সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে দেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড শিরোনামহীনের নবম অ্যালবামের প্রথম গান ‘যুদ্ধ’। গানটির সঙ্গে প্রকাশিত মিউজিক ভিডিওতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে আলোচনা। ইউটিউবের নীতিমালা অনুযায়ী ভিডিওতে এআই ব্যবহারের ঘোষণা দেওয়ার পর অনেক শ্রোতার মধ্যেই ভুল ধারণা তৈরি হয়—শিরোনামহীন কি তবে গান তৈরিতেও এআই ব্যবহার করেছে?
এআই নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করলেন জিয়া
এই বিভ্রান্তির প্রেক্ষাপটে মুখ খুলেছেন ব্যান্ডটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সদস্য জিয়াউর রহমান জিয়া। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এআই ব্যবহার করা হয়েছে শুধুমাত্র ভিডিও নির্মাণে, গানে নয়। বরং এআইনির্ভর ভিডিও নির্মাণের পেছনে রয়েছে একটি সুস্পষ্ট কৌশল—ভিডিও প্রযোজনার জটিলতা কমিয়ে আরও বেশি সময় ও মনোযোগ গান তৈরিতে দেওয়া।
‘এআই দিয়ে গান বানানো আমাদের জন্য অপমানজনক’
জিয়ার ভাষায়, শিরোনামহীনের ৩০ বছরের যাত্রায় কখনোই ব্যান্ডের বাইরে থেকে লিরিক, কম্পোজিশন বা সৃজনশীল কোনো উপাদান নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। এমনকি অতিথি শিল্পী ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তারা বরাবরই সংযত।
তিনি বলেন, “শিরোনামহীন এমন একটি ব্যান্ড, যারা কখনোই ব্যান্ডের বাইরে থেকে কোনো ক্রিয়েটিভ বিষয় নেয়নি। নিজেরাই সবকিছু করার চেষ্টা করেছি। এই অবস্থায় শিরোনামহীনকে এআই দিয়ে গান তৈরি করতে হবে—এই চিন্তাটাই আমাদের কাছে অপমানজনক।”
জিয়ার দাবি, ইউটিউবে ‘এআই’ ট্যাগ দেখে কেউ কেউ ধরে নিয়েছেন গানটিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে। অথচ ভিডিওর বর্ণনাতেই উল্লেখ করা হয়েছে, গানটি সম্পূর্ণ শিরোনামহীনের মৌলিক সৃষ্টি এবং এআই ব্যবহৃত হয়েছে শুধু ভিজ্যুয়াল নির্মাণে।
ভিডিও নয়, গানে ফিরছে মনোযোগ
জিয়ার বক্তব্যে স্পষ্ট, শিরোনামহীনের বর্তমান লক্ষ্য হলো ভিডিও নির্মাণের অতিরিক্ত চাপ থেকে বেরিয়ে এসে আবারও গানের দিকে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া।
তিনি বলেন, “আমরা তো গানেরই মানুষ, গান-বাজনা করার জন্যই আসলে আমরা ব্যান্ড করেছি।”
বিগত অ্যালবাম ‘বাতিঘর’-এর ভিডিও নির্মাণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, থাইল্যান্ড ও ভারতের বিভিন্ন লোকেশনে শুটিং করতে গিয়ে পুরো টিম, শিল্পী, ক্যামেরা ইউনিট, ড্রোন অপারেটরসহ বড় ধরনের আয়োজন করতে হয়েছে। এতে যেমন বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে, তেমনি সময়ও লেগেছে অনেক।
এই দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া ব্যান্ডের মূল সৃজনশীল কাজকে ধীর করে দেয় বলেই মনে করেন তিনি। তাই এবার ভিডিও নির্মাণের ক্ষেত্রে এআইকে সহায়ক হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে, যাতে শিল্পীরা তাদের প্রধান কাজ—গান রচনা, সুর ও সংগীতায়োজনে আরও বেশি সময় দিতে পারেন।
তিন বছরের কাজ এক বছরে
শিরোনামহীনের আগের অ্যালবাম প্রকাশে প্রায় তিন বছর সময় লেগেছিল। জিয়ার মতে, এর অন্যতম কারণ ছিল মিউজিক ভিডিও নির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞ।
এবার সেই জায়গায় এআইনির্ভর ভিডিও ব্যবস্থার মাধ্যমে সময় ও ব্যয়—দুই-ই কমিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে।
