নীরব-নিস্তব্ধ হোমস্টে; নিঃশ্বাসের শব্দও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সুনসান নীরবতার মাঝেও তাশি থাকলি স্থির হয়ে বসে আছেন। তার চোখ বন্ধ, মুখে বারবার একই কথা উচ্চারণ করছেন, ‘একজনকে উৎসর্গ করতেই হবে; নইলে পাঁচজন একসাথে ধ্বংস হয়ে যাবে।’
তাশি থাকালির কথা শুনে সবাই আতঙ্কিত হয়ে তাকিয়ে রইল তাঁর দিকে। কারো মুখে কোনো কথা নেই, ভয়ে কাঁপছে সবাই। অবশেষে নীরবতা ভেঙে মাহির বললেন, ‘যদি আমার রক্তে দলের সবাই মুক্তি পায়, তবে আমি নিজেকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত আছি।’
কথা শুনে তার চার সঙ্গী হতবাক হয়ে গেল। কেউ বিশ্বাসই করতে পারছিল না, মাহির নিজের জীবন উৎসর্গ করার কথা বলতে পারেন। মাহিরের কথা শেষ হতেই তাশি থাকালি কাঁপা গলায় বললেন, ‘ভয়ংকর একটা শক্তি আমাদের ঘিরে ফেলেছে। একজনকে এখুনি উৎসর্গ না করলে মারাত্মক কিছু ঘটবে।’
মাহির মাথা উঁচু করে বললেন, ‘আমি প্রস্তুত।’ মাহিরের মুখ থেকে কথা বের হতেই ঘরের মেঝে জুড়ে এক ধরনের কম্পন ছড়িয়ে পড়ল। মনে হলো, কেউ যেন তার কথার প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে।
নিলেশ রাওয়াত ভারী গলায় বললেন, ‘মাহির, পাগলামো করো না। আমরা সবাই মিলে অন্য কোনো পথ খুঁজব। দেবতা যদি রক্ত ছাড়া অন্য কিছু দাবি করে, তা আমরা পরিশোধ করব। আর যদি দেবতা রক্তই চায়, তবে তাকে রক্তই দেওয়া হবে। সেই রক্ত আমাদের কারো নয়, সেটি হবে এই বৃদ্ধের। কারণ এ লোকটা জেনেশুনে আমাদেরকে ফাঁদে ফেলেছে; তাকে শাস্তি পেতেই হবে। অন্তত আমি তাকে ছাড়ব না, গলা টিপে মারব।’
নিলেশের কথার শক্তি সবার মাঝে টনিকের মতো কাজ করল। মুহূর্তেই আতঙ্কে জমে থাকা বুক খুলে গেল, সঙ্গে সঙ্গেই সবাই একমতও হলো। ভয় তাদের গ্রাস করলেও, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এসে তারা প্রতিবাদী হয়ে উঠল। মুহূর্তেই ভুলে গেল অভিশপ্ত দেবতার ভয়, তান্ত্রিকের কথা কিংবা বৃদ্ধ তাশি থাকালির হিংস্রতা। তারা সাহসী হয়ে উঠল। কেউ আর ভয়ে কাঁপছে না, বরং শক্ত হয়ে দাঁড়াল। চোখে চোখ রেখে তারা একে অপরকে দৃঢ় সংকেত দিলো—আজ তারা লড়বে, পালাবে না।
তাশি থাকালি তখনো স্থির হয়ে বসে ছিলেন। তার মুখে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল, কারণ তিনি আগেই জানতেন এমন একটা মুহূর্ত আসবে। তার চোখে ভয় নেই, বরং এক রহস্যময় চেহারা ফুটে উঠছে। তিনি বললেন, ‘তোমরা ভাবছ আমাকে উৎসর্গ করলে মুক্তি পাবে? ভুল করছ। দেবতা তোমাদের রক্তই চায়, আমার না। আমি শুধু পথ দেখিয়েছি।’
তার কথায় দলের সদস্যরা থমকে গেলেও নিলেশ রাওয়াত দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, ‘তুমি আমাদের ধোঁকা দিয়েছ। এবার তোমাকেই দেবতার সামনে দাঁড়াতে হবে, পার পাবে না বলে রাখলাম।’ সবাই হাতে হাত ধরে শক্ত হয়ে তাশি থাকালির দিকে এগিয়ে গেল। তাশি থাকালি ঘরের এক কোণে বসে রইলেন, তার চোখে-মুখে আতঙ্ক। তিনি বুঝতে পারছেন, যে নিজের শক্তি আস্তে আস্তে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। হঠাৎ তিনি গর্জে উঠলেন, ‘দেবতার আদেশ অমান্য করলে পর্বত ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না; তোমাদের গিলে ফেলবে। এই ঘর থেকে বেরোনোর শক্তি কারো নেই; এটা মন্ত্রপড়া ঘর। এখনো সময় আছে একজন এগিয়ে এসো।’
