বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বঙ্গোপসাগরের শেষ প্রান্তে উড়ে যাচ্ছিল আলাদিনের দৈত্যের ১৪তম বংশধর। দৈত্য হলেও সে অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিল, দেশে–বিদেশে তার অনেক নামডাক। গত রাত থেকে তার একটু পরপর টক ঢেকুর আসছে।
দৈত্য–সমাজে বদহজম বা টক ঢেকুর আসা ভালো কোনো লক্ষণ না। অত্যন্ত শরমিন্দা হওয়ার মতো একটি বিষয়। যা–ই হোক, সেদিন ভদ্রলোকের অবস্থা ছিল বেশ সঙিন। এক হাতে লুঙ্গি সামলাচ্ছে, অন্য হাতে পেট চেপে ধরে কোনোমতে উড়ে যাচ্ছে। মাথায় একটাই চিন্তা—যেভাবেই হোক বঙ্গোপসাগরের নির্জন কোনো জায়গায় পৌঁছাতে হবে।
ঠিক তখনই নিচে চোখে পড়ল বেশ কিছু মানুষের জটলা!
আন্দোলনের মাঝে দৈত্যের পতন
বাংলাদেশে তখন এমন এক সময় চলছিল, যখন সকালবেলা আন্দোলন শুরু হলে বিকেলে আন্দোলনের কারণ বদলে যেত। কেউ আন্দোলন করছে দাবিতে, কেউ পাল্টা আন্দোলন করছে সেই দাবির বিরোধিতায়, আর কেউ আন্দোলন করছে কেন আন্দোলন হচ্ছে, সেটা জানতে!
কৌতূহলী হয়ে দৈত্য একটু নিচে নামল। ভুলটা সেখানেই। আচমকা কোথা থেকে যেন একটা জাল ছুটে এল! মাছ ধরার জালের মতো...জালে আটকে মুহূর্তেই দৈত্য ধপাস করে মাটিতে পড়ল। তারপর যা হওয়ার তা–ই হলো। সবাই মিলে তাকে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে ফেলল।
দৈত্যের অবস্থা তখন করুণ। চারদিকে এত মানুষ আর স্লোগান শুনে সে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “ভাইয়ারা, আমি আবার কী করলাম?”
জনতা গর্জে উঠল।
- “তুমি নিচু হয়ে আমাদের আন্দোলন দেখছিলে কেন?”
- “আমি তো শুধু...”
- “চুপ!”
- “তুমি কি সরকারের লোক?”
- “না।”
- “তাহলে বিরোধী দলের?”
- “না।”
- “তাহলে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা?”
- “সেটাও না।”
- “তাহলে নিশ্চয়ই ইউটিউবার!”
দৈত্য হতভম্ব। “ভাই, আমি তো দৈত্য!”
জনতার একজন বলল, “এসব পুরোনো গল্প আমাদের শুনাইও না। এখন সবাই কনটেন্ট ক্রিয়েটর না হলে পাবলিক ফিগার।”
দৈত্য হাতজোড় করে বলল, “আমার দূরসম্পর্কের নানা ছিলেন আলাদিনের দৈত্য। অনেক নামডাক ছিল, আপনাদের চেনার কথা।”
একজন বলল, “চিনি তো তা তোমার প্রদীপ কোথায়?”
“হারিয়ে গেছে।”
“তাহলে তো তুমি ফেক দৈত্য!”
“কী বলেন? আমি ফেক না! আমি এখনো আপনাদের অনেক ইচ্ছে পূরণ করতে পারি...”
অসংখ্য দাবির জটিলতা
এ পর্যায়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে গেল। কারণ, প্রত্যেকে নিজ নিজ দাবি পেশ করা শুরু করল। অসংখ্য দাবি, অসংখ্য চাওয়া—
- ১ম জন—আমাকে একটা ছয়তলা বাড়ি দাও।
- আরেকজন—বাড়ি লাগবে না, আগে গাড়ি দাও।
- ৩য় জন—গাড়ি চালাব কোথায়? আগে রাস্তার সকল জ্যাম শেষ করো।
- চতুর্থজন—আমি কিঞ্চিৎ বোকা স্বভাবের। আমার বউ আমাকে ভীষণ সন্দেহ করে! দিনে ১৪ দুগুণে ২৮ বার ভিডিও কল দেয়, বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে দেয় না—এই সমস্যা দূর করে দাও!
- এক টাকমাথা লোক এগিয়ে এসে বলল, আমার মাথায় এমন চুল গজিয়ে দাও, যাতে বাতাসে উড়লে আমি নিজেই ভয় পাই।
- আরেকজন বলল, দেশটাকে সিঙ্গাপুর বানাও।
- পাশ থেকে একজন প্রতিবাদ করল, না, থাইল্যান্ড বা দুবাই বানাও।
- একজন বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, বাবা, আগে দ্রব্যমূল্য ও বিদ্যুতের বিলটা কমাও।
- এদিকে এক ভুঁড়িওয়ালা ভদ্রলোক বললেন, এই ভুঁড়ি বাদ দিয়ে এখানে সিক্স প্যাক লাগাও।
দৈত্য তাকিয়ে বলল, “কত দিনের মধ্যে?”
“পাঁচ মিনিটে।”
“আর কিছু?”
