মো. মাহবুবুজ্জামানের স্মৃতিচারণ: কৃষিবিদ সত্তা ও মানুষের হৃদয়ে স্থান
অনলংকৃত কক্ষের কাচের দেয়ালের ওপাশে ব্যস্ত ঢাকার রাজপথের দৃশ্য। গাড়ির হর্ন ও মানুষের ছোটাছুটির মাঝে হঠাৎই মন চলে যায় এক ধূসর সকালের দিকে। আজ কত বছর কেটে গেল আব্বা নেই, অথচ তাঁর স্মৃতিগুলো আজও অদ্ভুতভাবে সজীব। চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাসপাতালের সেই বিষণ্ন ঘর, যেখানে আব্বা শয্যাশায়ী ছিলেন। ২০০৮ সালের ১১ জানুয়ারি ধানমন্ডি লেকে হাঁটার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। প্রথমে গুরুত্ব না দিলেও পরে এনসেফালাইটিস ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালেই কাটে তাঁর শেষ দিনগুলো।
শরীর ভীষণ দুর্বল থাকলেও চেতনার গভীরে দেশ ও মাটির টান অটুট ছিল। আবছা মনে পড়ে, হাসপাতালের বাগানে বসে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আব্বা, তোমার সবচেয়ে প্রিয় গান কোনটি?’ আব্বা তখন খুব ক্লান্ত, কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু প্রশ্নটা শুনেই চোখের কোণে এক অদ্ভুত দ্যুতি খেলে গেল। শিশুর মতো সহজ কণ্ঠে গেয়ে উঠলেন, ‘ধনধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা...।’ জীবনের শেষ প্রান্তেও সেই সুর ছিল অটুট, যা তিনি আমৃত্যু বয়ে বেড়িয়েছেন। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বুঝি, ওই গানই ছিল তাঁর জীবনের ধ্রুবতারা।
কৃষিবিদ সত্তা ও প্রশাসনিক শিখর
আমলাতন্ত্রের কঠিন খোলস কখনোই তাঁর ভেতরের ‘কৃষিবিদ’ সত্তাকে আড়াল করতে পারেনি। তাই ২০০৯ সালে মরণোত্তর ‘জাতীয় কৃষিবিদ পুরস্কার’ দিয়ে রাষ্ট্র যেন তাঁর সেই আজন্ম পরিচয়কেই সম্মান জানায়। আমার বাবা মো. মাহবুবুজ্জামান। দেশের মানুষ তাঁকে চেনে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব কিংবা দাপুটে সিএসপি কর্মকর্তা হিসেবে। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে শুরু হয় তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন।
- নীলফামারীর এসডিও থেকে রংপুরের ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন।
- বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে তাঁর অবদান।
- প্রশাসনের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেও ‘কৃষিবিদ’ পরিচয়টি ছিল সবচেয়ে প্রিয়।
বাবার শুরু তেজগাঁও কৃষি কলেজ থেকে, কৃষিবিজ্ঞানে ডিগ্রি নিয়ে। একসময় তিনি ‘ঢাকা ফার্মস’-এর সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে যেখানে কাজ করতেন, আজ সেখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে জাতীয় সংসদ ভবন। আমলাতন্ত্রের কঠিন খোলস কখনোই তাঁর ভেতরের ‘কৃষিবিদ’ সত্তাকে আড়াল করতে পারেনি। তাই ২০০৯ সালে মরণোত্তর ‘জাতীয় কৃষিবিদ পুরস্কার’ দিয়ে রাষ্ট্র যেন তাঁর সেই আজন্ম পরিচয়কেই সম্মান জানায়।
মানুষের হৃদয়ে স্থান ও উন্নয়ন কর্ম
তাঁর তৈরি করা সেই রাস্তা স্থানীয় লোকজনের কাছে আজও পরিচিত ‘জামাইবাবু রোড’ নামে। কারণ, বাবা ছিলেন সেখানকার জামাই। মানুষের এই ভালোবাসা কি আর ফাইলবন্দী কোনো পদমর্যাদায় পাওয়া যায়? সচিবালয়ের ফাইলের চেয়েও বাবার কাছে প্রিয় ছিল বরেন্দ্র অঞ্চলের ধূসর মাটি। সেখানকার মানুষ ছিলেন তিনি। ১৯৮৬ সালে অবসরের পর পূর্ণমন্ত্রীর পদমর্যাদায় রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা হন।