তার ভাষায়, “যদি আমাদের মিউজিক ভিডিও করতে হয়, তাহলে দেখা যাবে একটা অ্যালবাম ডেলিভার করতে তিন বছরের মতো সময় লেগে যাচ্ছে। এবার আমরা এআই দিয়ে কাজ করলাম। ফিন্যান্সিয়ালিও কম খরচে সারতে পারছি। এভাবে আমরা এক বছরে একটি অ্যালবাম ডেলিভার করে ফেলতে পারব।”
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতি মাসে অথবা অন্তত দুই মাসে একটি করে নতুন গান প্রকাশ করতে চায় ব্যান্ডটি। ফলে অ্যালবামের গানগুলো ধাপে ধাপে প্রকাশ পাবে এবং পরে সেগুলো পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম হিসেবে সংকলিত হবে।
পূর্বসূরিদের পথেই ফিরতে চায় শিরোনামহীন
জিয়া মনে করেন, বাংলা ব্যান্ড সংগীতের স্বর্ণযুগে শিল্পীরা মূলত গান তৈরির কাজেই মনোযোগ দিতে পারতেন। জেমস, আইয়ুব বাচ্চু কিংবা মাইলসের মতো ব্যান্ডগুলোর বিপুলসংখ্যক গানের পেছনে এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
তিনি বলেন, তখন শিল্পীদের নিজেদের ভিডিও নির্মাণের দায় নিতে হতো না। টেলিভিশন চ্যানেল বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখালে তারাই ভিডিও তৈরি করত। ফলে শিল্পীরা তাদের সৃষ্টিশীল শক্তি পুরোপুরি গানের পেছনে ব্যয় করতে পারতেন।
শিরোনামহীনও এখন সেই দর্শনেই ফিরতে চায়—প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভিডিওর ঝামেলা কমিয়ে আরও বেশি গান তৈরিতে মনোযোগ দিতে।
ইউটিউবের যুগে ভিজ্যুয়ালের প্রয়োজন
তবে ভিডিওকে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার পক্ষেও নয় ব্যান্ডটি। জিয়ার মতে, বর্তমানে অধিকাংশ শ্রোতাই ইউটিউবের মাধ্যমে গান শোনেন। ফলে একটি গান প্রকাশের সময় ভিজ্যুয়াল উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, “ইউটিউব একটা ভিডিও প্ল্যাটফর্ম। সেখানে তো একটা ভিজ্যুয়াল আসতে হবে। একটা ছবি দিয়ে বা সামান্য মোশন গ্রাফিক্স দিয়ে গান প্রকাশ করা আমাদের কাছে যথেষ্ট মনে হয় না।”
এই কারণেই একটি থার্ড-পার্টি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় এআইনির্ভর ভিডিও তৈরি করা হয়েছে, যাতে শ্রোতারা গানের সঙ্গে মানানসই একটি ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতাও পান।
ভাবনার দুয়ার খুললো শিরোনামহীন
সংগীতসংশ্লিষ্টদের মতে, শিরোনামহীনের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি কার্যকর মডেল হয়ে উঠতে পারে। কারণ এতে প্রযুক্তিকে সৃজনশীলতার বিকল্প নয়, বরং সৃজনশীল কাজের সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ ভিডিও প্রযোজনার চাপ কমিয়ে শিল্পীরা যদি আরও বেশি সময় গান রচনা, সুর ও সংগীতায়োজনে দিতে পারেন, তাহলে কম সময়ে আরও বেশি মৌলিক গান তৈরি ও প্রকাশের সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে স্বাধীন শিল্পী ও ব্যান্ডগুলোর জন্য এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
‘যুদ্ধ’ শুধু শিরোনামহীনের নতুন অ্যালবামের প্রথম গান নয়, ব্যান্ডটির নতুন কর্মপদ্ধতিরও সূচনা। যেখানে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে গান তৈরির বিকল্প হিসেবে নয়, বরং গান তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে।
শিরোনামহীনের এই অবস্থান এক অর্থে বাংলা ব্যান্ড সংগীতের পুরোনো দর্শনেরই আধুনিক সংস্করণ—ভিডিও নয়, প্রাধান্য গানে; প্রযুক্তি নয়, কেন্দ্রে সৃজনশীলতা। নবম অ্যালবামের প্রথম গান প্রকাশের মধ্য দিয়ে ব্যান্ডটি যে পথের ইঙ্গিত দিল, তা ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য ব্যান্ড ও শিল্পীদের জন্যও একটি নতুন ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।