তাশি থাকালির গর্জনে মাহিরের দলের সবাই প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। বিষয়টা টের পেয়ে মাহির বুঝতে পারলেন, যদি তিনি সবাইকে শান্ত না করেন তবে এই মুহূর্তেই ভয়ংকর কিছু ঘটে যেতে পারে। সবাইকে শান্ত রাখতে মাহির তাশি থাকালির উদ্দেশে বললেন, ‘আমরা মানুষ, দেবতার হাতের পুতুল নই। রক্ষা করার মালিক সৃষ্টিকর্তা। তোমার দেবতাকে বলো সরে যেতে, না হলে তোমাকেই করুণ পরিণতি ভোগ করতে হবে। মনে রেখো, আমরা পাঁচজন। সবাই একসাথে দাঁড়ালে তুমি আর তোমার দেবতা পালানোর পথ খুঁজে পাবে না।’
তার কথা শেষ হতেই ঘরের বাইরে থেকে মৃদু গর্জন ভেসে এলো। মনে হলো অদৃশ্য কোনো শক্তি তাদের পাশে দাঁড়িয়ে সমর্থন দিচ্ছে। সেই অচেনা গর্জন মুহূর্তেই পরিবেশকে আরও রহস্যময় করে তুলল। তাশি থাকালি বুঝতে পারলেন, মানুষের একতাই তার জন্য সবচেয়ে বড় শত্রু। এতদিন তিনি বিশ্বাস করে এসেছিলেন, দলের মধ্যে বিভেদ তৈরি করতে পারলেই একজনকে আলাদা করে ছিনিয়ে নেওয়া সম্ভব, আর তাতেই তার মনোবাসনা পূর্ণ হবে। আজ ঘটল সম্পূর্ণ বিপরীতটা। দলের সবাই ভয়ে ভেঙে পড়ার বদলে আরও দৃঢ়ভাবে একত্রিত হয়েছে।
তাশি থাকালি এবার চোখ বন্ধ করলেন। ঠোঁট নড়তে শুরু করল, একের পর এক মন্ত্রপাঠ করতে লাগলেন। মন্ত্রোচ্চারণের সাথে সাথে ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। সবার বুকের ভেতরেও কেমন জানি ভার ভার লাগতে শুরু করল। কারো নিশ্বাস আটকে আসছে, কারো মাথা ঘুরছে। নিলেশ বললেন, ‘মন্ত্র পড়ে আমাদের ঐক্য ভাঙতে চাইছো? আমরা এক সঙ্গেই থাকব। তোমার অভিশাপ আমাদের ক্ষতি করতে পারবে না।’
তাশি থাকালির কণ্ঠস্বর আরও জোরালো হয়ে উঠল। মন্ত্রের প্রতিধ্বনি ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল, আর বাতাসে কাঁচা রক্তের গন্ধ ভেসে আসতে লাগল। তেমনি সময় সন্দীপ থাপা শেরপাদের দিকে আঙুল তুলে কিছু ইঙ্গিত করলেন। মাহির বুঝতে পারলেন তারা মারাত্মক কোনো পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। অমনি মাহির দ্রুত হাত তুলে সন্দীপকে থামিয়ে দিলেন। বুঝিয়ে দিলেন এখুনি কিছু করলে আমরা সবাই ধ্বংস হয়ে যাব।’ সবাই চুপ হয়ে গেল। শুধু তাশি থাকালির মন্ত্রের গুঞ্জন ভেসে আসছে, সেই মৃদু গঞ্জনেই কাঠের দেওয়াল কাঁপতে লাগল। তাতে মন্ত্রের শক্তি অনুভব করল সবাই। বুঝতে পারল, কিছু একটা ঘটতে চলেছে মন্ত্রের জোরে।
কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে তাশি থাকালি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। তিনি চোখ বন্ধ করে আরও জোরে জোরে মন্ত্রপাঠ করতে লাগলেন। তাঁর মন্ত্রের প্রতিটি শব্দ অদৃশ্য শিকলের মতো হয়ে দলের সবার শরীরকে প্যাঁচাতে লাগল। সবাই হাঁসফাঁস করতে লাগল, দমও বন্ধ হয়ে এলো। চেষ্টা করেও কেউ নড়াচড়া করতে পারলে না। মুহূর্তেই কাঠের দেওয়ালটা ফেটে গেল। ফাটল থেকে বেরোলো আরও দুইজোড়া চোখ। চোখ থেকে লাল আভা বেরোচ্ছে সিগন্যাল বাতির মতো। সেই আলো একবার জ্বলছে, আবার নিভছে। প্রতিবার আলো জ্বলে উঠতেই শরীরে প্যাঁচিয়ে ধরা শিকলের মতো বস্তুটা আরও শক্ত হয়ে সবার শরীরকে চেপে ধরছে।