“দুইটা ব্যাংকের মালিকানা, গুলশানে তিনটা ফ্ল্যাট, আর একটা রিসোর্ট।”
দৈত্য বলল, “ভাই, আপনি মানুষ, না প্যাকেজ অফার?”
এদিকে দাবির লাইন ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে... কেউ বলছে চাকরি দাও, নতুন পে-স্কেল দাও। অমুককে OSD করে দাও। তমুককে ইনক্রিমেন্ট দাও।
দৈত্য অবাক হয়ে বলল, “আমি কি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়?”
উদ্ধারকারীরাও দাবিদার
আচমকা দৈত্যের মনে পড়ল, ৯৯৯–এর কথা! নিশ্চয়ই সাহায্য করার মতো কেউ আছে! কাঁপা হাতে মোবাইল বের করে চুপে চুপে ৯৯৯-এ ফোন দিল।
ওপাশ থেকে এক ভদ্রলোক বললেন, “বলুন, কী সমস্যা?”
দৈত্য কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, “আমি আলাদিনের দৈত্যের বংশধর। আমাকে বিক্ষুব্ধ জনতা তিন রাস্তার মোড়ে বেঁধে রেখেছে। উদ্ধারকারী জাহাজ হামজাকে দিয়ে আমাকে উদ্ধার করুন প্লিজ!”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর প্রশ্ন এল, “আপনি কি সত্যিকারের দৈত্য?”
“জি”
“ইচ্ছাপূরণ করতে পারেন?”
“অল্পস্বল্প...”
“তাহলে একটা অনুরোধ ছিল...”
দৈত্যের বুক ধক করে উঠল। “কী অনুরোধ?”
“আমার ছেলের চাকরিটা...”
আরেকজন ফোন কেড়ে নিয়ে বললেন, “আমার জন্য পূর্বাঞ্চলে একটা প্লট।”
আরেকজন বললেন, “আমার জন্য বিদেশভ্রমণের ব্যবস্থা।”
দৈত্য ফোন কেটে দিল। তার মনে হলো, জনতার চেয়ে উদ্ধারকারী দল আরও বেশি বিপজ্জনক!
কৌশলী পালানো
ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দৈত্য বুঝল, এখানে কূটনৈতিক সমাধান ছাড়া উপায় নেই। তাই সে জনতার উদ্দেশে বলল, “ভাইয়েরা আমার, আমি আপনাদের সব দাবি শুনেছি। আগে আমার বান্ধন খোলেন। বান্ধা অবস্থায় কোনো দাবি পূরণ করা সম্ভব কি?”
জনতা উল্লসিত হয়ে সব বান্ধন খুলে দিল। দৈত্য আবার বলা শুরু করল, “আপনাদের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যতের সব দাবি...” জনতা উল্লসিত! “এমনকি আপনারা মনে মনে যেসব দাবি ভাবছেন, সেগুলোও...” এবার জনতা আনন্দে আত্মহারা। কেউ নাচছে। কেউ সেলফি তুলছে। কেউ ফেসবুকে লিখছে: ‘ঐতিহাসিক বিজয়! দাবির পূর্ণ স্বীকৃতি আদায়!’
দৈত্য হাত তুলে সবাইকে শান্ত করল। “তবে...” সবাই চুপ! বাংলাদেশে ‘তবে’ শব্দটার গুরুত্ব অনেক।
দৈত্য মিষ্টি হেসে বলল, “আপনাদের সব দাবি আমি শতভাগ মেনে নিলাম। কিন্তু এই সব দাবি বাস্তবায়ন করবে...” জনতা নিশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে। “আপনাদের ভোটে নির্বাচিত পরবর্তী ‘রাজনৈতিক সরকার’কে আমি ভালোমতো নোট অব ডিসেন্টসহকারে বলে দিয়ে যাব, প্রয়োজনে বিশাল আয়োজন করে শপথ পড়িয়ে যাব।” বলেই দৈত্য একলাফে ৩ হাজার ফুট ওপরে উঠে গেল।
জনতা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল! শুধু দূর থেকে দৈত্যের জলদগম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসছিল—সে বলছিল, “ভাইয়েরা, মন খারাপ করবেন না! আপনাদের কিছু কথা বলি। আপনারা মানুষ হিসেবে মোটেও সুবিধার না, স্বার্থপর টাইপের। শক্তের ভক্ত নরমের যম। সুযোগ পেলে মাথায় কাঁঠালগাছ ফার্নিচারসহ ভেঙে খান। এসব ভণ্ডামি ছাড়েন, নিজের দেশ নিজেই গড়ে তোলেন। আপনারা ঠিক না হলে কোহেকাফ নগরীর সব জিন, ভূত, দৈত্য এসেও লাভ নাই!”
এই কথা বলে দৈত্য এমন জোরে উড়াল দিল যে আকাশে শুধু একটা টক ঢেকুরের শব্দ শোনা গেল—‘ঢ্যাঁআআক!’
অহেতুক দাবিদাওয়া দেওয়া লোকজন কপাল চাপড়াতে লাগল। আর একজন উঠতি বুদ্ধিজীবী বলে উঠল, “বুঝলাম না দৈত্যটা আসলে কোন দলের ছিল?”



