জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের মধ্যে কারিনা কায়সারের ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছিল। দাদি খ্যাতনামা দাবাড়ু রানী হামিদ, বাবা জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক কায়সার হামিদ—এমন পরিবারে জন্ম নেওয়া কারিনা কায়সার কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে নিজের পরিচিতি গড়ে তোলেন। তবে অকালমৃত্যুর পর তিনি বেশি স্মরণীয় হয়ে উঠেছেন জুলাই অভ্যুত্থানের একজন সাহসী কর্মী হিসেবে। আন্দোলনকারীদের ফেসবুক ওয়াল এখন তাঁর স্মৃতিতে ভাস্বর।
শোক প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক নেতারা
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল ফেসবুকে লিখেছেন, 'কারিনা জুলাইয়ের নাম।' তিনি আরও বলেন, 'মানুষ তাঁকে মনে রাখবে স্নেহে, ভালোবাসায়, দোয়ায় ও প্রার্থনায়।' তাঁর সহকর্মী নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াসহ জুলাই অভ্যুত্থানের সক্রিয় অনেকেই শোকাতুর হয়েছেন কারিনা কায়সারকে হারিয়ে।
কারিনা কায়সার লিভারের জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে গত শুক্রবার ভারতের চেন্নাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিল ৩০ বছর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাণবন্ত উপস্থাপনা ও জীবনঘনিষ্ঠ কনটেন্ট তৈরি করে তরুণ দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় হয়েছিলেন তিনি। পরে ওটিটি ও নাটকের জগতেও নিজের জায়গা তৈরি করেন। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে তরুণদের নেতৃত্বে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
আসিফ নজরুলের আবেগঘন পোস্ট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল ফেসবুকে লিখেছেন, 'সকালবেলা আমার স্ত্রী বলল, কারিনা মারা গেছে। মনটা খারাপ লাগছে।' নিজের বাসার জানালা দিয়ে দেখা দেয়ালজুড়ে আঁকা জুলাইয়ের গ্রাফিতির দিকে তাকিয়ে তিনি লিখেছেন, 'ছবিতে অনেক রং, লাল রং। আজ লাল রংটা চোখে পড়ল বেশি। মনেও থাকল বেশি। একটু আগে কারিনার চলে যাওয়ার খবর শুনেছি। লাল জুলাইয়ের রং। কারিনা জুলাইয়ের নাম।'
জুলাইয়ে হারানো আবু সাঈদ, ইয়ামীন, আনাসকে স্মরণ করে আসিফ নজরুল আরও লিখেছেন, 'আমরা জুলাইয়ের পরিবার। দেখা হয়নি, পরিচয় নেই, রক্তের সম্পর্ক নেই, তবু আমরা একটা পরিবার। দূরে থাকি, ভুলে থাকি, নীরব থাকি, তবু আমরা একটা পরিবার। ভুল বুঝি, ঝগড়া করি, তবু আমরা একটা পরিবার। আমাদের পরিবারের একজন চলে গেছে অকালে! মানুষের জীবন আর সর্বস্ব লুটে খাওয়া পিশাচের বিরুদ্ধে জীবনপণ লড়াইয়ে সে ছিল আমাদের সঙ্গে। মানুষের মুক্তির জন্য। মানুষই তাই মনে রাখবে তাকে। স্নেহে, ভালোবাসায়; দোয়ায়, প্রার্থনায়।'
নাহিদ ইসলাম ও অন্যান্য নেতার প্রতিক্রিয়া
জুলাই আন্দোলনের নেতা ও বর্তমানে সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম ফেসবুকে লিখেছেন, 'জুলাই বিপ্লবের উত্তাল দিনগুলোতে ফ্যাসিস্ট হাসিনার নির্মম গণহত্যার বিরুদ্ধে কারিনা কায়সার ছিলেন এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর এই আপসহীন ও সাহসী অবস্থান আমাদের চিরকাল অনুপ্রাণিত করবে।'
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে কারিনা কায়সারের ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, 'কারিনা কায়সারের অকালমৃত্যু আমাদের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন, সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে তাঁর দৃঢ় অবস্থান আমাদের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি কেবল একজন সংস্কৃতিকর্মীই ছিলেন না, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান গ্রহণকারী এক সাহসী কণ্ঠস্বর ছিলেন। কঠিন ও দমনমূলক সময়েও তিনি গণমানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধকে আন্দোলনের শক্তিশালী অংশে পরিণত করতে অবদান রেখেছেন।'
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর পোস্ট শেয়ার করে জুলাই অভ্যুত্থানে কারিনা কায়সারের আন্দোলনের ছবি পোস্ট করেন। ক্যাপশনে লেখা ছিল, 'এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর—ছবিটি জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের। ৩ আগস্ট, ২০২৪। ভালো থেকো, জুলাইয়ের মানুষ, আমাদের মানুষ।'
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সারজিস আলম লিখেছেন, 'হে আল্লাহ, ইনসাফের পক্ষে দাঁড়ানো আমাদের বোনকে আপনি কবুল করে নিন।'
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা মিতু শোক জানিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন, 'কারিনা চলে গেছে। এটা অবিশ্বাস্য, কিন্তু বাস্তব। কিন্তু আমি ভাবছি ওর বন্ধুদের কথা, ডানা, কারিনা আরও কয়েকজন ওরা একই ভাইবের একই টোনের বন্ধু ছিলো। ওদের উপর দিয়ে একটা ঝড় যাবে। হাদি মারা যাওয়ার পর কেমন লেগেছিলো সেখান থেকে আন্দাজ করতে পারি ডানা কিংবা ওদের গ্রুপের বন্ধুদের উপর থেকে কতটা মানসিক যন্ত্রণা যাবে।' তিনি আরও লেখেন, 'আমার যখন কষ্ট লাগতো, আমি নিজেকে নানাভাবে বুঝ দিতাম। আমরা যাদের ভালোবাসি, আল্লাহ তাকে আমাদের থেকেও বেশি ভালোবাসে। এই মানুষগুলো কিংবা আমরা সবাই–ই তো আল্লাহর। তাঁর মনে হয়েছে তিনি নিয়ে গেছেন। কিন্তু এই বুঝ দিয়ে নিজেকে সামলাতে সামলাতে মানসিক ক্ষত হয়েছে অনেক। যে চলে গেছে আল্লাহ তাকে বেহেশত নসীব করুন, কিন্তু যারা আছে তাদের আল্লাহ ধৈর্য দিন।'