নিলেশ রাওয়াত বললেন, ‘এটাই কি দেবতার দূত, যে আমাদের রক্ত চাইছে।’ তার প্রশ্নের জবাব কেউ দেয়নি, দেওয়ার মতো অবস্থা কারো নাই। সবাই হাঁসফাঁস করছে। দলের সবার কষ্ট দেখে মাহির বললেন, ‘যদি আমার রক্তে মুক্তি আসে, তবে আমি প্রস্তুত।’ পরিস্থিতি এমনই হয়েছে, এখন কেউ কারো কথাও শুনছে না। সবার খেয়াল দুইজোড়া ভয়ংকর চোখের দিকে। বীভৎস চোখ দেখে দলের সবাই বুঝতে পারল, এটা সাধারণ কিছু নয়; অলৌকিক শক্তির আবির্ভাব। এর থেকে রেহাই পাওয়া সহজ হবে না।
সন্দীপ থাপা ভয়ার্ত কণ্ঠে বললেন, ‘দেখে মনে হচ্ছে এটা দেবতার দূত নয়; অভিশপ্ত আত্মা। দেবতারা কখনো রক্ত চায় না। তাশি থাকালি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। বানিয়ে বানিয়ে সব কথা বলছেন।’ তার কথা শেষ হতেই এক বিকট আওয়াজ শোনা গেল। শব্দটা এতই বিকট যে, মনে হলো আশপাশে কোথাও বজ্রপাত ঘটেছে। আতঙ্কে সবাই কাঁপতে লাগল। ঠিক তখনই নিলেশ রাওয়াত বুক চিতিয়ে চিৎকার করে বললেন, ‘যদি রক্তই মুক্তির পথ হয়, তবে দেবতার কাছে নয়, সৃষ্টিকর্তার কাছে উৎসর্গ করব।’ নিলেশের চিৎকারে অজানা শক্তিটা গুটিয়ে এলো। ঘরের ভেতর তিন শক্তির সংঘর্ষ শুরু হলো—একদিকে তাশি থাকালির মন্ত্র, অদৃশ্য শক্তির গর্জন, অন্যদিকে মানুষের সাহস আর সৃষ্টিকর্তার প্রতি আস্থা।
দলের সবাই যখন ভয়ে দিশেহারা, তখনই ভেসে এলো এক অচেনা কণ্ঠস্বর। শান্ত কণ্ঠে বলতে লাগল, ‘মানুষের রক্ত নয়, মানুষের সাহসই আমার প্রয়োজন। তোমাদের সাহস দেখে আমি মুগ্ধ হলাম। তান্ত্রিক তাশি থাকালি প্রতারক, মিথ্যাবাদী। সে বলেছে তার বাল্যবন্ধু তান্ত্রিক, আসলে তা সঠিক নয়। সে নিজেই তান্ত্রিক। একেক সময় একেক রূপ ধারণ করতে পারদর্শী সে। আমার নাম ভাঙিয়ে তোমাদের ধোঁকা দিয়েছে। তোমাদের একজনকে বলি দিতে চেয়েছে শয়তানকে উৎসর্গ করতে। বাহিরের রক্তের চিহ্নটা তোমাদের স্পর্শ করতে দেয়নি; বিশ্বস্ততার সুরে কথা বলে সতর্ক করে দিয়েছে। আসলে সেটি স্পর্শ করলে তোমাদের কোনো ক্ষতি হতো না, বরং তার শক্তিই ক্ষয়ে যেত। সে শয়তানের উপাসক। তার আজ রক্ষা নেই। তোমরা এবার মুক্ত।’
কণ্ঠস্বর থেমে যেতেই অদৃশ্য শিকলগুলো ভেঙে যেতে লাগল। আর দলের সবাই হাঁপাতে হাঁপাতে বুকভরে নিশ্বাস নিতে শুরু করল। প্রদীপের আলো এবার দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল, উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে পড়ল সমস্ত ঘরে। তাশি থাকালি আতঙ্কে কেঁপে উঠলেন। তার চোখে-মুখে আত্মবিশ্বাসের চিহ্ন নেই। বরং ভয়ের ছায়া স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। তিনি বুঝতে পারলেন তাঁর প্রতারণা ফাঁস হয়ে গেছে। দলের সবাই একসাথে তাঁর দিকে এগিয়ে এলো। সন্দীপ থাপা গর্জে উঠলেন, ‘তুমি আমাদের ধোঁকা দিয়েছ। দেবতার নামে ভয় দেখিয়ে শয়তানের কাছে উৎসর্গ করতে চেয়েছ। আজ তোমার বিচার আমরাই করব।’ তাশি থাকালি বুঝতে পারলেন, যে শক্তিকে এতদিন নিজের বলে দাবি করেছিল, সেই শক্তিই এখন তার শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাহির বললেন, ‘সত্য প্রকাশ পেয়েছে। আমরা মুক্ত হয়েছি। তাশি থাকালি, তোমার সামনে বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই। নিজের মন্ত্র এবার নিজকেই গিলে খাবে।’ তাশি থাকালি কাঁপতে লাগলেন। তাঁর মুখ থেকে অস্পষ্ট কিছু মন্ত্রের শব্দ বেরোচ্ছিল, তবে মন্ত্র কাজ করছে না। এবার আতঙ্কিত চোখে তিনি সবার দিকে তাকিয়ে রইলেন। নিলেশ রেগে বললেন, ‘তুমি আমাদের ধ্বংস করতে চেয়েছিলে, অথচ এখন নিজেই ধ্বংসের মুখে। অজানা শক্তি তোমাকে ছেড়ে চলে গেছে।’ তাশি থাকালি কাঁপা গলায় বললেন, ‘তোমরা বুঝতে পারছ না, আমি শয়তানের উপাসক নই। আমি তার বন্দি। সে আমাকে ব্যবহার করেছে। আমিও মুক্তি চাই, আমাকে বাঁচাও। না হলে মেরে ফেল।’
তাঁর কথা শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল, মনে মায়াও ধরেছে। সন্দীপ থাপার ভেতরে সন্দেহ ঢুকেছে, তাশি থাকালি মিথ্যা বলে ধোঁকা দিতে পারেন। সন্দীপ বললেন, ‘তুমি আবারও আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করছ। মুক্তি চাইলে সত্য প্রকাশ করো। তোমাকে সাহায্য করব। তার আগে শয়তানকে ডেকে আনার ব্যবস্থা করো।’ তাশি থাকালি চোখ বন্ধ করে নিচু কণ্ঠে বললেন, ‘সে আর আসবে না। সে থাকে পর্বতের গভীরে অগ্নিগুহায়। সেই গুহার ভেতরে একটি বিশাল পাথর রয়েছে, সেটিই শয়তানের আসন। বহু বছর আগে আমি সেখানে গিয়ে তার সঙ্গে চুক্তি করেছিলাম। সে আমাকে একটা শক্তি বর দিয়েছিল, বিনিময়ে শর্তও চাপিয়ে দিয়েছিল। শর্তটি হলো, এই পর্বতে যত অভিযাত্রীর দল আসবে, সেখান থেকে একজনকে প্ররোচিত করে তার কাছে উৎসর্গ করতে হবে। সেই শর্ত মানতে আমি বাধ্য হয়েছি। প্রতিটি অভিযানে আমি কাউকে না কাউকে প্ররোচিত করেছি, আর তাকে কেড়ে নিয়েছে শয়তান।’
মাহির ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন বৃদ্ধের কথা শুনে। রাগে তার শরীর জ্বলছে। বুকের ভেতর আগুন ছড়িয়ে পড়ল বৃদ্ধের স্বীকার উক্তি শুনে। যদি এই বৃদ্ধের কথা সত্যি হয়, তবে এতদিনে কত নিরপরাধ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে হিংস্র তান্ত্রিক তাশি থাকালি। বিষয়টা ভাবতেই ভিরমি খেলেন মাহির। তার হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠল। মনে হচ্ছিল মুহূর্তে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়বেন। তাকে ক্ষিপ্ত হতে দেখে নিলেশ বললেন, ‘মাহির, শান্ত হও। মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। তুমি তো আগেই বলেছ সবাইকে মাথা ঠান্ডা রাখতে, আমরা শান্ত হয়েছি। আশা করি তোমার কথার ব্যত্যয় ঘটাবে না। আর শোন, এই বৃদ্ধকে অবশ্যই শাস্তি দেব আমরা, তবে তার আগে আমাদের মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। না হলে অন্য কোন ফাঁদে ফেলবে আবার।’
