বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি ও ইতিহাসের বয়ান নিয়ে গুরুতর কিছু প্রশ্ন তুলেছেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার এবং সাবেক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। দেশের ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ঘটনা কেন সিনেমা বা উপন্যাসে স্থান পায়নি, আজ বুধবার (১৩ মে) সন্ধ্যায় নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তার বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি।
‘কালচার নিয়া ছোট্ট আলাপ’ পোস্টে ফারুকীর বিশ্লেষণ
‘কালচার নিয়া ছোট্ট আলাপ’ শিরোনামের এই পোস্টে তিনি প্রচলিত ‘প্রগতিশীলতা’ ও ‘সাংস্কৃতিক কুলনেস’-এর রাজনীতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। ফারুকী তার পোস্টে প্রশ্ন তুলেছেন, ১৬ই ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে জেনারেল ওসমানীর অনুপস্থিতি, রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার কিংবা মেজর জলিলের মতো চরিত্ররা কেন আমাদের শিল্প-সাহিত্যে ব্রাত্য রয়ে গেল? তিনি আরও প্রশ্ন করেন, শেরে বাংলা এদেশের মানুষকে জমিদারি শোষণ থেকে বাঁচালেও কেন তিনি কালচারাল ন্যারেটিভের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারেননি? ইলিয়াস আলী, সুমন বা আরমানের মতো ব্যক্তিদের গুম হওয়া কিংবা অতি সম্প্রতি আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে কেন কোনো ফিকশন ফিল্ম বা সাহিত্য রচিত হচ্ছে না—সেই সত্যও তিনি তুলে ধরেছেন।
স্থবিরতার পেছনের কারণ
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এই স্থবিরতার পেছনে দুটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, আমাদের কালচারাল ন্যারেটিভের মধ্যে এমন একটি ধারণা গেঁথে দেওয়া হয়েছে যে, এই বিষয়গুলো ‘কুল’ বা ‘প্রগতিশীল’ নয়। দ্বিতীয়ত, কোনো শিল্পী যদি এই স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে চান, তবে তাকে সাথে সাথেই ‘রাজাকার’ তকমা দিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া প্রযোজনা সংস্থাগুলোর ‘গেটকিপিং’ বা অর্থায়নের অভাবকেও তিনি বড় বাধা হিসেবে দেখছেন।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, লাতিন আমেরিকার চলচ্চিত্রকাররা তাদের দেশের কালো অধ্যায়গুলো সিনেমায় তুলে আনলেও বাংলাদেশে সেই পরিবেশ তৈরি হয়নি। বাংলাদেশে ‘প্রগতিশীল’ ও ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ সংজ্ঞার রাজনীতি অত্যন্ত চতুর বলে মন্তব্য করেন ফারুকী। তিনি লিখেছেন, জিয়ার রহমানের আমলে ‘নতুন কুঁড়ি’র মতো বড় সাংস্কৃতিক ঘটনা ঘটলেও বিএনপি কালচারালি ‘কুল’ হতে পারেনি। অন্যদিকে, ৭২-৭৫ এর নৈরাজ্য কিংবা ২০০৮ পরবর্তী গুম-খুনের রাজনীতির পরেও আওয়ামী লীগকে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রোটেকশন দেওয়া হয়েছে।
হাই-কালচার বনাম লো-কালচার বিভাজন
ফারুকীর মতে, এই ‘হাই-কালচার’ (আওয়ামী লীগ) বনাম ‘লো-কালচার’ (বিএনপি-জামায়াত) বিভাজনের কারণেই ১৬ বছর ফ্যাসিবাদ টিকে ছিল। এই সাংস্কৃতিক কাঠামোর কারণেই সাধারণ মানুষের মন নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর ওপর অত্যাচারে কাঁদেনি। চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে ফারুকী কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং একটি বড় সাংস্কৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, চব্বিশের পর জাতি একবার বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেয়ে গেছে, তাই পুরনো সেই একপেশে বয়ানের ‘বোতলে’ আর তাদের ফেরত নেওয়া সম্ভব হবে না। যদিও অদূর ভবিষ্যতে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না, তবে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কালচারাল ইন্ডাস্ট্রির ইকোসিস্টেমে পরিবর্তন আনলে সত্যনিষ্ঠ শিল্পকর্ম নির্মাণের পথ প্রশস্ত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।



