আমেরিকান বিজনেস এক্সপো অ্যাওয়ার্ডজয়ী, বাংলাদেশের অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও লেখক টি এম রকিব হাসান টেলিভিশন ও অনলাইন সাংবাদিকতা নিয়ে তত্ত্ব এবং প্র্যাকটিক্যাল অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে দুটি বই লিখেছেন। এই বইগুলো একাডেমিক তত্ত্বের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে একাডেমিক এবং প্র্যাকটিক্যাল সাংবাদিকতার দূরত্ব কমিয়েছে, অন্যদিকে একজন রিপোর্টারকে বাস্তব জগতের জন্য প্রস্তুত করার ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে।
টি এম রকিব হাসানের পরিচয়
বাংলাদেশের মিডিয়া জগতে টি এম রকিব হাসান, যিনি রাকিব হাসান নামেই বেশি পরিচিত, একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক, লেখক, মিডিয়া গবেষক এবং সাংবাদিকতার প্রশিক্ষক হিসেবে সুপরিচিত। তার যাত্রা শুরু হয় শৈশবে—কবিতা, বিজ্ঞান কল্পকাহিনি এবং গল্প লেখার মধ্য দিয়ে। সেই সৃজনশীলতার টানই পরবর্তীতে তাকে সাংবাদিকতার দিকে নিয়ে যায়।
তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স উভয় ডিগ্রি কৃতিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করেন। স্নাতকে ছিলেন প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় এবং স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম। এই একাডেমিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে প্রায় দেড় দশকের ক্যারিয়ারে তিনি বাংলাদেশের প্রায় সব প্রধান গণমাধ্যমে কাজ করেছেন।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও স্বীকৃতি
একুশে টেলিভিশনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘একুশের চোখ’-এর প্রধান অনুসন্ধানী প্রতিবেদক হিসেবে তিনি এমন সব অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করেছেন, যার ফলে মাদক চক্র ধরা পড়েছে, দূর্নীতিগ্রস্ত কথিত কর্পোরেট ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে এবং সরকারি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর স্বীকৃতি হিসেবে তিনি স্বাধীনতা সংসদ অ্যাওয়ার্ডও অর্জন করেন।
প্রথম বই: ‘টেলিভিশন সাংবাদিকতা: রিপোর্টিং পরিকল্পনা ও রিপোর্টার’
তার লেখা ‘টেলিভিশন সাংবাদিকতা: রিপোর্টিং পরিকল্পনা ও রিপোর্টার’ বইটি একাডেমিক পাঠের জন্য ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে। ব্রডকাস্ট জার্নালিজম কোর্সে সম্পূর্ণ ধারণা পেতে তার বইটি ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীরা রেফারেন্স বই হিসেবে পড়ছে।
মাঠে কাজ করতে গিয়ে বুঝেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যা শিখেছেন আর বাস্তবে যা দরকার—এই দুটির মধ্যে বড় ফাঁক আছে। ইতিহাস জানা জরুরি, কিন্তু কেউ শেখায়নি টিভি স্ক্রিপ্ট কীভাবে লিখতে হয়, উভ কী, প্যাকেজ কীভাবে বানাতে হয় বা অনুসন্ধানী রিপোর্টিং কীভাবে করতে হয়। এসব মাঠে নেমে কাজ করে করে শিখতে হয়েছে। তখন মনে হয়েছে, যদি এই অভিজ্ঞতাগুলো বই আকারে সাজিয়ে দিতে পারেন, তাহলে তত্ত্ব এবং প্র্যাকটিক্যাল সাংবাদিকতার মধ্যে মেলবন্ধন ঘটানো সম্ভব এবং নবীন সাংবাদিকরা এত কষ্ট পাবে না। সেই ভাবনা থেকেই ২০১৮ সালে বইটি প্রকাশিত হয়।
দ্বিতীয় বই: ‘অনলাইন সাংবাদিকতা’
তার দ্বিতীয় বই ‘অনলাইন সাংবাদিকতা’ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। অনলাইন সাংবাদিকতা এখন ভবিষ্যৎ নয়, বর্তমান। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে এই বিষয়ে পড়ানো হচ্ছে, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি মানসম্মত বাংলা রেফারেন্স বই নেই। তিনি সেই শূন্যতাটি পূরণ করতে চেয়েছেন। এই বইতে ফ্যাক্ট-চেকিং, ডাটা জার্নালিজম, এআই, মোবাইল জার্নালিজম, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব—সবকিছু একসাথে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
বইটি ৪৫টি অধ্যায়ে সাজানো, যা সম্পূর্ণ ডিজিটাল সাংবাদিকতা কেন্দ্রিক। ফ্যাক্ট-চেকিং, সাইবার সিকিউরিটি, ক্লিকবেইট, হেডলাইনের নৈতিকতা—সব বিষয় বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশের বাস্তবতা একসাথে তুলে ধরা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
২০২৩ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান, ট্রাইন ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন এবং বর্তমানে সেখানে বিজনেস অ্যানালিটিক্সে মাস্টার্স করছেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ফ্লোরিডায় অনুষ্ঠিত আমেরিকান বিজনেস এক্সপোতে তিনি ডিজিটাল মিডিয়ায় “ব্রেকথ্রো অব দ্য ইয়ার” পুরস্কার অর্জন করেন, যা তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিক্ষণ ডট কমের জন্য একটি বড় স্বীকৃতি। এই প্ল্যাটফর্মটি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সঙ্গে এআই-চালিত ও মোবাইলভিত্তিক প্রোডাকশন মডেল যুক্ত করে বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষাভাষী দর্শকদের জন্য কাজ করছে।
মিডিয়ার ভবিষ্যৎ শুধু কনটেন্টে সীমাবদ্ধ নয়, এটি ব্যবসা ও প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত। তিনি একটি বহুভাষিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম গড়তে চান, যার জন্য সাংবাদিকতার পাশাপাশি ব্যবসা ও ডাটা বিশ্লেষণ জানা জরুরি। তাই এমবিএ করেছেন, এখন বিজনেস অ্যানালিটিক্সে পড়ছেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বার্তা
প্রতিটি বই লেখার মাধ্যমে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেন। ভবিষ্যতে সাংবাদিকতা, ব্যবসা ও ডাটার সমন্বয়ে আরও কাজ করতে চান। হয়তো সেই অভিজ্ঞতা একদিন নতুন বই হয়ে আসবে।
নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য তার বার্তা: সাংবাদিকতা হলো মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সত্য বলার সাহস। বইয়ের জ্ঞান আর মাঠের অভিজ্ঞতা—একটি অন্যটি ছাড়া অসম্পূর্ণ। প্রযুক্তি বদলাবে, মিডিয়া বদলাবে, কিন্তু সাংবাদিকতার মূল আত্মা একই থাকবে। শুধু ডিগ্রি নয়, মাঠে নামতে হবে। যে সত্যের পক্ষে থাকবে, সৃজনশীলতা ধরে রাখবে—সে-ই টিকে থাকবে।