মাহির বিষয়টা বুঝতে পেরে বললেন, ‘ঠিক আছে শান্ত হলাম, তবে কিছু একটা বিহিত করতেই হবে। না হলে মাছাপুচ্ছ্রের পথের আরও কত অভিযাত্রী এই ফাঁদে পড়বে, তার ঠিক নেই। এখন আমরা ইচ্ছে করলে অভিযাত্রীদের পথের কাঁটা সরিয়ে দিতে পারি। তোমাদের কারো আপত্তি না থাকলে শয়তানের আসনটা ধ্বংস করতে চাই আগে।’ নিলেশ রাওয়াত বললেন, ‘ঠিক বলেছ মাহির। এই বৃদ্ধকে শাস্তি না দিলে মাছাপুচ্ছ্রের পথে আর কেউ নিরাপদ থাকবে না। আজই এর অবসান ঘটাতে হবে।’ সন্দীপ থাপাও একমত পোষণ করলেন, ‘আমরা পাঁচজন একসাথে দাঁড়ালে কোনো শক্তিই আমাদের আটকাতে পারবে না।’ তাশি থাকালি চিৎকার করে বললেন, ‘না! তোমরা পারবে না। ওই গুহায় প্রবেশ করলে জীবিত ফিরতে পারবে না, আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।’ মাহির আত্মবিশ্বাস নিয়ে বললেন, ‘আমরা ভয় করি না।’
ঘরের বাইরে হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দ হলো। দলের সবাই বুঝতে পারল, শয়তান তাদের পরিকল্পনা টের পেয়ে সতর্ক করছে। ভয়ে তাশি থাকালি ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে লাগল। তখনই ঘরের দেওয়াল ভেদ করে একটা আলোকরশ্মি প্রবেশ করল। আলো দেখেই সে কাঁপা গলায় বলল, ‘এই আলোকে অনুসরণ করলে তোমরা পৌঁছে যাবে পর্বতের গভীরে লুকিয়ে থাকা অগ্নিগুহায়। তবে সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করো না। আমি নিশ্চিত, ওখান থেকে জীবিত ফিরে আসতে পারবে না। এই আলো শয়তানের প্রেরিত। আমি অমরত্ব চেয়েছিলাম তার কাছে। সেই লোভে কত মানুষকে ধ্বংস করেছি, তোমাদেরকেও সেই ফাঁদে ফেলতে চেয়েছি। অনেক হয়েছে... এবার আমি বিদায় নিচ্ছি।’ কথা শেষ করেই তাশি থাকালি আলোটাকে অনুসরণ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর তার পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। দলের সবাই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কেউ তাকে থামানোর চেষ্টা করল না, কারণ তারা জানত, এই ভয়ংকর মানুষটা বেঁচে থাকলে অভিযাত্রীরা কখনোই নিরাপদ থাকতে পারবে না।
ঘরের ভেতরের নিস্তব্ধতা কেটে গেল। দীর্ঘ রাতের ভয়াবহতা শেষে শান্তি ফিরে এলো। মাহির বললেন, ‘আমরা মুক্ত হয়েছি। শয়তানের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে এসেছি। তাশি থাকালি নিজের পথ ধরেই নিজেই ধ্বংসের দিকে এগিয়ে গেছে।’ এদিকে পর্বতের আকাশে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। অন্ধকার কেটে যাচ্ছে। বরফে ঢাকা শৃঙ্গগুলোর মাথায় আলোর রেখা ভেসে উঠল। নিচের দিকে এখনো ঘন আঁধার, তবে অভিযাত্রীরা বুঝে গেছে আর ভয় নেই। রাতের আতঙ্ক, ভয়ংকর চোখ, মন্ত্রের জোর ভোরের আলোয় মিলিয়ে গেল।
উপরের দিকে মাছাপুচ্ছ্রের বেসক্যাম্প। সেখানে পৌঁছাতে হয়তো আরও দুদিন সময় লাগবে। কিন্তু সেটিই তাদের যাত্রার শেষ নয়—বেসক্যাম্প থেকে আবার দুই-তিনদিনের কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে, পনেরো হাজার ফুট উচ্চতায় উঠতে, যেখানেই তাদের গন্তব্য। এখন আর কারো মনে দ্বিধা নেই। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি, ভয় কিংবা অনিশ্চয়তা সবকিছু মিলিয়ে গেছে। প্রত্যেকের চোখে ঝলমল করছে নতুন আশার আলো। তারা জানে পথ যতই কঠিন হোক না কেন, একসাথে থাকলে জয় সম্ভব।



