মোহাম্মদপুরে অপরাধের শহর: অ্যালেক্স ইমন হত্যা ও সিটি অব গডের ছায়া
একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে দেখা যায়, এক তরুণকে ধাওয়া করছে প্রতিপক্ষ। দৌড়াতে গিয়ে তিনি একটি দোকানের সামনে পড়ে যান। এরপর তাঁকে ঘিরে ধরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়। একপর্যায়ে তাঁর বাঁ পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ঘটনাটি ঘটেছে ১২ এপ্রিল। পরে জানা যায়, ওই তরুণ মারা গেছেন। তাঁর নাম ইমন হোসেন, যিনি অপরাধজগতে 'অ্যালেক্স ইমন' নামে পরিচিত। তিনি রাজধানীর মোহাম্মদপুরের 'অ্যালেক্স গ্রুপের' প্রধান এবং শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালের সহযোগী ছিলেন।
অপরাধের ইতিহাস ও বিচারহীনতা
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ইমনের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধের ১৮টি মামলা রয়েছে। তবে এসব মামলায় তাঁর বিচার হয়নি, শাস্তিও হয়নি। তিনি নিহত হয়েছেন প্রতিপক্ষের হামলায়। এই ঘটনাটির মিল পাওয়া যায় ব্রাজিলের বিখ্যাত সিনেমা 'সিটি অব গড'-এর শেষ দৃশ্যের সঙ্গে। ওই সিনেমায় দেখা যায়, অপরাধী দলের প্রধান জে পেকেনো পুলিশের হাতে ধরা পড়েন, কিন্তু ঘুষ দিয়ে ছাড়া পান। তবে তিনি নিহত হন কয়েকটি কিশোরের হাতে। ইমন ও জে পেকেনোর পরিণতি একই—তাঁরা প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হয়েছেন, বিচার পাননি।
মোহাম্মদপুর: অপরাধের স্বর্গ
গত ১২ এপ্রিল মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের দ্বন্দ্বে ইমন হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে ধরা পড়েছে সেই দৃশ্য। বিচার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে না পারায় ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর বস্তি সিটি অব গড এখনো অপরাধপ্রবণ। বাংলাদেশের মোহাম্মদপুরও যেন 'সিটি অব গড'। দশকের পর দশক ধরে সেখানে অপরাধী দল নিজেদের মধ্যে খুন, পাল্টা খুন করছে, মাদক ব্যবসা করছে, ছিনতাই ও চাঁদাবাজি করছে। কিন্তু তাদের দমন করা যাচ্ছে না।
মোহাম্মদপুরের একজন পুরোনো বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'খুন, দখল, চাঁদাবাজি—মোহাম্মদপুরে এই ধারা চলছে চার দশকের বেশি সময় ধরে।' সময় যত গেছে, অপরাধের ধরন তত বদলেছে। নতুন নতুন অপরাধী দল তৈরি হয়েছে। অপরাধ ও অপরাধী দলের তৎপরতা এখনো আছে এবং তা আগের চেয়ে বেশি।
অপরাধী দল ও তাদের কার্যক্রম
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুরে এখন অর্ধশত অপরাধী দল সক্রিয়। এর মধ্যে বড় অপরাধী দল ১৭টি। প্রতিটি দলে ১৫–২০ জন করে অপরাধী রয়েছে। অপরাধী দলগুলোর রয়েছে বিচিত্র নাম, যেমন পাটালি গ্রুপ, লেভেল হাই গ্রুপ, ডাইল্লা গ্রুপ, অ্যালেক্স গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ ইত্যাদি। অপরাধীদের আয়ের উৎস মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখল, অপরাধের কাজে ভাড়া খাটা ইত্যাদি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর মোহাম্মদপুর আলোচনায় আসে। কারণ, দুর্বল পুলিশি কার্যক্রমের সুযোগে অপরাধী দলগুলো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ডিএমপির তথ্য মতে, মোহাম্মদপুরে অপরাধী দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব–সংঘাতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গত প্রায় ২০ মাসে খুন হন ২৪ জন। সর্বশেষ ইমনের পর ১৫ এপ্রিল দিবাগত রাতে খুন হন আসাদুল হক ওরফে লম্বু আসাদুল। মাদক ব্যবসা নিয়ে বিরোধে তাঁকে খুন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঐতিহাসিক পটভূমি ও ভৌগোলিক অবস্থান
