা চোখ মুখের রশ্মি বাড়িয়ে তোলে—এই অন্ধকার মুখ এবং আলোর মুখের তফাত আনতে শিল্পীদের সঙ্গে চলচ্চিত্রের রূপসজ্জা শিল্পীর দক্ষতা ফুটে ওঠে। আর চরিত্রের সঙ্গে মিশে গিয়ে অভিনয়ে দুজনই জাজ্বল্যমান হয়ে ওঠেন। পার্থ শেখের সহজ–প্রাঞ্জল ভাব ভালো লাগে। বিশেষভাবে নজর কাড়েন রবিনদা চরিত্রে রেজওয়ান পারভেজ। তাঁর মুখের চা–বাগানের ভাষা এভাবে নির্ভেজাল টানে আয়ত্ত করা সহজ কাজ নয়।
গান ও বার্তা
নন্দিনীর জীবনের গল্প এই চলচ্চিত্রের মূল চাবিকাঠি। সমগ্র চা–বাগানের জীবনধারা মূল প্রেক্ষাপট। 'চা গরম' নামটিও সব দিক থেকে ব্যঞ্জনাবাহী। রাসেল মাহমুদের লেখা এবং সুর করা সুনিধী নায়েকের কণ্ঠে 'শোনো শোনো ওই কান পেতে/ শোনো শোনো হাঁক আসে/ মন থেকে ডাক আসে, জোরসে বাড়াও কদম...' গানটি অনবদ্য শুধু নয়, বিপুল অনুপ্রেরণার এবং সুন্দরভাবে চিত্রায়িত হয়েছে। শহুরে চায়ের টেবিলে গরম করা তর্কের চুমুকে, অথবা সাধারণ মানুষের চায়ের দোকানের আড্ডায় মূল প্রতিপাদ্য আলো এনে দিতে পারে এই চলচ্চিত্র। তবে সেই আলো যেন অন্ধকার জীবনে গিয়ে পৌঁছায়। চা–বাগানের ম্যানেজার যেভাবে শেষ হাসিটা হাসে, চা–বাগানের স্কুল মাস্টার স্বপ্ন বোনে, নন্দিনীর হাসির মধ্যেই সবার উত্তরণের গল্প লেখা হয়ে যায়।



