বনলতা এক্সপ্রেস: জীবন্ত দুঃখের এক বাহন, বললেন হাসনাত আবদুল্লাহ
বনলতা এক্সপ্রেস: জীবন্ত দুঃখের এক বাহন

‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমাটি দেখার পর তরুণ সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ লিখেছেন, এটি আর একটি সাধারণ ট্রেন নয়; বরং জীবন্ত দুঃখের এক বাহন, যার প্রতিটি বগি বিভিন্ন দুঃখে ভরপুর। গত ঈদে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমাটি দর্শকদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। হাসনাত আবদুল্লাহ তার লেখায় সিনেমাটির বিভিন্ন চরিত্র ও দৃশ্যের মাধ্যমে মানবজীবনের নানা আবেগ ও বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।

সিনেমার মূল বার্তা

সিনেমার একটি দৃশ্যে মন্ত্রী মহোদয় (চঞ্চল চৌধুরী) অসুস্থ মায়ের জন্য হেলিকপ্টারের আবদার শুনে অবাক হয়ে বলেন, ‘একটা মামুলি বিষয়কে আপনি এত বড় কেন করছেন?’ জবাবে গণিতের প্রফেসর রশিদ উদ্দিন (মোশাররফ করিম) বলেন, ‘মন্ত্রী সাহেব, মামুলি বিষয়কে বড় করে তোলাই তো মানুষের কাজ!’ এই সংলাপের মাধ্যমেই সিনেমার মূল বার্তা ফুটে উঠেছে—ছোট ছোট গল্পের মাধ্যমে মানুষের জীবন ও দুঃখকে তুলে ধরা হয়েছে।

চরিত্র বিশ্লেষণ

ডাক্তার আশাবের (শরীফুল রাজ) চরিত্রটি বিশেষভাবে আলোচিত। ম্যাজিক দেখানো ও মায়ের সঙ্গে মজা করা হাসিখুশি ছেলেটি এক পর্যায়ে হাঁটু গেড়ে বসে বলে, ‘না পারলাম ভালো মানুষ হইতে, না পারলাম ভালো ডাক্তার হইতে।’ এই সংলাপটি বাংলাদেশের অসংখ্য বড় ছেলের প্রতিনিধিত্ব করে, যারা শৈশবের ট্রমা, বর্তমানের আফসোস এবং হাতে কিছু অনর্থক ম্যাজিক কার্ড নিয়ে জীবন কাটায়। দর্শক নিজেও প্রশ্ন করে, আমরাও কি অনর্থক কিছু কার্ড ও ফেক হাসি নিয়ে ঘুরছি?

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নিঃসন্তান কিন্তু ক্ষমতাবান মন্ত্রী আবুল খায়ের আর মাত্র ২৪ বছর বয়সী একমাত্র ছেলের কফিন নিয়ে যাত্রা করা রশিদ উদ্দিন—কার দুঃখ বেশি? সিনেমা এই দ্বন্দ্বকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জীবনের শুরু ও শেষ

হাতে মাত্র এক বছরের জীবন নিয়ে আজিজ (শ্যামল মাওলা) যখন স্ত্রী-সন্তানের মায়া কাটাতে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময়ে নতুন জীবন শুরু করতে হাত বাড়িয়ে দেয় সদ্য অ্যাডমিশন ক্যান্ডিডেট রুবি। একই ট্রেনে একজন তরুণ কফিনে চড়ে যাচ্ছে, আরেকজন তরুণী জীবন নতুন করে শুরু করছে। একটি বিদায়ের দিকে, অন্যটি আগমনের দিকে। শেষ আর শুরুকে একই রেখায় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

গণিতের প্রফেসর রশিদ উদ্দিন কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘হোল ওয়ার্ল্ডে আমি ম্যাথে জায়ান্ট নম্বর এইট, কিন্তু ম্যাথ আমার হাতে নাই, ম্যাথ আমার হাতে নাই।’ এই সংলাপের মাধ্যমে প্রশ্ন তোলা হয়, ম্যাথ কি আসলে কারও হাতে থাকে? নাকি সব ম্যাথের সমাধান নিয়ে ওপরে একজন বসে থাকেন?

জীবনের ধর্ম

জানাজার নামাজের কোনো আজান হয় না, কারণ জন্মের সময়ই কানে আজান দেওয়া হয়। জন্মের সময় আজান আর মৃত্যুর সময় নামাজ—এর মাঝের সময়টুকুই জীবন। ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ একটি পৃথিবী, যেখানে এক পাশে সন্তানের কফিন, আরেক পাশে নতুন শিশুর জন্ম; এক পাশে ক্ষমতার দম্ভ, আরেক পাশে মানুষের প্রতি ভালোবাসা; এক পাশে নীলাকে হারানোর কষ্ট, আরেক পাশে চিত্রার (সাবিলা নূর) বাড়িয়ে দেওয়া হাত।

দিন শেষে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সবার গল্প। জন্মের আজান, মৃত্যুর জানাজা, হারানোর দুঃখ ও পাওয়ার আনন্দ—সব নিয়েই জীবন। বারবার হাঁটু গেড়ে পড়ে যাওয়ার পরও আবার উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে চলাই মানবজাতির নিয়তি। একটি থেঁতলে যাওয়া ব্যাঙ পর্যন্ত শেষনিশ্বাস পর্যন্ত লাফায়, চলে। এই চলতে থাকাই জীবনের ধর্ম। থেমে গেলেও, কষ্ট পেলেও জীবন সূর্যের মতো স্পষ্ট হয়ে সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে, ঠিক ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর মতো।

এই বনলতা এক্সপ্রেসকে কেউ থামাতে পারে না, কারণ এই ট্রেন মানবজীবনের মতো; যেখানে স্থবিরতা নয়, রূপান্তরই চূড়ান্ত সত্য। রূপান্তরের ভেতর দিয়েই মানুষ অশ্রুকে অভিজ্ঞতায়, সংগ্রামকে সাফল্যে, দুঃখকে মহাকাব্যে, সম্ভাবনাকে ইতিহাসে পরিণত করে। যে রূপান্তর শিশুকে প্রৌঢ়ে, বীজকে বৃক্ষে, স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে, সেই রূপান্তরকে বন্ধ করার সাধ্য কারও নেই।