কথাশিল্পী শওকত ওসমানের ২৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্য দেন লেখক হাসনাত আবদুল হাই। মঞ্চে (বাঁ থেকে) জাঁ-নেসার ওসমান, দিপু সিদ্দিকী ও সুকোমল বড়ুয়া। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তন, ঢাকা।
শওকত ওসমানের লেখায় সামাজিক দায়বদ্ধতা
কথাশিল্পী শওকত ওসমান লিখেছেন সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে। তিনি জনপ্রিয় হওয়ার জন্য বা নিছক বিনোদনের জন্য লেখালেখি করেননি। সমাজের শোষণ, অনাচার, নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনসংগ্রাম তাঁর রচনায় ফুটে উঠেছে। তাঁর লেখা ও তাঁর মতো মানুষ আমাদের জাতির সম্পদ।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে কথাশিল্পী শওকত ওসমানের ২৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে এ কথা বলেন বিশিষ্ট লেখক হাসনাত আবদুল হাই। কথাশিল্পী শওকত ওসমান স্মৃতি পরিষদ এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
শওকত ওসমানের জন্ম ১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারি। ১৯৯৮ সালের ১৪ মে তিনি চিরবিদায় নেন। উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, শিশুসাহিত্য, স্মৃতিচারণাসহ তাঁর রচনা সম্ভার বিপুল ও বৈচিত্র্যময়।
প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী ও আলোচনা
নির্ধারিত সময় ঠিক পাঁচটায় অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল ‘প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শওকত ওসমান’ শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী দিয়ে। এরপর ছিল আলোচনা।
কথাসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাই তাঁর বক্তব্যে অগ্রজ কথাশিল্পী শওকত ওসমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, শওকত ওসমানের লেখক জীবনের শুরু থেকেই সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা ছিল। তাঁর সারা জীবনের লেখায় সেই দায়বদ্ধতারই প্রকাশ ঘটেছে। লেখক হিসেবেও পরবর্তী প্রজন্মের ওপর তাঁর প্রভাব রয়েছে। হয়তো এই প্রভাব সরাসরি নয়। তবে সৃজনশীলতার প্রতিটি ক্ষেত্রেই পূর্ববর্তী প্রতিভাবানদের সৃজনকর্মের প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মের ওপরে থাকে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা চলমান থাকে। শওকত ওসমান আমাদের কথাসাহিত্যে তেমনি একজন অনন্য প্রতিভাবান ও প্রভাবশালী সৃজনশীল মানুষ।
প্রধান অতিথির বক্তব্য
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া বলেন, শওকত ওসমান তাঁর লেখায় মানুষের বিবেক, মানবিক বোধ ও আত্মশক্তিকে জাগানোর চেষ্টা করেছেন। প্রতিটি সমাজেই এমন কিছু কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা মানুষের ভেতরে প্রাণের বিপুল স্পন্দন জাগাতে পারেন। সাগরের মতো কল্লোল সৃষ্টি করতে পারেন। এই জাগরণের চেষ্টাকেই তাঁরা তাঁদের সারা জীবনের কাজ বলে গ্রহণ করেন। শওকত ওসমানের লেখালেখি ছিল ঠিক সেই ধরনের কাজ। লেখনীর মাধ্যমে তিনি মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে চেষ্টা করেছেন, মানুষের মানবিক মহিমার জয়গান গেয়েছেন। এ জন্যই তিনি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
পুত্রের স্মৃতিচারণ
বাবার স্মৃতিচারণা করে চলচ্চিত্র নির্মাতা জাঁ-নেসার ওসমান বলেন, মানুষ হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস যা–ই থাকুক, লেখক হিসেবে কোনো দলীয় রাজনীতির প্রতি পক্ষপাত ছিল না। এ ধরনের কোনো দলাদলি, ভেদাভেদে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের কথাও ভাবেনি। চাকরির বেতনের ওপর নির্ভর করে একটা বড় সংসার চালিয়েছেন। বাবার এই নির্লোভ মানসিকতার একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি বলেন, পঞ্চাশের দশকে সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে তাঁকে বনানীর চেয়ারম্যান বাড়িতে ১০ কাঠার প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। তিনি বলেছিলেন সরকারের কাছ থেকে কোনো সুবিধা গ্রহণ করলে সরকারের তোয়াজ তোষণ করতে হবে। এটা তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না। তিনি বাকশালেও যোগ দেননি। এ কারণে তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক করা হয়নি। এসব নিয়ে তাঁর মোটেই কোনো আক্ষেপ ছিল না। চিরকাল মাথা উঁচু করে বেঁচে থেকেছেন। মানুষের কথা বলেছেন।
স্বাগত বক্তব্য
স্বাগত বক্তব্যে কথাশিল্পী শওকত ওসমান স্মৃতি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক দিপু সিদ্দিকী বলেন, ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত সহজ–সরল মানুষ ছিলেন শওকত ওসমান। মানুষকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। ধর্ম, বর্ণ, পেশা এসব কোনো বাধা ছিল না। সবাইকে সমানভাবে নিতেন। বিশেষত, অনুজ শিল্পী–সাহিত্যিকদের প্রতি গভীর মমতা ছিল তাঁর। তরুণদের নানাভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রজন্মের পাঠকেরা শওকত ওসমানের লেখনী নিয়ে তাঁদের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বক্তব্য দেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ফজলে রাব্বি, সাদাত হাসিন প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন মেরিন নাজনীন।



