ছবি: লেখক
বাইরে ডালিয়ান শহরে বৃষ্টি। চীনের এই শহরে বৃষ্টি মানে একঘেয়েমি নয়; বরং একধরনের শান্তি। জানালার পাশে বসে আছি। হাতে এক কাপ চা। চা দেখতে হালকা সবুজ, যেন কেউ আকাশের এক টুকরা গুঁড়িয়ে পেয়ালায় ভরে দিয়েছে। চীনা চা নিয়ে লেখার মানে শুধু চা নয়। এটা একটা অনুভূতি। হুমায়ূন আহমেদ যেমন লিখতেন, ‘চায়ের কাপে যদি মন না থাকে, তাহলে ওটা খালি কাপ।’ আজ মন আছে। কিন্তু মনটা অন্য জায়গায়। বাংলাদেশে, আমার মায়ের হাতে বানানো মসলা চায়ের গন্ধে।
প্রথম চীনা চায়ের অভিজ্ঞতা
প্রথমবার যখন চীনে এলাম, চায়নিজ চা খেয়ে অবাক হলাম। এটা সেই চা না, যে চায়ে দুধ-চিনি দিয়ে নাশতার সময় গলা টিপে খেতে হয়। এটা এক দর্শন। এটা এক ধ্যান। চীনের চা-সংস্কৃতি হাজার বছরের। একদিন আমার চীনা বন্ধু লি আমাকে নিয়ে গেল একটি পুরোনো চায়ের দোকানে। দোকানটার বয়স কম করে তিন শ বছর। সেখানে এক বুড়ি বসে। তাঁর হাতে ছোট ছোট পেয়ালা। বুড়ি বললেন, ‘চা খাবে?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’
তিনি একটি মাটির চুলার ওপর কেটলি বসালেন। তাঁর ভেতর গরম পানি। তারপর এক কাপে সবুজ চা–পাতা দিলেন। তিনি পানিটা একবার চায়ের ওপর ঢেলে ফেলে দিলেন। দ্বিতীয়বার ঢেলে বসলেন। আমাকে বললেন, ‘এই প্রথম কাপ চা। পান করো।’
আমি চুমুক দিলাম। স্বাদ খুব হালকা, একটু তেতো। সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো আমি যেন কোনো বাঁশবনে দাঁড়িয়ে আছি। চারপাশে সবুজ। আকাশ পরিষ্কার।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
চীনা চা ও জীবনের তিন পর্যায়
বুড়ি বললেন, ‘চীনা চা তিনবার পানি ফেলে খাওয়া ভালো। প্রথমবার হালকা, দ্বিতীয়বার মিষ্টি, তৃতীয়বার স্বাদ শেষ।’ আমি ভাবলাম, মানুষের মতো। প্রথম যৌবন হালকা, দ্বিতীয় যৌবন মিষ্টি, তৃতীয়বার বুড়ো বয়স—তখন সব স্বাদ ফুরিয়ে যায়।
লি আমাকে আরও জানাল, চীনে চায়ের দোকানে গিয়ে মানুষ শুধু চা খায় না, তারা সেখানে বসে কবিতা পড়ে, গান শোনে, দার্শনিক আলোচনা করে। আমি অবাক হলাম। আমাদের দেশে চায়ের দোকানে বসে মানুষ রাজনীতি করে, গপ্পো মারে, পাড়ার মেয়েদের খবর নেয়। দুই দেশের চা দুই রকম, দুই দর্শন।
বৃষ্টির দিনে একা চা
ছবি: লেখক
একদিন বৃষ্টির দিনে আমি একা বসে চীনা চা খাচ্ছিলাম। চা খেতে খেতে হঠাৎ আমার ইচ্ছা হলো, এই চায়ের ভেতর যদি মা-বোনের হাসি মেশানো যেত! তাহলে স্বাদ কেমন হতো? হয়তো পুরো চীনজুড়ে ছড়িয়ে পড়ত বাঙালিয়ানার গন্ধ।
আমি চীনে থেকে অনেক ধরনের চা খেয়েছি। লংজিং চা, টিয়েকুয়ানিন, পু-এর চা। কিন্তু কোনো চাতেই আমার ছোটবেলার সেই চায়ের স্বাদ পাইনি। আমাদের গ্রামের বাড়িতে মা বানাতেন লাল চা। তাতে আদা, দারুচিনি, এলাচি। সেই চায়ের গন্ধে বাড়ি ভরে যেত। আর চীনা চা নিঃশব্দ। এটি আপনাকে ভাবতে বাধ্য করে। ‘আমি কেন এখানে আছি? কে আমাকে ডেকেছে? আমি কাকে ডাকছি?’
হুমায়ূন আহমেদের গল্পের চরিত্র হিমু বলত, ‘চা খেলে মাথা ঠান্ড হয়।’ চীনা চা খেলে মাথা ঠান্ডা হয় বটে, কিন্তু বুকের ভেতরটা একটু কেমন যেন হয়। শূন্য লাগে। সেই শূন্যতা মিষ্টি। যেমন ধরো, তোমার প্রিয় মানুষটি দূরে চলে গেছে, কিন্তু তার গন্ধ এখনো বালিশে লেগে আছে—তেমন শূন্যতা।
কবিতা ও স্বপ্ন
ছবি: লেখক
গতকাল সকালে চীনা চা খেতে খেতে লিখতে বসলাম। লিখলাম:
‘চীনের বৃষ্টি ভেজা রাস্তায়
এক ফোঁটা চা পড়ে থাকে
তা যদি গঙ্গার জলে মেশে
তাহলে বুঝব বাড়ি ফেরার পথ পেয়েছি।’
চায়ের কাপ শেষ হলে ঘুম আসে। চীনা চা আমায় ঘুম পাড়িয়ে দেয়। কিন্তু সেই ঘুমের ভেতর স্বপ্নে দেখি—আমি বসে আছি ঢাকায়, উচ্ছ্বাস চায়ের দোকানে, সামনে এক কাপ মিষ্টি চা। পাশে বন্ধুরা। আর চারদিকে পরিচিত হাসি।
জানি, এই স্বপ্ন সত্যি হবে না হয়তো। কিন্তু চীনা চা খেতে খেতে একবার হলেও মিথ্যা আশা করা যায়। সেটাই তো বাঁচার রসদ।
আজ রাতে আবার চা বানাব। চীনা চা। পুরোনো রেসিপিতে। হয়তো শেষ বেলায় এক চিমটি বাংলার স্মৃতি মিশিয়ে দেব। চায়ের স্বাদ তখন কেমন হয়? সেটা জানতে চা খেতে হবে। দূর থেকে আসা সব বাঙালিকে দাওয়াত রইল। আসবেন!
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
চীন দূর পরবাস
চা
বৃষ্টিপাত
হুমায়ূন আহমেদ
সংস্কৃতি
চীন
মানুষের গল্প
জীবনের গল্প
দূর পরবাস
স্মৃতিচারণ
বৃষ্টি