ষাটের দশকে যখন সিটি অব গড প্রতিষ্ঠা হয়, কাছাকাছি সময়ে মোহাম্মদপুরেও প্রকল্প নেয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। গবেষণা অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর ছিল জলাভূমি, টিলা ও জঙ্গলঘেরা এলাকা। আশির দশক থেকে মোহাম্মদপুরের পাড়ামহল্লায় ছোট ছোট অপরাধী দল বা 'গ্যাং' গড়ে উঠতে শুরু করে। শিল্পী ও গবেষক শাওন আকন্দ বলেন, 'মোহাম্মদপুরের জন্মই হয়েছে একধরনের উদ্বেগের মধ্য দিয়ে। এখানে রাজনৈতিক বাস্তবতাও ভিন্ন।'
মোহাম্মদপুরের আয়তন ৭ দশমিক ৪৪ বর্গকিলোমিটার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, মোহাম্মদপুরে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৭০ হাজার ৯৩৯ জন মানুষ বাস করেন, যা ঢাকার গড় জনঘনত্বের দ্বিগুণের বেশি। ভৌগোলিকভাবে পূর্বাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল—এই তিন ভাগে মোহাম্মদপুরকে ভাগ করা যায়। স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অপরাধপ্রবণতা বেশি মূলত জেনেভা ক্যাম্প এলাকা, মধ্যঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ
র্যাব-২–এর অধিনায়ক মো. খালিদুল হক বলেন, 'অপরাধবিজ্ঞানে বাস্তুবিদ্যার যে সূত্র, মোহাম্মদপুরে সবকিছুই বিদ্যমান। মোহাম্মদপুরের ভৌগোলিক অবস্থানও অপরাধীদের সুযোগ করে দেয়।' অপরাধ করে তারা দ্রুত বুড়িগঙ্গার ওপারে পালিয়ে যেতে পারে। পুলিশ ও র্যাবের কর্মকর্তারা আরও দুটি কারণ উল্লেখ করেন: আবাসন ব্যবসার প্রসার ও 'জেনেভা ক্যাম্প'। মোহাম্মদপুরে ছোট–বড় ৯৭টি আবাসন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই ব্যবসার 'কাঁচা টাকা' ধরতে অপরাধী দলগুলো সক্রিয়। জেনেভা ক্যাম্পের কিশোরদের শিক্ষার সুযোগ কম ও দারিদ্র্য আছে, ফলে খুব সহজেই তাদের অপরাধে জড়িত করা যায়।
পুলিশ ও র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গত ২০ মাসে মোহাম্মদপুর থেকে ৪ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে অপরাধের ঘটনা একের পর এক ঘটছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেন, 'সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে 'প্রো–অ্যাকটিভ' পুলিশিং ছাড়া এ অঞ্চলের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।'
স্থানীয় বাসিন্দাদের আকুতি
মোহাম্মদপুরের আটজন পুরোনো বাসিন্দা দীর্ঘ আলাপে নিজেদের গল্প বলেছেন, আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। একজন বলেছেন, অপরাধ ও অপরাধী দলের কারণে ঢাকার মানুষ তাঁদের নিয়ে ব্যঙ্গ করে। এমন একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে অপরাধ মানেই মোহাম্মদপুর। তাঁরা অপরাধী দলের হাত থেকে মুক্তি চান, কিন্তু নিরাপত্তার অভাবের কারণে নাম প্রকাশ করতে চাননি। মোহাম্মদপুরের সাধারণ মানুষ অপরাধীদের হামলার শিকার হচ্ছেন নিয়মিত, যা এলাকার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।