- রাষ্ট্রপতির অনুরোধে নওগাঁর একটি আসনে উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
- কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান, যেখানে তাঁর আজন্মলালিত স্বপ্ন বাস্তব রূপ পায়।
- বিএডিসির মাধ্যমে বরেন্দ্র অঞ্চলে বিশাল সেচ প্রকল্প শুরু করেন।
একসময়ের অনাবাদি জমিতে বছরে তিনবার সোনার ফসল ফলতে শুরু করে। নওগাঁর সাপাহারের মানুষ আজও কৃতজ্ঞচিত্তে বাবাকে স্মরণ করে। তিনি স্বরাষ্ট্রসচিব থাকাকালে সাপাহার থানায় রূপান্তরিত হয় এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব থাকাকালে তা উপজেলায় উন্নীত হয়। তাঁরই হাত ধরে স্থাপিত হয়েছিল উপজেলা প্রশাসনিক ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর। সেখানে একটি এলাকার নামই হয়ে গেছে ‘জামান নগর’, গড়ে উঠেছে বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও পাঠাগার।
ব্যক্তিগত জীবন ও উত্তরাধিকার
কাজ করতে করতে যখন নিজেকে খুব যান্ত্রিক মনে হয়, তখন বাবার কথাগুলো কানে বাজে। বাবা সব সময় আমাদের নিয়ে ভাবতেন—তিনি না থাকলে আমাদের কী হবে? আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বুঝি, সেই উদ্বেগ ছিল তাঁর নিঃসীম ভালোবাসারই প্রকাশ। তিনি শিখিয়ে গেছেন—বড় হওয়া মানে শুধু পদমর্যাদা নয়; বড় হওয়া মানে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া।
দাপ্তরিক কাজের বাইরেও বাবা ছিলেন এক প্রাণোচ্ছল সংগঠক। টানা ১৬ বছর তিনি বাংলাদেশ স্কাউটসের সভাপতি হিসেবে দেশের প্রতিটি উপজেলায় স্কাউট আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে কাজ করেছেন। সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানির প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন থেকে শুরু করে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জন্য ‘অবসর ভবন’, বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ ও উত্তরা আধুনিক হাসপাতাল—সবখানেই তাঁর দূরদর্শী ছাপ রয়ে গেছে।
আমার বড় ভাই ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানা ট্র্যাজেডিতে তিনি শাহাদাতবরণ করেন। এর ঠিক এক বছর আগে, ২০০৮ সালের ৩ মার্চ বাবা আমাদের ছেড়ে চলে যান। বড় ভাইয়ের কুলখানি আর বাবার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়েছিল একই দিনে। বনানী সামরিক কবরস্থানে বড় ভাইয়ের কবরের এক সারি দূরেই শান্তিতে ঘুমিয়ে আছেন বাবা। ২০২১ সালে মা-ও তাঁদের কাছে চলে যান।
বাবার গুনগুন করে গাওয়া সেই গান আজও আমার কানে বাজে। মনে হয়, তিনি এখনো আমাদের বলে যাচ্ছেন, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।’ সত্যিই আব্বা, তোমার মতো এমন মানুষও বোধ হয় আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। শান্তিতে ঘুমাও আব্বা। বাবা আজ নেই, কিন্তু নওগাঁর সবুজ বরেন্দ্রভূমি থেকে দেশের প্রশাসনিক কাঠামো—সবখানেই তাঁর ছাপ মিশে আছে।



